অন্য শ্যাব্বতায়িরা অবশ্যই এতটা বাড়াবাড়ি না করে মেসায়াহ্ ও সিনাগগের প্রতি বিশ্বস্ত রয়ে যায়। সময়ে যেমন বিশ্বাস করা হয়েছে, গোপন শ্যান্বেয়িদের সংখ্যা তারচেয়ে বেশি বলেই মনে হয়। উনবিংশ শতাব্দীতে ইহুদিদের অধিকতর উদার রূপ গ্রহণকারী বা যোগদানকারী বহু ইহুদি শ্যাব্বেতিয় পূর্ব-পুরুষ থাকাটাকে লজ্জাকর মনে করেছে, তবে এটা প্রতীয়মান হয় যে, অষ্টাদশ শতকের বহু বিশিষ্ট ব্যাবাই শ্যাব্বেইকে প্রকৃত মেসায়াহ হিসাবে বিশ্বাস করেছেন। শশালেম যুক্তি দেখিয়েছেন, এই মেসিয়ানিজম কখনওই ইহুদিবাদে গণআন্দোলনের রূপ না নিলেও এর সংখ্যাকে খাটো করে। দেখা ঠিক হবে না। ম্যারাননাদের কাছে বিশেষ আবেদন ছিল এর, স্প্যানিশরা জোর করে এদের খৃস্টধর্ম গ্রহণে বাধ্য করলেও এরা শেষ পর্যন্ত আবার ইহুদিবাদে প্রত্যাবর্তন করেছিল। মরক্কো, বলকান অঞ্চল, ইতালি ও লিথুয়ানিয়ায় সেফার্দিম জনগোষ্ঠীর মাঝে শ্যাব্বইবাদ সাড়া জাগিয়েছিল। রেজিওর বেঞ্জামিন কন ও মোদেনার আব্রাহাম রোরিগোর মতো বিশিষ্ট কাব্বালিস্টরা এই আন্দোলনের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন। বালকান অঞ্চল থেকে মেসিয়ানিক গোষ্ঠী পোল্যান্ডের অ্যাশকেনাজিয় ইহুদিদের মাঝে বিস্তৃত হয়, যারা পূর্ব ইউরোপের ক্রমবর্ধমান অ্যান্টিসেমিটিজমের কারণে মনোবল হারিয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছিল। ১৭৫৯ সালে অদ্ভুত ও ভয়ঙ্কর পয়গম্বর। জ্যাকব ফ্রাঙ্কের অনুসারীরা তাদের মেসায়াহর পথ অনুসরণ করে সদলে খৃস্টধর্ম গ্রহণ করে গোপনে ইহুদিবাদের অনুসরণ অব্যাহত রাখে।
শোলেম খৃস্টধর্মের উদ্ভাসিত করা তুলনার কথা বলেছেন। প্রায় ষোল শো বছর আগে ইহুদিদের আরেকটি দল এক কলঙ্কময় মেসায়াহর আশা ছাড়তে পারেনি। এই মেসায়াহ সাধারণ অপরাধীর মতো জেরুজালেমের কারাগারে প্রাণ হারান। সেইন্ট পল যাকে ‘ক্রসের কেলেঙ্কারি’ আখ্যায়িত করেছিলেন। সেটা একজন ধর্মত্যাগী মেসায়াহর কেলেঙ্কারির মতোই হতবুদ্ধিকর ছিল। উভয় ক্ষেত্রেই অনুসারীরা পুরোনো ইহুদিবাদের জায়গায় স্থান করে নেওয়া এক নতুন ধরনের ইহুদিবাদের জন্মের ঘোষণা দিয়েছিল; এক বৈপরীত্যময় বিশ্বাসকে আলিঙ্গন করে তারা। ক্রিশ্চানদের বিশ্বাস, ক্রসের পরাজয় বরণের ভেতর এক নতুন জীবন লাভ ঘটেছে, তেমনি শ্যাব্বেতিয়দেরও বিশ্বাস ছিল, ধর্মত্যাগ এক পবিত্র রহস্য। দুটো গোষ্ঠীই বিশ্বাস করত যে, ফল বহন করার জন্যে গমের বীজকে অবশ্যই মাটিতে পচতে হয়; তাদের বিশ্বাস ছিল, তোরাহর মৃত্যু ঘটেছে; আত্মার নতুন নিয়ম সে জায়গা অধিকার করেছে। উভয়ই ঈশ্বরের ত্রিত্ব ও অবতারণবাদের ধারণা গড়ে তুলেছিল।
সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীর বহু ক্রিশ্চানের মতো শ্যাব্বেতিয়রা বিশ্বাস করত, এক নতুন পৃথিবীর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে তারা। কাব্বালিস্টরা বারবার বলেছে যে, নির্বাসনকালে অস্পষ্ট রয়ে যাওয়া ঈশ্বরের প্রকৃত রহস্য অন্তিমকালে উন্মোচিত হবে। মেসিয়ানিক যুগে বসবাস করার বিশ্বাস লালনকারী শ্যাব্বেতিয়রা ঈশ্বরের প্রচলিত ধারণা ত্যাগে কোনওই দ্বিধা করেনি, এমনকি তার মানে আপাতঃ ব্লাসফেমাস ধর্মতত্ত্ব বেছে নেওয়া হচ্ছে মনে। হলেও। এভাবেই ক্রিস্টান ধর্মতত্ত্ব পাঠ দিয়ে যাত্রা শুরু করা মারানো বংশোদ্ভূত আব্রাহাম কারদাযো (১৭০৬) বিশ্বাস করতেন, পাপের কারণেই সকল ইহুদির ধর্মত্যাগ পূর্ব নির্ধারিত হয়েছিল। এটাই তাদের শাস্তি হওয়ার কথা। কিন্তু ঈশ্বর মেসায়াহকে তাদের পক্ষে চরম আত্মত্যাগের সুযোগ দিয়ে তাদের এই ভয়ঙ্কর নিয়তি হতে রক্ষা করেছেন। তিনি ভীতিকর উপসংহারে পৌঁছেছেন যে, নির্বাসিত থাকা অবস্থায় ইহুদিরা ঈশ্বরের সকল প্রকৃত জ্ঞান বিস্মৃত হয়েছে।
ক্রিশ্চান ও আলোকন পর্বের ডেইটিস্টদের মতো কারদাযো ধর্ম হতে তাঁর দৃষ্টিতে ভ্রান্ত সংযোজনসমূহ বাদ দিয়ে বাইবেলের খাঁটি ধর্মে প্রত্যাবর্তনের প্রয়াস পেয়েছিলেন। স্মরণ করা যেতে পারে, দ্বিতীয় শতাব্দীতে ক্রিশ্চান নাস্তিকরা জেসাস ক্রাইস্টের ‘গোপন ঈশ্বর’কে পৃথিবী সৃষ্টির জন্য সমস্ত ইহুদিদের নিষ্ঠুর ঈশ্বর থেকে আলাদা করে এক ধরনের মেটাফিজিক্যাল অ্যান্টি-সেমিটিজম গড়ে তুলেছিল। কারদাযযা এবার সেই প্রাচীন ধারণা পুনরুজ্জীবিত করলেন তবে উল্টে দিয়ে। তিনি এও শিক্ষা দিয়েছেন যে, ঈশ্বর ছিলেন দুজন: এদের যিনি নিজেকে ইসরায়েলের কাছে প্রকাশ করেছেন আর অপরজন সাধারণ জনগণের ঈশ্বর। প্রত্যেক সভ্যতায় মানুষ ‘আদি কারণে’র অস্তিতের প্রমাণ করেছে: এই উপাস্যের কোনও ধর্মীয় তাৎপর্য ছিল না; তিনি জগৎ সৃষ্টি করেননি, মানব জাতির ব্যাপারে তার কোনও মাথা ব্যাথা ছিল না; সুতরাং তিনি বাইবেলে নিজেকে প্রকাশ করেননি, বাইবেলে কখনও তাঁর নাম উল্লেখ হয়নি। নিজেকে আব্রাহাম, মোজেস ও অন্যান্য পয়গম্বরদের কাছে প্রকাশকারী দ্বিতীয় ঈশ্বর সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের: তিনি শূন্য হতে পৃথিবী বা জগৎ সৃষ্টি করেছেন, ইসরায়েলকে উদ্ধার করেছেন এবং তিনিই এর ঈশ্বর। অবশ্য, নির্বাসিত অবস্থায় সাআ’দিয়া ও মায়মমানিদসের মতো দার্শনিকরা গোয়িমদের, ঘেরাওয়ে থাকায় তাদের কিছু কিছু ধারণা গ্রহণ করেছিলেন। পরিণামে তারা । দুই ঈশ্বরকে গুলিয়ে ফেলে ইহুদিদের শিক্ষা দেন যে, তারা দুজন এক ও অভিন্ন। ফলে ইহুদিরা দার্শনিকদের ঈশ্বরের উপাসনা শুরু করে যেন তিনি তাদের পূর্বপুরুষদের ঈশ্বর।
