স্পিনোযা ও অপরাপর কিছু চরমপন্থী ক্রিশ্চানের বিপরীতে বেশট সবকিছুকে ঈশ্বর দাবি করেননি, বরং বলেছেন সকল সত্তা ঈশ্বরে বিরাজমান ছিল, যিনি তাদের প্রাণ ও সত্তা দিয়েছেন। তিনি সকল বস্তুর অস্তিত্ব বজায় রাখা মূল শক্তি। তিনি এটা মনে করতেন না যে দেভেকুদ অনুশীলনের মাধ্যমে হাসিদিম স্বর্গীয় হয়ে যাবে বা ঈশ্বরের সঙ্গে মিশে যাবে-এ ধরনের নির্বুদ্ধিতা সকল ইহুদি অতিন্দ্রীয়বাদীদের চোখেই বাড়াবাড়ি ঠেকেছে। বরং হাসিদিম ঈশ্বরের নিকটবর্তী হয়ে তার উপস্থিতি সম্পর্কে সজাগ হবে। বেশিরভাগ মানুষই ছিল সাধারণ, গড়পড়তা; প্রায়শঃই নিজেদের তারা জাকের সঙ্গে প্রকাশ করেছে, কিন্তু একটা ব্যাপারে তারা সচেতন ছিল: তাদের মিথলজিকে আক্ষরিক অর্থে নেওয়া যাবে না । দার্শনিক বা তালমুদিয় আলোচনার চেয়ে গল্প কাহিনী বেশি পছন্দ করত তারা; গল্প-কাহিনীকে সত্য ও যুক্তির সঙ্গে সম্পর্কহীন অভিজ্ঞতা বা অনুভূতিকে বোঝানোর সেরা উপায় হিসেবে দেখেছে। ঈশ্বর ও মানবজাতির পারস্পরিক নির্ভরশীলতাকে তুলে ধরার এক কল্পনানির্ভর প্রয়াস ছিল তাদের দর্শন। ঈশ্বর কোনও বাহ্যিক বস্তুগত সত্তা ছিলেন নাঃ প্রকৃতপক্ষে হাসিদিমের বিশ্বাস ছিল যে, তারা ঈশ্বরের বিলুপ্তির পর এক অর্থে তাকে আবার নতুন করে গড়ে তুলছে। নিজেদের মাঝে ঈশ্বর-তুল্য স্ফুলিঙ্গের উপস্থিতি সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠে তারা আরও পূর্ণাঙ্গ মানুষ হয়ে উঠবে। এই অন্তদৃষ্টি কাব্বালাহর পরিভাষায় প্রকাশ করেছে তারা। বেশটের উত্তরসুরি দোব বায়ের বলেছেন, ঈশ্বর ও মানুষ একক সত্তা ছিল; সৃষ্টির সময় ঈশ্বর যেমন ইচ্ছা করেছিলেন, মানুষ কেবল তখনই আদমে পরিণত হবে, যেদিন সে অস্তিত্বের বাকি অংশের সঙ্গে বিচ্ছেদের অনুভূতি বিস্মৃত হয়ে “ইযেকিয়েলের প্রত্যক্ষ করা সিংহাসনে আসীন আদিম মানুষের মহাজাগতিক অবয়বে’৫৮ পরিণত হবে। এটা ছিল মানুষকে তার নিজস্ব দুজ্ঞেয় মাত্রায় সচেতন করে তোলা আলোকনের গ্রিক বা বুদ্ধ বিশ্বাসের পরিপূর্ণ ইহুদি প্রকাশ।
গ্রিকরা ক্রাইস্টের অবতারবাদ ও দেবতায় পরিণত হবার মতবাদের। মাধ্যমে এর প্রকাশ ঘটিয়েছিল। হাসিদিম অবতারদের নিজস্ব ধরণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। হাসিদিয় র্যাবাই-যাদ্দিক তাঁর সময়ের অবতারে পরিণত হয়েছেন, স্বর্গ পৃথিবীর একটি যোগসূত্র তিনি, স্বর্গীয় সত্তার প্রতিনিধি। চেরনোবিলের র্যাবাই মেনাহিম নাহুম (১৭৩০-১৭৯৭) যেমন লিখেছেন, যাদ্দিক ‘প্রকৃতই ঈশ্বরের অংশ এবং যেমন বলা হয়েছে, তার সঙ্গেই অবস্থান করেন।৫৯ ক্রিশ্চানরা যেমন ঈশ্বরের নিকটবর্তী হতে ক্রাইস্টকে অনুকরণ করে, তেমনি একজন হাসিদ যাদ্দিককে অনুকরণ করেছে, যিনি ঈশ্বরের কাছে আরোহণ করেছেন ও নিখুঁতভাবে দেভেকুদ অনুশীলন করেছেন। আলোকন যে সম্ভব তিনি তার জীবন্ত নজীর বা প্রমাণ। এই যাদ্দিক যেহেতু ঈশ্বরের নিকটবর্তী, সেহেতু একজন হাসিদ তার মাধ্যমে বিশ্ব জগতের প্রভুর কাছে পৌঁছতে পারে । যাদ্দিক যখন বেশট সম্পর্কে কোনও গল্প বলতেন বা তোরাহ্র কোনও পঙক্তির ব্যাখ্যা দিতেন, চারপাশে ভিড় করে প্রতিটি শব্দ যারপরনাই মনোযোগের সাথে শুনত তারা। অত্যুৎসাহী ক্রিশ্চান গোষ্ঠীগুলোর মতো হাসিদিজম ব্যক্তিগত পর্যায়ের ধর্ম ছিল না, বরং গভীরভাবে সামাজিক ছিল। দলবদ্ধভাবে হাসিদিমরা গুরুর সঙ্গে পরম একত্মতায় আরোহণের জন্যে যাদ্দিককে অনুসরণ করার প্রয়াস পেত। এখানে বিস্ময়ের কিছু নেই যে, পোল্যান্ডের অপেক্ষাকৃত বেশি। অর্থডক্স র্যাবাইগণ দীর্ঘদিন যাবত তোরাহর অবতার হিসেবে বিবেচিত শিক্ষিত র্যাবাইদের এড়িয়ে যাওয়া এই ব্যক্তিক কাল্টের ব্যাপারে শঙ্কিত হয়ে উঠেছিলেন। বিরোধী পক্ষের নেতৃত্বে ছিলেন ভিলনা একাডেমি অভ গান বা প্রধান র্যাবাই এলিযাহ বেন সলোমন যালমান (১৭২০-১৭৯৭)। শ্যাব্বেতাই বিপর্যয় বহু ইহুদিকে অতিন্দ্রীয়বাদের প্রতি বৈরী ভাবাপন্ন করে তুলেছিল। ভিলনার গাওনকে প্রায়শঃই অধিকতর যৌক্তিক ধর্মের প্রবক্তা হিসাবে দেখা হয়েছে। তা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন প্রবলভাবে কাব্বালিস্ট ও তালমুদ বিশেষজ্ঞ। তাঁর ঘনিষ্ঠ অনুসারী ভোলোঝিনের র্যাবাই হাঈম ‘গোটা দ্য যোহারের ওপর পাণ্ডিত্যের প্রশংসা করেছেন…যা তিনি প্রেমের শিখা ও স্বর্গীয় আভিজাত্যের ‘চমৎকার দেভেকুদ ও পবিত্রতা এবং নির্ভেজালত্বের সঙ্গে পাঠ করেছেন।৬০ যখনই ইসাক লুরিয়ার কথা বলতেন, সারা দেহ থরথর কেঁপে উঠত তাঁর। অসাধারণ স্বপ্ন ও প্রত্যাদেশের অভিজ্ঞতা ছিল তার, তাসত্ত্বেও জোর দিয়ে। বলতেন তোরাহ্ পাঠই ঈশ্বরের সঙ্গে মিলিত হবার তাঁর প্রধান উপায় ছিল । অবশ্য সুপ্ত অনুভূতি প্রকাশ করার ক্ষেত্রে স্বপ্নের উদ্দেশ্যের চমৎকার উপলব্ধি দেখিয়েছিলেন তিনি। র্যাবাই হাঈম আরও বলেছেন: “তিনি বলতেন কেবল এ কারণেই ঈশ্বর নিদ্রার সৃষ্টি করেছেন, মানুষ যাতে অন্তদৃষ্টি অর্জন করতে পারে, যা আত্মা দেহের সঙ্গে আবদ্ধ থাকা অবস্থায় প্রচুর পরিশ্রম ও প্রয়াস সত্ত্বেও অর্জন করতে পারে না, কারণ দেহ হচ্ছে পৃথককারী কোনও পর্দার মতো।
আমরা যেমন ভাবতে চাই আসলে কিন্তু অতিন্দ্রীয়বাদ ও যুক্তিবাদের মধ্যে তেমন বিশাল পার্থক্য নেই। ঘুম সম্পর্কে গাওনের মন্তব্য অবচেতন মনের ভূমিকার পরিষ্কার ধারণা তুলে ধরে আমরা সবাই আমাদের বন্ধু-বান্ধবকে কাজের সময় সমাধান মেলে না এমন সমস্যার সমাধানের আশায় ‘sleep on’-এর তাগিদ দিই। আমাদের মন গ্রাহী ও প্রসন্ন অবস্থায় থাকলে মনের গভীর থেকে বিভিন্ন ধারণা উঠে আসে। আর্কিমিদিসের মতো বৈজ্ঞানিকদের বেলায়ও এ ধরনের অভিজ্ঞতা দেখা গেছে, গোসলের চৌবাচ্চায় তার বিখ্যাত সূত্রটি আবিষ্কার করেছিলেন তিনি। একজন সৃজনশীল দার্শনিক বা বিজ্ঞানীকে অতিন্দ্রীয়বাদীর মতো অসৃষ্ট বাস্তবতা ও অজ্ঞাত মেঘ ভেদ করার আশায় অন্ধকার জগতের মুখোমুখি হতে হয়; যতক্ষণ যুক্তি আর ধারণা নিয়ে নাড়াচাড়া করেন, ততক্ষণ স্বভাবতই প্রতিষ্ঠিত চিন্তার ধরন বা ধারণায় বন্দি হয়ে থাকেন তাঁরা। প্রায়শঃই তাঁদের আবিষ্কারসমূহকে বাইরে থেকে প্রদত্ত মনে হয়। তারা অনুপ্রেরণা ও দিব্যদৃষ্টির কথা বলেন। এভাবেই এডওয়ার্ড গিবন (১৭৩৭-৯৫) ধর্মীয় উদ্দীপনাকে ঘৃণা করলেও রোমে ক্যাপিটোলের ধ্বংসাবশেষের মাঝে ঘুরে বেড়ানোর সময় মুহূর্তের জন্যে অনেকটা স্বপ্নবিষ্ট হয়ে পড়েন যা তাঁকে দ্য ডিক্লাইন অ্যান্ড ফল অভ দ্য রোমান এম্পায়ার রচনায় অনুপ্রাণিত করেছিল। এই অনুভূতির ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসবিদ আর্নল্ড টয়েনবি একে কমিউনিয়ন’ হিসাবে বর্ণনা করেছেন: ‘নিজের মাঝে বয়ে যাওয়া ইতিহাসের জোরাল ধারা সম্পর্কে প্রত্যক্ষভাবে সচেতন ছিলেন তিনি; এক বিশাল তরঙ্গের ধারায় নিজের জীবন ফুঁসে ওঠার ব্যাপারেও সজাগ ছিলেন। এই ধরনের অনুপ্রেরণার মুহূর্ত, উপসংহার টেনেছেন টয়েনিব, “বিটিফিক ভিশনের বা স্বর্গ সুখ দিব্যদৃষ্টির অভিজ্ঞতা লাভকারীরা যেমন বর্ণনা দিয়েছে তার অনুরূপ।৬২ আলবার্ট আইনস্টাইনও বলেছেন, অতিন্দ্রীয়বাদ সকল প্রকৃত শিল্পকলা ও বিজ্ঞানের বীজ বপনকারী’:
