ষোড়শ শতাব্দীর ক্রিশ্চান সংস্কারবাদীদের মতো আরবীয় পেনিনসুলার নজদের একজন জুরিস্ট মুহাম্মদ ইবন আল-ওয়াহাব (মৃত্যু, ১৭৮৪) পরবর্তীকালের সকল সংযোজন হতে মুক্ত করে ইসলামকে এর সূচনালগ্নের খাঁটি রূপে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। তিনি বিশেষভাবে অতিন্দ্রীয়বাদীদের প্রতি বৈরী ভাবাপন্ন ছিলেন। সুফী সাধক ও শিয়াহ্ ইমামদের প্রতি ভক্তি প্রকাশসহ অবতারবাদ মূলক ধর্মতত্ত্বের সকল ধারণার নিন্দা করা হয়। এমনকি মদিনায় পয়গম্বরের রওযার কাল্টেরও বিরোধিতা করেন তিনিঃ একজন মানুষ, তিনি যত মহানই হোক, ঈশ্বর হতে মনোযোগ বিক্ষিপ্ত করতে পারেন না। আল-ওয়াহাব মধ্য-আরবের এক ক্ষুদে রাজ্যের শাসক মুহাম্মদ ইবন সউদকে কাছে টানতে সক্ষম হন। দুজনে মিলে এক সংস্কার আন্দোলন শুরু করেন যা ছিল পয়গম্বর ও তাঁর সহচরদের প্রথম উম্মাহর পুনর্জন্ম দেওয়ার একটা প্রয়াস। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন, বিধবা ও এতিমদের দুর্দশার প্রতি নির্লিপ্ততা, অনৈতিকতা ও বহু-ঈশ্বরবাদীতার বিরুদ্ধে আক্রমণ হানেন তারা। তুর্কীরা নয়, আরবদেরই মুসলিম জাতির নেতৃত্ব দেওয়া উচিত মনে করে তারা অটোমান সাম্রাজ্যের শাসকদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেন। অটোমান নিয়ন্ত্রণ হতে হিজাযের উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করে নিতে সক্ষম হন তাঁরা, যা ১৮১৮ সালের আগে আর তুর্কীরা পুনর্দখল করতে পারেনি; নতুন গোষ্ঠীটি ইসলামি বিশ্বের বহু মানুষের কল্পনার জগতে প্রভাব বিস্তার করেছিল। মক্কায় আগত তীর্থযাত্রীরা এই নতুন ধর্মানুরাগে মুগ্ধ হয়েছিল, যাকে প্রচলিত সুফীবাদের চেয়ে ঢের সজীব ও অনেক বেশি জোরালো মনে হয়েছে। উনবিংশ শতাব্দীতে ওয়াহাবি মতবাদ প্রভাবশালী ইসলামি ভাবধারা হয়ে ওঠে, অন্যদিকে সুফীবাদ ক্রমবর্ধমান হারে প্রান্তিক হয়ে পড়ে। এর পরিণামে তা আরও বিকৃত ও কুসংস্কারপুর্ণ হয়ে ওঠে। ইহুদি ও ক্রিশ্চানদের মতো মুসলিমরাও অতিন্দ্রীয়বাদী আদর্শ হতে সরে এসে অধিকতর যুক্তিবাদী ধরনের ধার্মিকতা গ্রহণ করতে শুরু করেছিল।
ইউরোপে অল্পসংখ্যক মানুষ স্বয়ং ঈশ্বরের কাছ থেকে সরে আসতে শুরু করছিল। ১৭২৯ সালে একজন পল্লী পুরোহিত জ্যাঁ মেসলিয়ার আদর্শ জীবন যাপন করার পর নাস্তিক অবস্থায় মারা যান। ভলতেয়ার তার রেখে যাওয়া স্মৃতিকথা প্রচার করেছিলেন। মানুষের প্রতি তাঁর বিরক্তি ও ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখার অপারগতার কথা বলেছেন তিনি। মেসনিয়ার বিশ্বাস করতেন যে, নিউটনের অসীম মহাশূন্যই একমাত্র চিরন্তন বাস্তবতা: বস্তু ছাড়া আর কোনও কিছুর অস্তিত্ব নেই। দরিদ্রদের ওপর নির্যাতন চালানো ও তাদের ক্ষমতাহীন রাখার জন্য ধনীদের ব্যবহৃত অস্ত্র হচ্ছে ধর্ম। খৃস্টধর্ম ত্রিত্ববাদ ও অবতারবাদের মতো হাস্যকর মতবাদের কারণে আলাদা বৈশিষ্ট্য পেয়েছে। ঈশ্বরে তাঁর অবিশ্বাস এমনকি ফিলোসফদের কাছেও হজমের অতীত ঠেকেছিল। ভলতেয়ার বিশেষভাবে নাস্তিক্যবাদী অনুচ্ছেদগুলো বাদ দিয়ে আব্বিকে একজন ডেইস্ট-এ রূপান্তরিত করেছিলেন। শতাব্দীর শেষ নাগাদ অবশ্য কয়েকজন দার্শনিক সগর্বে নিজেদের নাস্তিক দাবি করেছেন, যদিও তাঁদের সংখ্যা ছিল বেশ কম। এটা ছিল একেবারে নতুন ধরনের একটা ব্যাপার । এতদিন পর্যন্ত নাস্তিক ছিল গালির ভাষা, আপনার শত্রুর উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দেওয়ার জন্যে নোংরা কথা বিশেষ। এবার তা গৌরবের তকমায় পরিণত হতে শুরু করছিল। স্কটিশ দার্শনিক ডেভিড হিউম (১৭১১-১৭৭৬) নতুন ধারণাটিকে যৌক্তিক উপসংহারে পৌঁছে দেন। বস্তুর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার উর্ধ্বে যাবার কোনওই প্রয়োজন নেই। আমাদের বোধের অতীত কোনও কিছুতে বিশ্বাস স্থাপনেরও দার্শনিক কোনও ভিত্তি নেই। ডায়ালগস কনসারনিং ন্যাচারাল রিলিজিয়ন-এ হিউম বিশ্বজগতের নকশা থেকে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণের যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, এটা সাদৃশ্যের যুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত যা অসম্পূর্ণ। যে কেউ বলতে পারে যে, প্রকৃতিতে আমরা যে নিয়ম শৃঙ্খলা অনুভব করি তা একজন বুদ্ধিমান তত্ত্বাবধায়কের দিকে ইঙ্গিত করে, কিন্তু তাহলে অশুভ ও প্রকাশিত বিশৃঙ্খলার ব্যাখ্যা দেওয়া হবে কীভাবে? এর কোনও যুক্তিপূর্ণ জবাব ছিল না; ১৭৫০ সালে ডায়ালগস-এর রচনাকারী হিউম বুদ্ধিমানের মতো অপ্রকাশিত রেখে দিয়েছিলেন। এর বছর খানেক আগে সাধারণ মানুষের কাছে পূর্ণাঙ্গ নাস্তিক্যবাদকে তুলে ধরা আ লেটার টু দ্য ব্লাইন্ড ফর দ্য ইউজ অভ দোজ হু সি-তে একই প্রশ্ন উত্থাপন করার দায়ে ফরাসি দার্শনিক দেনিস দিদেরো (১৭১৩-৮৪) কারারুদ্ধ হয়েছিলেন।
দিদেরো নিজেকে নাস্তিক হিসাবে স্বীকার করেননি। তিনি কেবল বলেছেন, ঈশ্বর আছেন কি নেই তা নিয়ে তিনি মাথা ঘামাননি। ভলতেয়ার তাঁর সম্পর্কে আপত্তি করলে তিনি জবাব দিয়েছিলেন: “আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি, যদিও, নাস্তিকদের সঙ্গে ভালোভাবেই চলতে পারি… বিষকে সুগন্ধী। লতাগুল্ম না ভাবাটা অত্যন্ত জরুরি; তবে ঈশ্বরে বিশ্বাস করা বা না করাটা মোটেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। একেবারে নির্ভুলভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করেছিলেন দিদেরো। ঈশ্বর যখন প্রবলভাবে অন্তরের বোধ হিসাবে থাকেন না, তখন আর তিনি অস্তিত্ববান নন। একই চিঠিতে দিদেরো যেমন তুলে ধরেছেন, দার্শনিকদের ঈশ্বর যিনি কখনও পৃথিবীর ব্যাপারে নাক গলান না, তাঁকে বিশ্বাস করা অর্থহীন। গোপন ঈশ্বর দিউস অতিসাসে পরিণত হয়েছেন: ‘ঈশ্বর থাকুন বা না থাকুন, তিনি সবচেয়ে সূক্ষ্ম ও অপ্রয়োজনীয় সত্যসমূহের সারিতে পৌঁছে গেছেন।[৬৬] পাসকালের বিপরীত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন তিনি; যিনি বাজি ধরার ব্যাপারটাকে অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে দেখেছিলেন, যা অগ্রাহ্য করা পুরোপুরি অসম্ভব। ১৭৪৬ সালে প্রকাশিত পেনসিস ফিলোসফিকস-এ দিদেরো পাসকালের ধর্মীয় অনুভূতিকে অতিমাত্রায় ভক্তিমূলক বলে নাকচ করে দিয়েছিলেন তিনি ও জেসাইটরা প্রবলভাবে ইশ্বর নিয়ে ভেবেছেন, কিন্তু ঈশ্বর সম্পর্কে তাঁদের ধারণা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এঁদের মাঝে কাকে বেছে নেওয়া যাবে? এমন একজন ঈশ্বর মর্জির একটা ব্যাপার ছাড়া আর কিছুই নন। এই পর্যায়ে, আ লেটার টু দ্য ব্লাইন্ড বেরুনোর তিন বছর আগে দিদেরো বিশ্বাস করতেন, বিজ্ঞান-একমাত্র বিজ্ঞান-নাস্তিক্যবাদকে বাতিল করতে পারে। পরিকল্পনা হতে সৃষ্টির যুক্তির এক নতুন মনোগ্রাহী ব্যাখ্যা খাড়া করেছিলেন তিনি। বিশ্বজগতের গতি পরীক্ষা করার বদলে মানুষের প্রতি তিনি প্রকৃতির অন্তর্গত কাঠামো পরীক্ষা করার তাগিদ দিয়েছিলেন। একটা বীজ প্রজাপতি বা কোনও পতঙ্গের গঠন এত জটিল যে দুর্ঘটনাবশত এর সৃষ্টি অসম্ভব। পেনসিস-এও দিদেরো বিশ্বাস করেছেন, যুক্তি ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ দিতে পারে। নিউটন ধর্মের সকল বোকামি ও কুসংস্কার ঝেড়ে ফেলেছিলেন: অলৌকিক ঘটনার জন্মদানকারী ঈশ্বর বাচ্চাদের আমরা যেসব দানোর কথা বলে ভয় দেখাই তাদের কাতারের।
