এই প্রবল ও অযৌক্তিক ধর্মানুরাগকে ফাউন্ডিং ফাদারদের পরীক্ষিত স্থৈর্যের সঙ্গে মেলানো কঠিন। এডওয়ার্ডসের বহু প্রতিপক্ষ ছিলেন যারা অওয়াকেনিংয়ের তীব্র সমালোচনা করেছেন। উদারপন্থীদের দাবি মানুষের জীবনে প্রবল আলোড়নের ভেতর দিয়ে নয় ঈশ্বর কেবল যৌক্তিকভাবেই নিজেকে প্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু রিলিজিয়ন অ্যান্ড দ্য আমেরিকান মাইন্ড: ফ্রম দ্য গ্রেট অ্যাওয়াকেনিং টু দ্য রিভোলুশন-এ অ্যালান হেইমার্ট যুক্তি দেখিয়েছেন, অ্যাওয়াকেনিং-এর নব-জন্ম সুখ অনুসন্ধানের আলোকন পর্বের আদর্শের ইভেস্ক্রিলিক্যালরূপ। এটা এমন এক জগৎ হতে অস্তিত্বের মুক্তি তুলে ধরেছে, যেখানে সবকিছুই শক্তিশালী অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। দরিদ্র উপনিবেশগুলোয় অ্যাওয়াকেনিং-এর ব্যাপারটা ঘটেছিল, যেসব স্থানে অনন্য আলোকনপর্বের আশাবাদ সত্ত্বেও মানুষের মাঝে এ জগতে সুখ লাভের প্রত্যাশা ছিল সামান্যই। পুনর্জন্ম লাভের অনুভূতি, এডওয়ার্ডস যুক্তি দেখিয়েছেন, আনন্দের এক ধরনের অনুভূতি ও সুন্দরের বোধ জাগিয়ে তোলে যা যে কোনও স্বাভাবিক অনুভূতির চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সুতরাং অ্যাওয়াকিং-এ এক ঈশ্বর-অনুভূতি নতুন বিশ্বের আলোকন উপনিবেশ সমূহের কতিপয় সফল ব্যক্তির চেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল। আমাদের আরও স্মরণ করা দরকার যে, দার্শনিক আলোকনও আধা-ধর্মীয় মুক্তি হিসাবে অনুভূত হয়েছিল। Eclaircissement ও Aufklarung শব্দ দুটোর সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় দ্যোতনা রয়েছে। জোনাথান এডওয়ার্ডসের ঈশ্বর ১৭৭৫ সালের বিপ্লবী উদ্দীপনায়ও অবদান রেখেছিলেন। পুনর্জাগরণবাদীদের চোখে ব্রিটেন পিউরিটান বিপ্লবের সময় অত্যুজ্জল নতুন আলো হারিয়ে ফেলেছিল, সেটাকে পতনোমুখ ও পাশ্চাদগামী মনে হচ্ছিল। এডওয়ার্ডস ও তার সহকর্মীরাই নিম্নশ্রেণীর আমেরিকানদের বিপ্লবের পথে প্রথম পদক্ষেপ নিতে উদ্দীপিত করেছিলেন। এডওয়ার্ডসের ধর্মের অত্যাবশ্যক উপাদান ছিল মেসিয়ানিজম; মানবীয় প্রয়াস নতুন পৃথিবীতে অর্জনযোগ্য ও অত্যাসন্ন ঈশ্বরের রাজত্বের আগমন তরান্বিত করবে। খোদ অ্যাওয়াকেনিং (এর করুণ পরিসমাপ্তি সত্ত্বেও) মানুষকে বিশ্বাস করিয়েছিল যে, বাইবেলে বর্ণিত প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। ঈশ্বর এ ক্ষেত্রে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। এডওয়ার্ডস ট্রিনিটির মতবাদের একটি রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন: পুত্র হলেন ঈশ্বরের উপলব্ধি দ্বারা সৃষ্ট উপাস্য এবং এভাবে নতুন কমনওয়েলথের নীল নকশা; আত্মা হচ্ছেন উপাস্যের কার্যে বর্তমান থাকা’ যিনি যথাসময়ে এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবেন।২৫ আমেরিকার নতুন বিশ্বে এভাবে পৃথিবীর বুকেই ঈশ্বর তাঁর সম্পূর্ণতা চিন্তা করতে পারবেন। খোদ সমাজ ঈশ্বরের মহত্ত্ব (Excellencies) প্রকাশ করবে। নিউ ইংল্যান্ড হবে ‘পর্বতচূড়ার শহর’, জেন্টাইলদের জন্যে আলোকবর্তিকা, জিহোবার প্রতাপ যেখানে জ্বলজ্বল করবে, সবার জন্যে আকর্ষণীয় ও তীব্র হয়ে উঠবে। সুতরাং, এডওয়ার্ডসের ঈশ্বর এভাবে কমনওয়েলথে মূর্ত হয়ে উঠবেন; ক্রাইস্টকে এক আদর্শ সমাজে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা অবস্থায় দেখা হয়েছে।
অন্য কালভিনিস্টরা প্রগতির যানে আসীন ছিল; আমেরিকার শিক্ষাক্রমে রসায়ন অর্ন্তভুক্ত করেছিল তারা; এডওয়ার্ডসের দৌহিত্র টিমোথি ডিউইট বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে মানুষের চরম সম্পূর্ণতার ক্ষেত্রে পূর্বশর্ত হিসাবে দেখেছেন। আমেরিকার উদারপন্থীরা যেমনটি অনেক সময় কল্পনা করেছে, তাদের ঈশ্বর সর্বতোভাবে জ্ঞানার্জনে বাধাদানকারী ছিলেন না। কালভিনিস্টরা নিউটনের সৃষ্টিতত্ত্ব অপছন্দ করত, একবার কর্মধারা শুরু হয়ে যাবার পর এখানে ঈশ্বরের আর তেমন কিছু করণীয় ছিল না। আমরা যেমন দেখেছি, পৃথিবীতে আক্ষরিক অর্থে সক্রিয় একজন ঈশ্বরের পক্ষে ছিল তারা। তাদের পূর্ব নির্ধারিত নিয়তির মতবাদ দেখিয়েছে, তাদের দৃষ্টিতে মর্ত্যে ভালো-মন্দ যাই ঘটুক সেগুলোর জন্যে ঈশ্বরই আসলে দায়ী। এর অর্থ বিজ্ঞান কেবল সেই ঈশ্বরকে প্রকাশ করতে পারবে, সৃষ্ট বস্তুর কর্মকাণ্ডে যাঁকে অনুভব করা যায়-প্রাকৃতিক, সামাজিক, ভৌত ও আধ্যাত্মিক-এমনকি যেসব ঘটনা আকস্মিক বা আপতিক মনে হয় সেসবের ভেতরও। কোনও কোনও ক্ষেত্রে কালভিনিস্টিরা চিন্তা ভাবনার দিক দিয়ে উদারপন্থীদের চেয়ে বেশি এগিয়ে ছিল, যারা তাদের পুনর্জাগরণবাদের বিরোধিতা করত এবং অনুমান নির্ভর,’ জটিল ধারণার বদলে সহজ বিশ্বাসের পক্ষপাতি ছিল; এ ধরণের ধারণা পুনর্জাগরণবাদী হুইটফিল্ড এডওয়ার্ডসের প্রচারণায় থাকায় তারা অস্বতি বোধ করেছে। অ্যালান হেইমার্ট যুক্তি দেখিয়েছেন, আমেরিকার সমাজে অ্যান্টিইন্টেলেকচুয়ালিজমের মূল কালভিনিস্ট ও ইভেঙিলিকালদের সঙ্গে ছিল না হয়তো, বরং অধিকতর যুক্তিবাদী চার্লস চন্সি বা স্যামুয়েল কুইন্সি-র মতো বস্টনিয়দের সঙ্গেই বেশি। সম্পর্কিত, যারা ঈশ্বর সম্পর্কিত সেই ধারণা পছন্দ করতেন যেগুলো বেশি সহজ ও স্পষ্ট।
ইহুদিবাদেও লক্ষণীয়ভাবে একই ধরনের কিছু অগ্রগতি ঘটেছিল যা ইহুদিদের ভেতর যুক্তিবাদী আদর্শের বিস্তার লাভের পথ তৈরি করে ও অনেককেই ইউরোপের জেন্টাইল অধিবাসীদের সাথে মিশে যেতে সক্ষম করে তোলে। প্রলয়ের বছর ১৬৬৬ সালে জনৈক ইহুদি মেসায়াহ ঘোষণা দেন যে মুক্তি একেবারে কাছে এসে পড়েছে। সারা বিশ্বের ইহুদিরা তার দাবি আনন্দের সঙ্গে নেয়। ১৬২৬ সালে মন্দির ধ্বংসের বার্ষিকীতে এশিয়া মাইনরের স্মিরনায়। এক সম্পদশালী সেফার্দিক ইহুদি পরিবারে শ্যাব্বেতাই যেভি জন্ম নেন। বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তার ভেতর এমন একটা প্রবণতা গড়ে উঠেছিল আজকের দিনে যাকে আমরা হয়তো ম্যানিক ডিপ্রেসিভ’ হিসাবে শনাক্ত করতাম। মাঝে মাঝে গম্ভীর হতাশায় ডুবে যেতেন তিনি, তখন সংসার ত্যাগ করে বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন করতেন। বিষণ্ণতার পর আসত এক রকম আনন্দ, যা ছিল মোহাবেশের কাছাকাছি। এইসব ‘উন্মাদকালীন সময়ে মাঝে মাঝে তিনি স্বেচ্ছায় ও দর্শনীয়ভাবে মোজেসের আইন ভঙ্গ করতেন প্রকাশ্যে নিষিদ্ধ খাদ্য খেতেন, ঈশ্বরের পবিত্র নাম উচ্চারণ করতেন আর এক বিশেষ প্রত্যাদেশের মাধ্যমে এমনটি করার নির্দেশ পেয়েছেন বলে দাবি করতেন। তার বিশ্বাস ছিল তিনিই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত মেসায়াহ। র্যাবাইরা শেষ পর্যন্ত সহ্য করতে না পেরে ১৬৫৬ সালে শ্যাব্বেইকে শহর থেকে বহিষ্কার করেন। এরপর অটোমান সাম্রাজ্যে ইহুদি জনগোষ্ঠীর মাঝে ভবঘুরে হয়ে যান তিনি। ইস্তাম্বুলে থাকার সময় এমনি এক উন্মাদনা কালে তোরাহ্ বাতিল ঘোষণা দিয়ে বসেন, চিৎকার করে বলেন, “হে আমাদের প্রভু, আমাদের ঈশ্বর, তুমি আশীর্বাদ প্রাপ্ত, যিনি নিষিদ্ধকে সিদ্ধ করেছেন! কায়রোতে একহিলাকে বিয়ে করে আলোড়ন সৃষ্টি করেন তিনি, এই নারী ১৯৪৮ সালে পোলান্ডে সংঘটিত হত্যালীলা এড়িয়ে পালিয়ে ইস্তাম্বুলে এসে বেশ্যাবৃত্তি করছিল। ১৬৬২ সালে জেরুজালেমের উদ্দেশে যাত্রা করেন শ্যাব্বেই: এই সময় বিষণ্ণ কাল অতিক্রম করছিলেন তিনি; তাঁর মনে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, নির্ঘাৎ দুরাত্মা ভর করেছে তার ওপর। প্যালেস্তাইনে নাথান নামে এক তরুণ শিক্ষিত র্যাবাইয়ের কথা জানতে পারেন তিনি, এই র্যাবাই দক্ষ এক্সরসিস্ট ছিলেন, গাযায় তার বাড়ির খোঁজে বেড়িয়ে পড়েন শ্যাতোই।
