আমাদের কাছে যা জানা দুঃসাধ্য তার অস্তিত্ব আছে বলে জানা, যা সর্বোচ্চ প্রজ্ঞা ও অনন্য সৌন্দর্য হিসাবে নিজেকে প্রকাশ করে, আমাদের সমস্ত মনপ্রাণ যাকে কেবল একেবারে আদিম অবস্থায় উপলব্ধি করতে পারে-এই জ্ঞান, এই অনুভূতি সকল প্রকৃত ধর্মের মূল কথা। এই অর্থে এবং কেবল এই অর্থে আমি সমস্ত ধার্মিক মানুষের দলভুক্ত।[৬৩]
এই অর্থে বেশট-এর মতো অতিন্দ্রীয়বাদীদের আবিস্কৃত ধর্মীয় আলোকনকে যুক্তির কালের অন্যান্য অর্জনের অনুরূপ হিসাবে দেখা যেতে পারে; এটা সাধারণ নারী ও পুরুষকে আধুনিকতার নতুন জগতে কল্পনা নির্ভর পরিবর্তনে সক্ষম করে তুলছিল ।
১৭৮০র দশকে লিয়াদে-র র্যাবাই শেয়ুর যালমান (১৭৪৫-১৮১৩) হাসিদিজমের আবেগের বাহুল্যকে বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধানের দূরবর্তী হিসাবে দেখেননি। এক নতুন ধরনের হাসিদিজম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি যা ছিল অতিন্দ্রীয়বাদকে যৌক্তিক ধ্যানের সঙ্গে মেশানোর প্রয়াস। এটা হাবাদ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছিল, ঈশ্বরের তিনটি গুণ: হোখমাহ (প্রজ্ঞা) বিনাহ (বুদ্ধিমত্তা) এবং দা’আর্ত (জ্ঞান)-এর একটি গোলোকধাঁধা বিশেষ। দর্শনকে আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে সংযুক্তকারী পূর্ববর্তী অতিন্দ্রীয়বাদীদের মতো যালমান বিশ্বাস করতেন মেটাফিজিক্যাল অনুমান অত্যাবশ্যকীয় পূর্বশর্ত, কারণ এটা বুদ্ধিমত্তার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে। সর্ববস্তুতে ঈশ্বর উপস্থিতির মৌল হাসিদিয় দর্শন থেকে সূচিত তাঁর কৌশল এক প্রক্রিয়ায় অতিন্দ্রীয়বাদীকে উপলব্ধি করতে শেখায় যে, ঈশ্বর একমাত্র বাস্তবতা বা সত্তা। যালমান ব্যাখ্যা করেছেন: ‘অসীমের অবস্থান থেকে তিনিই আশীর্বাদপ্রাপ্ত, বাকি সমস্ত কিছু যেন আক্ষরিক অর্থেই কিছু না ও অস্তিত্বহীন।[৬৪] অপরিহার্য শক্তি ঈশ্বর ছাড়া সৃষ্ট জগতের কোনও অস্তিত্ব নেই। আমাদের সীমাবদ্ধ ধারণার কারণেই এর আলাদা অস্তিত্ব রয়েছে বলে মনে হয়, কিন্তু এটা একটা মায়া বা বিভ্রান্তি। সুতরাং, ঈশ্বর আসলে বাস্তবতার বিকল্প বলয় অধিকারকারী দুয়ে সত্তা নন: তিনি জগতের বাইরের কিছু নন। প্রকৃতপক্ষেই ঈশ্বরের দুয়েতার মতবাদ আমাদের মনের আরেকটি বিভ্রান্তি, যা বোধের অতীতে গমন অসম্ভব মনে করে। হাবাদের অতিন্দ্রীয়বাদী অনুশীলন ইহুদিদের অনুভূতিজাত ধারণা অতিক্রম করে সমস্ত কিছুকে ঈশ্বরের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে সাহায্য করবে। অনালোকিত কারও চোখে বিশ্বকে ঈশ্বর-শূন্য মনে হয়: কাব্বালাহর ধ্যান আমাদের চারপাশের জগতে মিশে থাকা ঈশ্বরকে আবিষ্কারে সাহায্য করার জন্যে যৌক্তিক সীমারেখা ভেঙে দেবে।
ঈশ্বরের নিকটবর্তী হাওয়ার জন্যে মানুষের মনের সামর্থের আলোকনের আস্থার অংশীদার হাবাদ, তবে এক্ষেত্রে প্যারাডক্স ও অতিন্দ্রীয়বাদ মনোসংযোগের প্রাচীন পদ্ধতির শরণাপন্ন হয়েছে। বেশটের মতো যালমানও বিশ্বাস করতেন, যে-কেউ ঈশ্বরের দর্শন লাভ করতে পারে: হাবাদ বিশেষ অভিজাত অতিন্দ্রীয়বাদী গোষ্ঠীর জন্যে ছিল না। এমনকি মানুষের আধ্যাত্মিক মেধার অভাব আছে মনে হলেও সে আলোকপ্রাপ্ত হতে পারবে। কাজটা অবশ্য কঠিন। যালমানের ছেলে, লুবাভিচের র্যাবাই দোভ বায়ের (১৭৭৩-১৮২৭), তাঁর ট্রাক্ট অন এক্সট্যাসি-তে যেমন ব্যাখ্যা করেছেন, শুরু করতে হবে অপূর্ণতার নিষ্ঠুর উপলব্ধি দিয়ে। কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক ধ্যান যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে আত্ম-বিশ্লেষণ, তোরাহ পাঠ ও প্রার্থনা যুক্ত থাকতে হবে। জগৎ সম্পর্কে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও কল্পনানির্ভর সংস্কার ত্যাগ করা কষ্টকর, অধিকাংশ মানুষই তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ত্যাগে অনীহ থাকে। একবার এই অহম বোধের ঊর্ধ্বে উঠতে পারলে, হাসিদ উপলব্ধি করতে পারবে যে, ঈশ্বর ছাড়া ভিন্ন। কোনও সত্তা নেই। ফানার অভিজ্ঞতা অর্জনকারী সুফীর মতো হাসি পরমানন্দ লাভ করবে। বায়ের ব্যাখ্যা করেছেন, নিজেকে সে অতিক্রম করে যাবে: তার গোটা সত্তা এমনভাবে বিলীন হয়ে যায় যে কিছুই অবশিষ্ট থাকে না, তার আত্ম-সচেতনতা বলতে কিছুই নেই।[৬৫] হাবাদের অনুশীলন কাব্বালাহকে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও আত্ম-জ্ঞানের একটা কৌশলে পরিণত করেছে, হাসিদকে পর্যায়ক্রমে অবতরণের শিক্ষা দিয়েছে যতক্ষণ না সে তার সত্তার কেন্দ্রে পৌঁছাচ্ছে। সেখানেই সে একমাত্র সত্য সত্তা ঈশ্বরকে আবিষ্কার করে। যুক্তি ও কল্পনার অনুশীলন দিয়ে মন ঈশ্বরকে আবিষ্কার করতে পারে, কিন্তু সেটা ফিলোসফস বা নিউটনের মতো বিজ্ঞানীদের বস্তুগত ঈশ্বর হবেন না, বরং সত্তার অবিচ্ছেদ্য অন্তস্থঃ সত্তা।
সপ্তম ও অষ্টাদশ শতাব্দী দুটি ছিল রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে বিপ্লবাত্মক উত্থান-পতনে ফুটে ওঠা যন্ত্রণাময় উগ্রতা ও চৈতন্যের উত্তেজনার একটা পর্যায়। মুসলিম বিশ্বে এসময়ে তুলনাযোগ্য কিছু ছিল না, যদিও কোনও পশ্চিমরা মানুষের পক্ষে এটা নির্ণয় করা কঠিন, কেননা অষ্টাদশ শতাব্দীর মুসলিম চিন্তা-চেতনা নিয়ে তেমন একটা গবেষণা হয়নি। সাধারণভাবে পাশ্চাত্য পণ্ডিতরা একে মামুলি বলে নাকচ করে থাকেন। এমনটি মনে করা হয় যে, ইউরোপে যখন আলোকন পর্ব চলছে তখন পতন শুরু হয়েছিল ইসলামের। অবশ্য সাম্প্রতিককালে এই দৃষ্টিভঙ্গি বড় বেশ সরলীকরণ বলে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। ১৭৬৭ সালে ব্রিটিশরা ভারতের নিয়ন্ত্রণ লাভ করলেও মুসলিম বিশ্ব তখনও পাশ্চাত্যের চ্যালেঞ্জের ব্যাপারে পুরোপুরি সজাগ হয়ে ওঠেনি। ভারতীয় সুফী দিল্লীর শাহ ওয়ালিউল্লাহ (১৭০৩-৬২) সম্ভবত প্রথম এই নতুন চেতনা অনুভব করেছিলেন। প্রভাবশালী চিন্তাবিদ ছিলেন তিনি, সংস্কৃতির বিশ্বজনীনতায় সন্দেহ ছিল তাঁর, তবে বিশ্বাস করতেন যে, ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত। শিয়াহ মতবাদ পছন্দ না করলেও তিনি শিয়াহ্ ও সুন্নীদের একটা ঐকমত্যে পৌঁছার প্রয়োজনীয়তায় বিশ্বাস করতেন। ভারতের নতুন অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে তিনি শরীয়াহর সংস্কারের প্রয়াস পেয়েছিলেন। ওয়ালিউল্লাহ্র যেন উপনিবেশবাদের পরিণাম সম্পর্কে পূর্বধারণা ছিল। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জিহাদে তাঁর পুত্র নেতৃত্ব দেবেন। তাঁর ধর্মীয় চিন্তা অধিকতর রক্ষণশীল ইবন আল আরাবীর ওপর দারুণভাবে নির্ভরশীল ছিল: ঈশ্বর ছাড়া মানুষ তার পূর্ণ সম্ভাবনায় বিকশিত হতে পারে না। ধর্মীয় বিষয়ে মুসলিমরা তখনও অতীতের সাফল্যের শরণেই তৃপ্ত ছিল, আর সুফীবাদ কতটা শক্তি অনুপ্রাণিত করতে পারে ওয়ালিউল্লাহ তার একটা নজীর। অবশ্য বিশ্বের বহু স্থানেই সুফীবাদ খানিকটা লুপ্ত হয়ে এসেছিল; আরবে এক নতুন সংস্কার আলোকন অতিন্দ্রীয়বাদ হতে সরে আসার আভাস দিয়েছে যা ঊনবিংশ শতাব্দীতে ঈশ্বর সম্পর্কে মুসলিম ধারণার বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয় ও পশ্চিমের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইসলামি সাড়ার আদর্শ হয়ে দাঁড়ায়।
