ইসরায়েল বেন এলিয়ের পণ্ডিত ছিলেন না। তালমুদ পাঠের চেয়ে বরং বনে জঙ্গলে হাঁটতে ও বাচচাঁদের গল্প শোনাতেই বেশি পছন্দ করতেন। কার্পেথিয়ান পর্বতের দক্ষিণে পোল্যান্ডে একটা কুটিরে সস্ত্রীক অতি গরীবি হালে থাকতেন তিনি। কিছুদিন চুনাপাথর খুঁড়ে তুলে কাছের শহরে লোকজনের কাছে বিক্রি করেছেন। এরপর স্বামী-স্ত্রী মিলে একটা সরাইখানা দেখাশোনা করেন। অবশেষে মোটামুটি ছত্রিশ বছর বয়সে তিনি দাবি করে বসেন যে, তিনি ফেইদ হীলার ও একসরসিস্টে পরিণত হয়েছেন। পোল্যান্ডের গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে কৃষক ও শহরবাসীদের ভেষজ ওষুধ, তাবিজ ও প্রার্থনার মাধ্যমে চিকিৎসা করে সুস্থ করে তোলেন তিনি। সেই সময় এরকম বহু হীলার ঈশ্বরের নামে রোগমুক্তির দাবি করেছিল। এ সময়ে ইসরায়েল এবার ‘বাআল শেম তোভ’ (শুভ নামের পণ্ডিত)-এ পরিণত হন। নিজে কখনও দাবি না করলেও অনুসারীরা তাকে র্যাবাই ইসরায়েল বাআল শেম হতাভ বা সোজা কথায় দ্য বেশট ডাকতে করতে শুরু করে। অধিকাংশ হীলার জাদুটোনাতেই সন্তুষ্ট থাকলেও ‘বেশট’ অতিন্দ্রীয়বাদীও ছিলেন। শ্যাব্বেতাই যেভি ঘটনা তাঁকে অতিন্দ্রীয়বাদের সঙ্গে মেসিয়ানিজমকে মিলিয়ে ফেলার বিপদ সম্পর্কে শিক্ষা দিয়েছিল বলে তিনি কাব্বালাবাদের এমন একটি পুরোনো রূপের আশ্রয় নিয়েছিলেন যা কোনও গোষ্ঠী বিশেষের নয় বরং সবার উপযোগী ছিল। স্বর্গীয় লিঙ্গের পৃথিবীতে পতনকে বিপর্যয় হিসাবে না দেখে বেশট তার হাসিদিমদের ইতিবাচক দিকে দৃষ্টি দেওয়ার শিক্ষা দিয়েছিলেন। এই স্ফুলিঙ্গগুলো সৃষ্টির প্রতিটি জিনিসের সঙ্গে মিশে আছে; এর মানে গোটা পৃথিবী ঈশ্বরের সত্তায় পরিপূর্ণ। একজন নিবেদিতপ্রাণ ইহুদি দৈনন্দিন জীবনের খুঁটিনাটি প্রতিটি কাজে-খাওয়া দাওয়া, পান করা বা স্ত্রীকে ভালোবাসা-ঈশ্বরকে অনুভব করতে পারে, কারণ স্বর্গীয় স্ফুলিঙ্গ সর্বত্রই বিরাজ করে। সুতরাং, নারী ও পুরুষ দূরাত্মা দিয়ে ঘেরাও হয়ে নেই, বরং ঈশ্বর পরিবেষ্টিত; হাওয়ার প্রতিটি ধাক্কা বা ঘাসের ডগায় যিনি উপস্থিত আছেন; তিনি চান ইহুদিরা আস্থা ও আনন্দের সাথে তাঁর শরণাপন্ন হোক।
বিশ্বের মুক্তির লুরিয়া প্রস্তাবিত মহাপ্রকল্প ত্যাগ করেছেন বেশট। হাসিদ কেবল তার ব্যক্তি জীবনে আটকে পড়া-তার স্ত্রী, দাস, আসবাব ও খাদ্য ইত্যাদি বিভিন্ন বস্তুতে স্বর্গীয় স্ফুলিঙ্গের পুনর্মিলনের জন্যে দায়ী। বেশটের অন্যতম অনুসারী হিল্লেল যিতলিন যেমন ব্যাখ্যা করেছেন, তার বিশেষ পরিবেশে হাসিদের এক অনন্য দায়িত্ব রয়েছে, যা কেবল সে একাই অনুসরণ করতে পারে: প্রত্যেক মানুষ তার আপন জগতের ত্রাণকর্তা। সে কেবল নিজেকেই ধারণ করে ও কেবল সেই ব্যক্তিগতভাবে যা ধারণ ও অনুভব করার জন্যে নির্ধারিত হয়েছে তা ধারণ ও অনুভব করতে দায়বদ্ধ।৫৪ কাব্বালিস্টরা অতিন্দ্রীয়বাদীকে যেদিকে চোখ ফেরানো যায় সেখানেই ঈশ্বরের উপস্থিতি সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠতে সহায়তা করার জন্যে মনোসংযোগের এক অনুশীলন আবিষ্কার করেছিল। সপ্তদশ শতাব্দীর এক সেফেদ কাব্বালিস্ট যেমন ব্যাখ্যা করেছেন, অতিন্দ্রীয়বাদীদের নির্জনে বসে তোরাহ্ পাঠে বিরতি দিয়ে মাথার ওপর শেকিনাহ্র দ্যুতি কল্পনা করতে হবে, যেন তা চারদিকে প্রবাহিত হয়ে চলেছে আর তারা সেই জ্যোতির মাঝখানে বসে আছে।৫৫ ঈশ্বর-উপস্থিতির অনুভূতি তাদের মাঝে কম্পমান মোহাবেশময় আনন্দ বয়ে আনত। বেশট অনুসারীদের শিক্ষা দিয়েছিলেন যে, এই পরমান্দ কেবল সুবিধাপ্রাপ্ত অতিন্দ্রীয়বাদী গোষ্ঠীর জন্যে নির্ধারিত নয়, বরং প্রত্যেক ইহুদির দায়িত্ব রয়েছে দেভেকুদের চর্চা করে সর্বত্র ঈশ্বরের উপস্থিতি সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠা: আসলে দেভেকুদে ব্যর্থতা বহুঈশ্বরবাদীতারই শামিল, ঈশ্বর ছাড়া যে আর কোনও কিছুর প্রকৃত অস্তিত্ব নেই তার অস্বীকৃতি। এতে করে প্রশাসনের সঙ্গে বেশটের বিরোধ সৃষ্টি হয়, যাদের ভয় হয়েছিল যে, ইহুদিরা হয়তো কার্যত বিপজ্জনক ও আত্মকেন্দ্রীক এসব ভক্তিবাদে সাড়া দিয়ে তোরাহ্ পাঠ বর্জন করে বসবে।
অবশ্য হাসিদিম দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল, কেননা তা আশাহীন ইহুদিদের মাঝে আশার বাণী নিয়ে এসেছিল: এই আদর্শ গ্রহণকারীদের অনেকেই ছিল প্রাক্তন শ্যাব্বেতিয়। বেশট চাননি তাঁর অনুসারীরা তোরাহ্ বর্জন করুক বরং এর এক নতুন অতিন্দ্রীয়বাদী ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন তিনিঃ মিতযভাহ (নির্দেশনা) একটা বন্ধন বোঝায়। কোনও হাসিদ যখন দেভেকুদ অনুশীলনের সময় আইনের একটি নির্দেশনা পালন করে তখন সে সকল সত্তার মূল ঈশ্বরের সঙ্গে নিজেকে আবদ্ধ করে, আবার একই সময়ে সে তার জীবন বা বস্তু সামগ্রীতে বিরাজমান স্বর্গীয় লিঙ্গকে গডহেডের সঙ্গে পুনর্মিলিত করে। তোরাহ্ বহু আগে হতেই ইহুদিদের মিতযভোতের অনুশীলন করে জগতকে পরিশুদ্ধ করায় উৎসাহ দিয়ে এসেছে। বেশট কেবল এর অতিন্দ্রীয়বাদী ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন। জগতকে রক্ষা করার অতিউৎসাহের কারণে হাসিদিম কখনও কখনও কিছুটা সন্দেহজনক পথেও অগ্রসর হয়েছে: অনেকেই তামাকে অবস্থান করা স্ফুলিঙ্গকে উদ্ধার করতে অতি-ধূমপায়ীতে পরিণত হয়েছিল! বেশটের আরেকজন পৌত্র মেদযিযের বারুচ (১৭৫৭-১৮১০), আসবাব ও অন্যান্য বস্তুর বিশাল সংগ্রহ ছিল, এসব অসাধারণ জিনিসের স্রেফ স্ফুলিঙ্গের ব্যাপারে নিজেকে আগ্রহী বলে। ওসব বিলাস সামগ্রী রাখার ন্যায্যতা প্রতিপন্ন করার প্রয়াস পেয়েছিলেন তিনি। অ্যাপট-এর আব্রাহাম জোশুয়া হেশেল (মৃ. ১৮২৫) খাবারের স্ফুলিঙ্গকে পুনরুদ্ধার করতে প্রচুর খাবার খেতেন।৫৬ এই হাসিদিয় প্রয়াসকে নিষ্ঠুর ও বিপদসঙ্কুল পৃথিবীতে পথ খোঁজার প্রচেষ্টা হিসাবে দেখা যেতে পারে। দেভেকুদের অনুশীলনসমূহ অভ্যন্তরীণ মহিমা আবিষ্কারের লক্ষ্যে জগতের পরিচয়ের পর্দা খসানোর কল্পনা নির্ভর প্রয়াস ছিল। এই প্রয়াস সমসাময়িক ইংরেজ রোমান্টিক্স উইলিয়াম ওঅর্ডসওঅর্থ (১৭৭০ ১৮৫০) ও স্যামুয়েল টেয়লর কোলরিজ (১৭৭২-১৮৩৪)-এর কল্পনানির্ভর দৃষ্টিভঙ্গির চেয়ে দুরবর্তী ছিল না যাঁরা দৃশ্যমান সবকিছু একত্রিতকারী ‘একক জীবনে’র উপলব্ধি করেছিলেন। নির্বাসন ও নিপীড়ন-নির্যাতনের দুঃখ সত্ত্বেও হাসিবাদ তাদের প্রত্যক্ষ করা প্রতিটি জিনিসকে সৃষ্ট জগতের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত স্বর্গীয় শক্তি হিসাবে দেখার বিষয়ে সচেতন হয়ে উঠেছিল, যা জগতকে এক মহিমাময় স্থানে পরিণত করেছে। ক্রমশঃ বস্তু জগৎ তাৎপর্যহীনতায় পর্যবসিত হবে; সমস্ত কিছু এপিফ্যানিতে পরিণত হবে। উহ্যালির মোজেস তেইতেলবম (১৭৫৯-১৮৪১) বলেছেন, মোজেস যখন ‘জ্বলন্ত ঝোঁপ’ দেখেছিলেন, তিনি কেবল স্বর্গীয় উপস্থিতি প্রত্যক্ষ করেছেন যা প্রতিটি ঝোঁপকে পুড়িয়ে আবার এর সত্তা টিকিয়ে রাখেন। গোটা পৃথিবী যেন মহাজাগতিক আলোয় ভরে আছে বলে মনে হয়; হাসিদিম মোহাবিষ্টতার আনন্দে চিৎকার করে ওঠে, হাততালি দেয়, গান গাইতে শুরু করে। কেউ কেউ এমনকি ডিগবাজিও খায়, দেখিয়ে দেয় যে তাদের দিব্য দর্শনের প্রতাপ গোটা পৃথিবীকে উল্টে দিয়েছে।
