অবশ্য তিন বছর পরে নিউটনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন দিদেরো; তিনি বাহ্যিক জগৎ ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষে কোনওরকম সাক্ষ্য দেয় বলে আর মানতে পারেননি। তিনি স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন, নবলব্ধ বিজ্ঞানের সঙ্গে ঈশ্বরের কোনওই সম্পর্ক নেই। এই বিপ্লবাত্মক ও উত্তেজনাকর চিন্তাকে কেবল গল্পের ঢঙেই তুলে ধরতে পেরেছেন তিনি। আ লেটার টু দ্য ব্লাইন্ড-এ দিদেরো ‘মিস্টার হোমস’ নামের এক নিউটনবাদীর সঙ্গে ছোট বেলায় দৃষ্টিশক্তি হারানো ক্যামব্রিজের প্রয়াত গণিতজ্ঞ নিকোলাস সন্ডারসনের (১৬৮২-১৭৩৯) বিতর্কের কল্পনা করেছেন। সন্ডারসনের মুখে হোমসকে জিজ্ঞাসা করিয়েছেন দিদেরো, পরিকল্পনার যুক্তিকে কীভাবে তিনি তাঁর মতো (সন্ডারসন) ‘দানব’ ও দুর্ঘটনার সঙ্গে খাপ খাওয়াবেন, যিনি বুদ্ধি ও উদার পরিকল্পনা ছাড়া আর সবই প্রকাশ করেন;
এ জগৎ কী, মিস্টার হোমস, জটিল, পরিবর্তনের চক্রের অধীন, যার সবকিছুই ধ্বংসের অবিরাম প্রবণতা দেখায়। একের পর এক আগত বস্তু দ্রুত বিকশিত হয় ও হারিয়ে যায়; এক তুচ্ছ অস্থায়ী সামঞ্জস্য ও শৃঙ্খলার ক্ষণস্থায়ী ধারা।[৬৭]
নিউটন ও সত্যি বলতে বহু প্রথাগত ক্রিশ্চানের ঈশ্বর, আক্ষরিকভাবেই যার সমস্ত ঘটনার জন্যে দায়ী হওয়ার কথা, তিনি কেবল অযৌক্তিকই নন বরং এক ভয়ঙ্কর ধারণা। বর্তমানে আমরা ব্যাখ্যা দিতে পারি না এমন জিনিসের ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্যে ঈশ্বর’-কে উপস্থাপন করা একটি ব্যর্থতা। প্রিয় বন্ধু মিস্টার হোমস, উপসংহার টানছেন দিদেরের সন্ডারসন, তোমার অজ্ঞতা স্বীকার করো।’
দিদেরোর দৃষ্টিতে স্রষ্টার কোনও প্রয়োজন ছিল না। নিউটন ও প্রটেস্ট্যান্টরা যেমন ভেবেছেন বস্তু তেমন নিষ্ক্রিয় তুচ্ছ বিষয় নয়, বরং এর নিজস্ব গতি রয়েছে, যা আপন নিয়ম মেনে চলে। বস্তুর নিয়মই-স্বর্গীয় মেকানিক নন-আমরা যে পরিকল্পনা দেখি বলে মনে করি তার জন্যে দায়ী। বস্তু ছাড়া আর কিছুরই অস্তিত্ব নেই। স্পিনোকে আরেক কদম সামনে নিয়ে গেছেন দিদেরো । প্রকৃতি ছাড়া আর কোনও ঈশ্বর নেই না বলে দিদেরো দাবি করেছেন যে কেবল প্রকৃতিই আছে, ঈশ্বর বলে কিছু নেই। তার এই বিশ্বাসে একা ছিলেন না তিনি। আব্রাহাম ট্রেম্বলি ও জন টার্বেভিল নীডহ্যামের মতো। বিজ্ঞানীরা সৃজনী বস্তুর নীতি আবিষ্কার করেছিলেন, যা জীববিজ্ঞান, অনুবিজ্ঞান, প্রাণীবিদ্যা, প্রাকৃতির ইতিহাস ও ভূতত্ত্বের ক্ষেত্রে প্রকল্প হিসাবে আবির্ভূত হচ্ছিল। অবশ্য অল্প সংখ্যকই ঈশ্বরের সঙ্গে চূড়ান্ত সম্পর্কচ্ছেদের জন্যে প্রস্তুত ছিলেন। এমনকি হলবাখের ব্যারন পলা হেইনরিখের (১৭২৩-৮৯) স্যালনে নিয়মিত যাতায়াতকারী দার্শনিকরাও প্রকাশ্যে নাস্তিক্যবাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেননি, যদিও তারা খোলামেলা আলোচনা উপভোগ করতেন। এসব বিতর্ক হতেই হলবাখের গ্রন্থ দ্য সিস্টেম অভ নেচার: লজ অভ দ্য মোরাল অ্যান্ড ফিজিক্যাল ওয়ার্ল্ড (১৭৭০) বেরিয়ে আসে, যা নাস্তিক্যবাদী বস্তুবাদের বাইবেল হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠে। প্রকৃতির কোনও অতিপ্রাকৃত বিকল্প নেই, যা, হলবাখ যুক্তি দেখিয়েছেন, কারণ ও ফলের এক বিশাল ধারা যা অবিরাম একটি থেকে অন্যটিতে প্রবাহিত হয়। ঈশ্বরের বিশ্বাস অসততা এবং আমাদের প্রকৃত অস্তিত্বকে অস্বীকার করা। এটা হতাশারও পরিচায়ক। ধর্ম দেবতাদের সৃষ্টি করেছে, কারণ এই পৃথিবীর জীবনের দুঃখকষ্টে সান্ত্বনা পাওয়ার জন্যে মানুষ আর কোনও ব্যাখ্যা খুঁজে পায়নি। তারা নিয়ন্ত্রণের এক ভ্রান্ত বোধ সৃষ্টির প্রয়াসে ধর্ম ও দর্শনের কাল্পনিক সান্ত্বনার শরণ নিয়েছে, আতঙ্ক ও বিপর্যয় প্রতিরোধ করার জন্যে নেপথ্যে ক্রিয়াশীল এক কাল্পনিক এজেন্সিকে প্রসন্ন করার প্রয়াস পেয়েছে। অ্যারিস্টটল ভুল করেছিলেন: দর্শন জ্ঞান অর্জনের মহৎ আকাক্ষার ফল ছিল না, বরং দুঃখ এড়ানোর ভীরু ইচ্ছার পরিণতি। সুতরাং ধর্মের আশ্রয় হচ্ছে অজ্ঞতা ও আতঙ্ক, একজন পরিণত আলোকিত মানুষকে অবশ্যই একে অতিক্রম করে আসতে হবে।
হলবাখ তার নিজস্ব ঈশ্বরের ইতিহাস প্রণয়নের প্রয়াস পেয়েছিলেন। আদিম মানুষ প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তির উপাসনা করেছে। আদিম অ্যানিমিজম গ্রহণযোগ্য ছিল, কেননা তা এই জগতের উর্ধ্বে যাওয়ার কোনও চেষ্টা করেনি। মানুষ যখন নিজেদের ইমেজ ও পছন্দের আদলে ঈশ্বর সৃষ্টির জন্যে সূর্য, সাগর ও বাতাসকে ব্যক্তিরূপ দিতে শুরু করে তখনই পচনের সূচনা ঘটেছিল। শেষে তারা এসব দেবতাকে এক বিশাল উপাস্যে পরিণত করে, যা আসলে একটা
অভিক্ষেপ ও বৈপরীত্যের স্তূপ বৈ আর কিছুই নয়। শত শত বছর ধরে কবি ও ধর্মবিদরা।
কেবল সুবিশাল পরিবর্ধিত মানুষ তৈরি করা ছাড়া আর কিছু করেননি। যাকে তারা বেমানান সব গুণাবলী একত্রিত করার মাধ্যমে অনন্য সাধারণ করেছেন মানুষ। যা ঈশ্বরের মাঝে কখনওই দেখবে না, বরং মানবজাতির একটা সত্তার, মাঝে তারা বিভিন্ন অনুপাতকে বাড়িয়ে তোলার প্রয়াস পাবে, যতক্ষণ না দুর্বোধ্য একটা সত্তা সৃষ্টি হচ্ছে।
ইতিহাস দেখায়, ঈশ্বরের তথাকথিত মহানুভবতাকে তাঁর সর্বশক্তিমানতার সঙ্গে সমন্বিত করা অসম্ভব। কারণ এখানে সঙ্গতির অভাব রয়েছে, তাই ঈশ্বরের ধারণা বিনষ্ট হতে বাধ্য। দার্শনিক ও বিজ্ঞানীরা এঁকে রক্ষা করার যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়েছেন, কিন্তু তাঁরা কবি ও ধর্মতাত্ত্বিকদের চেয়ে ভালো সাফল্য দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন। দেকার্তে যে hautes perfections প্রমাণ করার দাবি করেছিলেন সেটা কেবল তার কল্পনাসঞ্জাত ব্যাপার ছিল। এমনকি মহান নিউটনও তাঁর ছোটবেলার সংস্কারের দাস’ ছিলেন। তিনি পরম শূন্যতা আবিষ্কার করেছিলেন এবং শূন্য হতে একজন ঈশ্বর সৃষ্টি করেছেন যিনি স্রেফ un homme Puissant; এক স্বর্গীয় শাসক যিনি সৃষ্ট মানুষকে ভয় দেখিয়ে দাসের পর্যায়ে নামিয়ে আনেন।
