ফ্রাঙ্ক কাব্বালিস্ট ছিলেন না, কিন্তু কারদাযোর ধর্মতত্ত্বের রূঢ় ভাষ্য প্রচার করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শ্যাব্বেতিয় ট্রিনিটির তিন পারযুফিমের প্রত্যেকটি ভিন্ন মেয়াহর সারফত পৃথিবীতে উপস্থাপিত হবেন। শ্যাব্বেতাই যেভি, ফ্রাঙ্ক ‘প্রথম জন’ আখ্যায়িত করেছেন, ছিলেন ‘শুভ ঈশ্বরের অবতার, যিনি কারদাযোর আতিকা কাদিশা (পবিত্র প্রাচীনজন); স্বয়ং তিনি ইসরায়েলের ঈশ্বর দ্বিতীয় পারযুফের অবতার ছিলেন। তৃতীয় মেসায়াহ, যিনি শেকিনাহকে ধারণ করবেন, তিনি হবেন একজন মহিলা, ফ্রাঙ্ক যাকে ‘দ্য ভার্জিন’ আখ্যায়িত করেছেন। বর্তমানে অবশ্য পৃথিবী অশুভ শক্তির করায়ত্ত রয়েছে। মানুষ যতক্ষণ না ফ্রাঙ্কের নিহিলিস্টিক গস্পেল মেনে নিচ্ছে ততক্ষণ মুক্তি মিলবে না । জ্যাকবের মই ছিল ইংরেজি ‘V আকৃতির: ঈশ্বরের কাছে আরোহণ করার জন্যে আগে জেসাস ও শ্যাব্বেইয়ের মতো অতলে নামতে হবে: ‘এটুকু আমি তোমাদের বলি, ঘোষণা দিয়েছেন ফ্রাঙ্ক, তোমরা জান, ক্রাইস্ট বলেছেন, তিনি শয়তানের কবল হতে পৃথিবীকে উদ্ধার করতে এসেছেন, কিন্তু আমি এসেছি পৃথিবীকে সব ধরনের নিয়ম ও প্রথা থেকে মুক্তি দিতে। আমার দায়িত্ব এসব কিছুকে ধ্বংস করা যাতে শুভ ঈশ্বর নিজেকে প্রকাশ করতে পারেন।[৫১] ঈশ্বরকে যারা আবিষ্কার করতে চায় ও অশুভ শক্তির হাত থেকে নিজেদের মুক্ত করতে চায় তাদের নেতাকে পবিত্র বিবেচিত সকল নিয়ম-কানুন লজ্ঞান করে অতলে নামতে হবে: ‘আমি তোমাদের বলছি, যোদ্ধাদের অবশ্যই ধর্মহীন হতে হবে, যার মানে, তাদের নিজস্ব ক্ষমতায়ই মুক্তি লাভ করতে হবে।[৫২]
এই শেষ কথাটার ভেতর আমরা ফ্রাঙ্কের রহস্যময় দর্শন ও যুক্তিবাদী আলোকন পর্বের যোগাযোগ বুঝতে পারি। যেসব পোলিশ ইহুদি তাঁর গস্পেল গ্রহণ করেছিল তারা স্পষ্টই ইহুদিদের জন্যে আর নিরাপদ নয় বলে বিবেচিত পৃথিবীর ভীতিকর পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেওয়ার বেলায় ধর্মের কোনও রকম সাহায্য বা সহযোগিতা পাচ্ছিল না। ফ্রাঙ্কের মৃত্যুর পর ফ্রাঙ্কবাদ এর নৈরাজ্যবাদের সিংহভাগই হারিয়ে ফেলে, রয়ে গিয়েছিল কেবল ঈশ্বরের অবতার হিসাবে ফ্রাঙ্কের ওপর বিশ্বাস ও শোলেম যাকে বলেছেন ‘এক প্রবল, আলোকময় মুক্তির অনুভূতি।[৫৩] ফরাসী বিপ্লবকে তারা তাদের পক্ষে ঈশ্বরের নির্দশন হিসাবে দেখেছে: রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য নীতিশাস্ত্র বিরোধিতা ত্যাগ করে পৃথিবীকে নতুনভাবে গড়ে তুলবে এমন এক অভ্যুত্থানের স্বপ্ন দেখেছে। একইভাবে বিংশ শতাব্দীর প্রাথমিক বছরগুলোয় ইসলাম ধর্ম গ্রহণকারী দনমেহদের প্রায়শঃই সক্রিয় তরুণ তুর্কি হতে দেখা গেছে; অনেকেই কামাল আতাতুর্কের সেকুলার তুরস্কে পুরোপুরি মিশে গিয়েছিল । বাহ্যিক অনুসরণের প্রতি সকল শ্যাব্বেতিয়বাদীর অনুভূত বৈরিতা ছিল এক অর্থে গোটা পরিবেশের প্রতি বিদ্রোহ। পশ্চাদপদ ও অস্পষ্ট ধর্ম হিসাবে প্রতীয়মান শ্যাব্বেতিয়বাদ প্রাচীন পন্থা থেকে নিজেদের মুক্ত করে নতুন নতুন ধারণা গ্রহণে সক্ষম করে তুলেছিল তাদের। বাহ্যিকভাবে ইহুদিবাদের প্রতি বিশ্বস্ত রয়ে যাওয়া মধ্যপন্থী শ্যাব্বেতিয়রা প্রায়শঃই ইহুদি আলোকনের অগ্রপথিক ছিল; ঊনবিংশ শতাব্দীতে সংস্কৃত ইহুদিবাদ সৃষ্টিতেও সক্রিয় ছিল তারা। প্রায়শঃই এইসব মাসকিলিমদের ধারণা প্রাচীন ও নতুন ধারণার মিশেল হতে দেখা গেছে। এভাবেই প্রাগের জোসেফ ওয়েস্ত, ১৮০০ সালের দিকে লিখছিলেন তিনি, বলেছেন, মোজেস মেলেসন, ইম্যানুয়েল কান্ট, শ্যাব্বেতাই যেভি ও ইসাক লুরিয়া তার আদর্শ ছিলেন। সবার পক্ষে বিজ্ঞান ও দর্শনের কঠিন পথ ধরে আধুনিকতায় উত্তোরণ সম্ভব নয়; চরমপন্থী ক্রিশ্চান ও ইহুদিদের অতিন্দ্রীয়বাদী বিশ্বাস তাদের এক ধর্মনিরপেক্ষতার দিকে অগ্রসর হতে সক্ষম করে তুলবে।
জ্যাকব ফ্রাঙ্ক যখন তার নিহিলিস্টিক গস্পেল প্রণয়ন করছিলেন, ঠিক সেই একই সময়ে অন্য পোলিশ ইহুদিরা একেবারে ভিন্ন এক মেসায়াহুকে আবিস্কার। করেছিল। ১৬৪৮ সালের হত্যালীলার পর থেকে পোলিশ ইহুদিদের ভেতর স্থানচ্যুতি ও মনোবলহীনতার এমন এক বোধ জেগে উঠেছিল যা স্পেন থেকে সেফার্দিমের নির্বাসনের মতোই তীব্র ছিল। পোল্যান্ডের বহু শিক্ষিত ও আধ্যাত্মিক পরিবার হয় নিহত কিংবা পশ্চিম ইউরোপের তুলনামূলকভাবে নিরাপদ অঞ্চলে অভিভাসী হয়েছিল। হাজার হাজার ইহুদি উনুল, উদ্বাস্ত হয়ে গিয়েছিল, তাদের অনেকেই যাযাবরে পরিণত হয়, স্থায়ী বসতি গড়ে তোলার পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় শহর থেকে শহরে ঘুরে বেরিয়েছে তারা। সেসব র্যাবাই রয়ে গিয়েছিলেন, তাঁরা ছিলেন নিম্নমানের এবং গবেষণা দিয়ে বাইরের জগতের রূঢ় বাস্তবতার থেকে নিজেদের আড়াল করার প্রয়াস পেয়েছিলেন তাঁরা। ভবঘুরে কাব্বালিস্টরা ঈশ্বর হতে বিচ্ছিন্ন আক্রা সিত্ৰা বা অপর পক্ষের ভয়ঙ্কর অন্ধকার-এর কথা বলে বেড়িয়েছে। শ্যাঝেতাই যেভি বিপর্যয়ও সাধারণের মাঝে বিভ্রান্তি ও বৈষম্যের ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল। ইউক্রেনের কিছু সংখ্যক ইহুদি ক্রিশ্চান পিয়েটিস্ট আন্দোলনে প্রভাবিত হয়েছিল, রাশিয়ান অর্থডক্স চার্চেও যার প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল। ইহুদিরাও একই রকম ক্যারিশমাটিক ধর্ম প্রণয়ন শুরু করেছিল। ইহুদিদের ভেতর মোহাবিষ্টতা বা পরমান্দের অনুভূতির কথাবার্তা শোনা যাচ্ছিল, প্রার্থনার সময় হাততালি দিয়ে গান গাইছিল তারা। ১৭৩০-এর দশকে ঐ মোহাবিষ্টদের একজন এই অন্তরের ইহুদি ধর্মের অবিসংবাদিত নেতা হিসাবে আবির্ভূত হন ও হাসিবাদ নামে পরিচিত দর্শনের প্রতিষ্ঠা করেন।
