দুজন ঈশ্বর পারস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন কীভাবে? ইহুদি একেশ্বরবাদ বাদ না দিয়েই বাড়তি এই ঈশ্বরকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে কারদাযযা একটি ত্রিত্ববাদী ধর্মতত্ত্বের জন্ম দিয়েছিলেন। তিনটি হিপোস্তাসে (অবয়ব) বা পারযুফিম সম্পন্ন একজন গডহেড ছিলেন: এগুলোর প্রথমটির নাম ছিল আতিকা কাদিশা, পবিত্র প্রাচীনজন। ইনি ছিলেন প্রথম কারণ। প্রথমটি হতে উৎসারিত দ্বিতীয় পারযুফ, মালকা কাদিশা নামে আখ্যায়িত; তিনি ছিলেন ইসরায়েলের ঈশ্বর। তৃতীয় পারযুফটি শেকিনাহ, যিনি, ইসাক লুরিয়া যেমন বলেছেন, গডহেড হতে নির্বাসিত হয়েছিলেন। কারদাযযা বলেছেন, এই ধর্মের তিনটি গেরো, তিনটি আলাদা ঈশ্বর ছিলেন না, বরং রহস্যজনকভাবে এক, যেহেতু তারা একই গডহেডে প্রকাশিত। মধ্যপন্থী শ্যাব্বেতিয় ছিলেন কারদাযযা। ধর্ম পরিবর্তনকে দায়িত্ব ভাবেননি। তিনি, কারণ শ্যাব্বেতাই যেভিই তাঁর পক্ষে এই যন্ত্রণাদায়ক কাজটি সম্পন্ন করেছেন। কিন্তু ট্রিনিট্রির প্রস্তাবনা রেখে একটা টাবু ভঙ্গ করছিলেন তিনি। শত শত বছর ধরে ইহুদিরা ট্রিনিটির মতবাদকে ঘৃণা করে এসেছে, তারা একে ব্লাসফেমাস ও বহুঈশ্বরবাদীতা হিসাবে দেখেছে। কিন্তু বিস্ময়কর সংখ্যায় ইহুদি এই নিষিদ্ধ দর্শনে আকৃষ্ট হয়েছিল । পৃথিবীর কোনও পরিবর্তন ছাড়াই বছরের পর বছর পেরিয়ে যাওয়ায় শ্যাব্বেতিয়রা তাদের মেসিয়ানিক প্রত্যাশায় পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়েছিল। নেহেমিয়াহ হায়িম, স্যামুয়েল প্রিমো ও জোনাথান ইবেস্যদের মতো শ্যাব্বেতিয়রা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন যে, ‘গডহেডের রহস্য (সদ হা-ইলাহাত) ১৬৬৬ সালে পুরোপুরি প্রকাশিত হয়নি। লুরিয়ার ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী শেকিনাহ ‘ধুলি হতে উঠতে শুরু করেছিল, কিন্তু শেষতক গডহেডে প্রত্যাবর্তন করেনি। মুক্তিলাভ এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়া; পরিবর্তনের এই সময়ে পুরাতন নিয়ম অনুসরণ ও সিনাগগে প্রার্থনা অনুমোদিত, পাশাপাশি মেসিয়ানিক মতবাদ গোপনে পালন করে যেতে হবে। পরিবর্তিত এই শ্যাব্বেতিয়বাদ ব্যাখ্যা করে যে, শ্যাব্বেইকে মেসায়াহ হিসাবে বিশ্বাস লালনকারী কতজন র্যাবাই অষ্টাদশ শতাব্দীতে পালপিটে টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছিলেন।
ধর্মান্তরিত চরমপন্থীরা অবতারবাদের এক ধর্মতত্ত্বের আশ্রয় গ্রহণ করেছিল এবং এভাবে আরেকটি ইহুদি টাবু ভঙ্গ করছিল। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে, শ্যাঝেতাই যেভি কেবল মেসায়াহই নয় বরং ঈশ্বরের অবতারও ছিলেন। খৃস্টধর্মের মতো ক্রমে এই বিশ্বাস বিবর্তিত হয়েছে। আব্রাহাম কারদাযযা একটি মতবাদের শিক্ষা দিয়েছিলেন যা পুনরুত্থানের পর সেইন্ট পলের জেসাসের মহিমান্বিতকরণের বিশ্বাসের অনুরূপ: ধর্ম ত্যাগের সময় যখন উদ্ধার লাভ পর্বের সূচনা ঘটেছে তখন শ্যাব্বেতাই পারযুফিমের ট্রিনিটিতে উন্নীত হয়েছেন; ‘পবিত্ৰজন (মালকা কাদিশা) আশীর্বাদপ্রাপ্ত হলেন, নিজেকে উঠিয়ে নিয়েছেন এবং শ্যাব্বেতাই যেভি উর্ধারোহণ করে ঈশ্বরও হওয়ার জন্যে তাঁর স্থান গ্রহণ করেছেন। সুতরাং, কোনওভাবে তিনি স্বর্গীয় স্তরে উন্নীত হয়েছেন ও ইসরায়েলের ঈশ্বরের অর্থাৎ দ্বিতীয় পরযুফের স্থান অধিকার করেছেন। অচিরেই ইসলাম ধর্মগ্রহণকারী দনমেহরা এ ধারণাটিকে আরেকটু আগে বাড়িয়ে সিদ্ধান্ত পৌঁছে যে, ইসরায়েলের ঈশ্বর পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়ে শ্যাব্বেইয়ের মাঝে দেহরূপ ধারণ করেছেন। যেহেতু তারা এও বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে তাদের সব নেতাই মেসায়াহর একেকজন অবতার, ফলে এটাই দাঁড়ায় যে তারাও অবতারে পরিণত হয়েছে, সম্ভবত ঠিক শিয়াহ্ ইমামদের মতো। সুতরাং ধর্মত্যাগীদের প্রত্যেক প্রজন্মের একজন নেতা ছিলেন যিনি স্বর্গীয় সত্তার অবতার ।
১৭৫৯ সালে অ্যাশকেনাযিয় অনুসারীদের ব্যাপ্টিজমে নেতৃত্বদানকারী জ্যাকব ফ্রাঙ্ক (১৭২৬-১৭৯১) বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, গোড়া থেকেই তিনি ঈশ্বরের অবতার ছিলেন। ইহুদিবাদের গোটা ইতিহাসে তাঁকে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর চরিত্র হিসাবে উল্লেখ করা হয়। অশিক্ষিত ছিলেন তিনি এবং এ নিয়ে তাঁর গর্বের শেষ ছিল না; তবে এক রহস্যময় ধর্মতত্ত্ব গড়ে তোলার ক্ষমতা ছিল তাঁর যা এমন একদল ইহুদিকে আকৃষ্ট করেছিল যাদের কাছে ধর্ম বিশ্বাস ফাঁকা ও অসন্তোষজনক মনে হয়েছিল। ফ্রাঙ্ক প্রচার করেন, পুরাতন নিয়ম রদ হয়ে গেছে। প্রকতৃপক্ষেই, সকল ধর্মকে ধ্বংস করতে হবে যাতে ঈশ্বর স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়ে উঠতে পারেন। তাঁর স্লোয়া প্যানস্কিতে (সদাপ্রভুর বাণী) তিনি শ্যাব্বেতিয়বাদকে নিহিলিজম-এর পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। সমস্ত কিছুকে ভেঙে চুরমার করে ফেলতে হবে: ‘আদম যেখানে পদচারণা করেছেন, নগর গড়ে উঠেছে: কিন্তু আমি যেখানেই পা রাখব, সেখানকার সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে, কারণ আমি এ পৃথিবীতে এসেছি কেবল ধ্বংস আর বিনাশ সাধনের জন্যে। ক্রাইস্টের কিছু কিছু বক্তব্যের সঙ্গে অস্বস্তি কর সাযুস্য রয়েছে, তিনিও দাবি করেছিলেন যে শান্তি নয় বরং তরবারি আনার জন্যে তার আগমন ঘটেছে। অবশ্য জেসাস ও সেইন্ট পলের বিপরীতে ফ্রাঙ্ক পুরোনো পবিত্রতার জায়গায় নতুন কিছু স্থাপনের প্রস্তাব রাখেননি। তাঁর নিহিলিস্টিক বিশ্বাস সমসাময়িক তরুণ মারকিস দে স্যাদের ধারণা হতে খুব বেশি ভিন্ন ছিল না। কেবল মর্যাদাহানির সর্বনিম্ন স্তরে অবতরণের ভেতর দিয়েই মানুষ শুভ ঈশ্বরের কাছে ঊর্ধ্বারোহণ করতে পারে। এটা কেবল সকল ধর্মের প্রত্যাখ্যান নয়, বরং ‘অদ্ভুত’ সূচনা যার। পরিণতি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত মর্যাদাহানি ও চরম নির্লজ্জতা।
