শ্যাব্বেইয়ের মতো নাথানও ইসাক লুরিয়ার কাব্বালাহ পাঠ করেছিলেন। স্মিরনা থেকে আগত অসুস্থ ইহুদির সঙ্গে দেখা হওয়ার পর লক্ষণ দেখে তাঁকে জানালেন, মোটেই দুরাত্মার আসর হয়নিঃ তাঁর গম্ভীর হতাশাই প্রমাণ করে যে তিনি প্রকৃতই মেসায়াহ। যখন তিনি এইসব গভীরতায় অবতরণ করেন, তখন ‘অপর দিকে’র অশুভ শক্তির সঙ্গে সংঘর্ষ হতে থাকে তাঁর, যার ফলে কেলিপদের অঞ্চলে স্বর্গীয় লিঙ্গ নির্গত হয়, যা কেবল স্বয়ং মেসায়াহ উদ্ধার করতে পারেন। ইসরায়েলের চূড়ান্ত মুক্তি অর্জনের আগে শ্যাব্বেইয়ের নরকে নামার এক মিশন রয়েছে। শুরুতে শ্যাব্বেইয়ের এসবের প্রতি আগ্রহ ছিল না, কিন্তু নাথানের বাকচাতুর্য শেষ পর্যন্ত তাঁকে পরাস্ত করে। ৩১মে ১৬৬৫ তারিখে আকস্মিকভাবে এক উন্মাদ আনন্দে আক্রান্ত হন তিনি এবং নাথানের প্ররোচনায় নিজের মেসিয়ানিক মিশনের ঘোষণা দেন। নেতৃস্থানীয় র্যাবাইগণ এসবকে বিপজ্জনক পাগলামি বলে নাকচ করে দেন। কিন্তু বহু ইহুদি শ্যাব্বেইয়ের চারপাশে ভিড় জমায়; অচিরেই পুনর্গঠিতব্য ইসরায়েল গোত্রসমূহের বিচারক হবার জন্যে বারজন অনুসারীকে বেছে নেন শ্যাব্বেতাই। এই সুখবর ইতালি, হল্যান্ড, জার্মানি ও পোল্যান্ডের পাশাপাশি অটোমান সাম্রাজ্যের বিভিন্ন নগরে চিঠি লিখে জানিয়ে দেন নাথান। মেসিয়ানিক উত্তেজনা দাবানলের মতো সারা ইহুদি বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। শত শত বছরের নিপীড়ন-নির্যাতন আর সমাজচ্যুতি ইউরোপের মূল স্রোতধারা হতে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল ইহুদিদের। এই অস্বাস্থ্যকর অবস্থা বহু ইহুদির মনে এ বিশ্বাস জাগিয়ে তুলেছিল যে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ কেবল ইহুদিদের ওপর নির্ভর করছে। স্পেনীয় ইহুদিদের উত্তরসূরি সেফার্দিরা লুরিয়ার কাব্বালাহকে অন্তর দিয়ে গ্রহণ করেছিল; অনেকেই প্রলয় দিবস অত্যাসন্ন বলে বিশ্বাস করেছিল। এসবই শ্যাব্বেইয়ের কাল্টকে সহযোগিতা যুগিয়েছে। ইহুদিদের ইতিহাস জুড়ে বহু মেসায়ার দাবিদার ছিল, কিন্তু তাদের কেউই এরকম সমর্থন আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়নি। শ্যাব্বেইয়ের বিপক্ষে যাদের অবস্থান ছিল তাদের পক্ষে মুখ খোলা বিপজ্জনক হয়ে পড়েছিল। সমাজের সকল স্তরেই তাঁর সমর্থক ছিল; ধনী-দরিদ্র, শিক্ষিত-শিক্ষিত। প্ল্যামফ্লেট আর সংবাদপত্র ইংরেজি, ডাচ, জার্মান ও ইতালিয় ভাষায় আনন্দ সংবাদ ছড়িয়ে দিয়েছিল। পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়ায় তার সম্মানে গণমিছিল বের হয়েছে। অটোমান সাম্রাজ্যে পয়গম্বররা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে দিব্যদর্শনে শ্যাব্বেইকে সিংহাসনে আসীন দেখার বর্ণনা দিয়ে বেড়িয়েছেন। সকল কাজকর্ম বন্ধ হয়ে গেল; অশুভ লক্ষণের মতো ইহুদিরা সাব্বাথ প্রার্থনা থেকে সুলতানের নাম বাদ দিয়ে শ্যাব্বেইয়ের নাম জুড়ে দিল। শেষমেষ ১৬৬৬ সালের জানুয়ারি মাসে। শ্যাব্বেতাই ইস্তাম্বুলে পৌঁছলে তাঁকে বিদ্রোহী হিসাবে গ্রেপ্তার করে গ্যালিপলির কারাগারে আটক করা হয়।
শত শত বছরের নিপীড়ন, নির্বাসন ও অপমানের পর আশার সঞ্চার হয়েছিল। পৃথিবী জুড়ে ইহুদিরা এমন এক অভ্যন্তরীণ মুক্তি আর স্বাধীনতার বোধে ভরে উঠেছিল যা কাব্বালিস্টরা সেফিরদের রহস্যময় জগৎ নিয়ে ধ্যানে মগ্ন হয়ে কয়েক মুহূর্তের জন্যে যে মোহাবিষ্টতার অনুভূতি অর্জন করত তার মতো ছিল। মুক্তির অভিজ্ঞতাটি এখন আর মুষ্টিমেয় সুবিধাপ্রাপ্তদের একচেটিয়া অধিকারভুক্ত রইল না, বরং সাধারণ মানুষের সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে । প্রথমবারের মতো ইহুদির মনে বোধ জেগেছিল যে, তাদের জীবনের একটা। মূল্য আছে; প্রায়শ্চিত্ত বা মুক্তি অর্জন এখন আর ভবিষ্যতের অস্পষ্ট কোনও ব্যাপার নয়, বরং বর্তমানেই তা উপস্থিত ও বাস্তব। মুক্তি এসে গিয়েছিল। আকস্মিক এই পরিবর্তন অনেপনীয় প্রভাব বিস্তার করে। গোটা ইহুদি সম্প্রদায়ের নজর আবদ্ধ হয়েছিল গ্যালিপলির দিকে যেখানে আটককারীর ওপরও প্রভাব বিস্তার করেছিলেন শ্যাব্বেতাই। তুর্কী উযির বেশ আরাম আয়েসেই রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন তাঁকে। শ্যাব্বেতাই তাঁর লেখা চিঠিপত্রে ‘আমি তোমাদের প্রভু ঈশ্বর শ্যাব্বেতাই যেভি’ লিখে স্বাক্ষর শুরু করেছিলেন। কিন্তু তাঁকে যখন বিচারের জন্যে ফের ইস্তাম্বুলে ফিরিয়ে আনা হলো, ফের বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হয়ে পড়লেন তিনি। সুলতান তাঁকে ইসলাম বা মৃত্যুদণ্ডের যে কোনও একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ দিলেন: শ্যাব্বতাই ইসলাম গ্রহণ করলেন; অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া হলো তাকে। রাজকীয় ভাতা দেওয়া হয়েছিল তাঁকে; দৃশ্যতঃ বিশ্বস্ত মুসলিম হিসাবেই ১৭ সেপ্টেম্বর, ১৬৭৬ তারিখে তিনি মারা যান।
এই ভয়ঙ্কর সংবাদে স্বভাবতই তার সমর্থকরা দিশাহারা হয়ে পড়েছিল, যাদের অনেকেই নিমেষে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। র্যাবাইগণ পৃথিবীর বুক থেকে তাঁর স্মৃতি মুছে ফেলার চেষ্টা করেছেন: শ্যাব্বেতাই সম্পর্কে যেখানে যত চিঠি, প্যামফ্লেট বা রচনা উদ্ধার করা গেছে সব ধ্বংস করে ফেলেন তারা। আজও বহু ইহুদি এই মেসিয়ানিক বিপর্যয় নিয়ে বিব্রত বোধ করে। এর সঙ্গে মানিয়ে উঠতে কষ্ট বোধ করে। র্যাবাই ও যুক্তিবাদী এ দুই দলই সমানভাবে এর তাৎপর্যকে খাটো করে দেখিয়েছেন। অবশ্য সাম্প্রতিককালে পণ্ডিতগণ এই বিচিত্র ঘটনার অর্থ ও অধিকতর তাৎপর্যময় ভবিষ্যৎ ফল উপলব্ধি করার প্রয়াসে প্রয়াত গারশম শোলেমের পথ অনুসরণ করেছেন। বিস্ময়কর মনে হতে পারে, কিন্তু শ্যাব্বেইয়ের ধর্ম ত্যাগের কেলেঙ্কারী সত্ত্বেও বহু ইহুদি মেসায়াহর অনুগত রয়ে গিয়েছিল। মুক্তি লাভের অনুভূতি এতটাই গভীর ছিল যে, তারা বিশ্বাসই করতে পারেনি ঈশ্বর তাদের বিভ্রান্ত হবার অবকাশ দিতে পারেন। এটা ঘটনা ও যুক্তির অগ্রবর্তী স্থান গ্রহণকারী মুক্তি লাভের ধর্মীয় অনুভূতির অন্যতম চমকপ্রদ উদাহরণ। সদ্য প্রাপ্ত আশা ত্যাগ বা ধর্মত্যাগী মেসায়াহর যে কোনও একটি বেছে নিতে গিয়ে সকল শ্রেণীর অবিশ্বাস্য সংখ্যক ইহুদি ইতিহাসের কঠিন সত্য মেনে নিতে অস্বীকার করে। গাযার নাথান বাকি জীবন শ্যাব্বেইয়ের রহস্য প্রচার করে কাটিয়ে দিয়েছিলেন; ইসলাম গ্রহণ করে তিনি (শ্যাব্বেই) অশুভের বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছেন। আবার, কেলিপদকে মুক্ত করতে অন্ধকার জগতে অবতরণের উদ্দেশ্যে আপন জনগণের গভীরতম পবিত্রতা লঙ্ঘন করতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। তার মিশনের দুঃখজনক ভার বহন করেছেন তিনি; ভেতর থেকেই ঈশ্বরহীনতার জগতকে জয় করতে সর্বনিম্ন গভীরতায় নেমেছেন। তুরস্ক ও গ্রিসে প্রায় দুশো পরিবার শ্যাব্বেইয়ের অনুগত রয়ে যায় তার মৃত্যুর পর। অশুভের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অব্যাহত রাখতে তার নজীর অনুসরণের সিদ্ধান্ত নিয়ে ১৬৮৩ সালে গণহারে ইসলাম গ্রহণ করে। তারা গোপনে ইহুদিবাদের প্রতি বিশ্বস্ত থেকে র্যাবাইদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার পাশাপাশি পরস্পরের বাড়িতে গোপন সিনাগগে জমায়েতে মিলিত হতে থাকে। ১৬৮৯ সালে তাদের নেতা জ্যাকব কুয়েরিতে মক্কায় হজ পালন করেন এবং মেসায়াহর বিধবা স্ত্রী ঘোষণা দেয় যে, কুয়েরিতেই শ্যাঝেতাই যেভির অবতার। তুরস্কে তখনও দনমেই (ধর্মত্যাগী) একটা ছোট দল ছিল যারা বাইরে বাইরে খাঁটি ইসলামী আচার আচরণ দেখালেও গোপনে প্রবলভাবে ইহুদিবাদ আঁকড়ে ছিল।
