সামাজিক ইতিহাসবিদগণ উল্লেখ করেছেন যে, পাশ্চাত্যের খৃস্টবাদ এর সময়ান্তরে নিপীড়ক ও সহনশীল চরিত্রে ব্যাপক পরিবর্তনের জন্যে বিশ্ব ধর্মগুলোরা মাঝে অনন্য। তাঁরা আরও উল্লেখ করেছেন, নিপীড়ক পর্যায়গুলো সাধারণত ধর্মীয় পূনর্জাগরণের সঙ্গে মিশে গেছে। আলোকন পর্বের অধিকতর নৈতিক আবহাওয়া পশ্চিমের বহু স্থানে ভিক্টোরিয়ান কালের নিপীড়নের ফলে পরিবর্তিত হয়েছে, যার সঙ্গে অধিকতর মৌলবাদী ধার্মিকতার জোয়ার যোগ হয়। আমাদের নিজস্বকালে আমরা ১৯৬০-এর দশকের সহনশীল সমাজকে ১৯৮০র দশকের অধিকতর পিউরিটান নৈতিকতার পথ খুলে দিতে দেখেছি যা
পশ্চিমে খৃস্টীয় মৌলবাদের উত্থানেরও সমসাময়িক। এটা একটা জটিল ঘটনা, সন্দেহ নেই এর পেছনে একাধিক কারণ ক্রিয়াশীল ছিল। অবশ্য এর সঙ্গে ঈশ্বরের ধারণাকে যুক্ত করার প্রলোভন জাগে, পশ্চিমবাসীরা যাকে অসুবিধাপূর্ণ হিসাবে আবিষ্কার করেছে। মধ্যযুগের ধর্মবিদ ও অতিন্দ্রীয়বাদীরা হয়তো একজন প্রেমময় ঈশ্বরের প্রচারণা চালিয়েছিলেন, কিন্তু ক্যাথেড্রলের দরজায় দরজায় আঁকা আতঙ্ক জাগানো অভিশপ্তদের ওপর অত্যাচারের ছবি ভিন্ন কাহিনী বলে। আমরা যেমন দেখেছি, পাশ্চাত্যে প্রায়শঃই ঈশ্বর অনুভূতি অন্ধকার ও সগ্রাম দিয়ে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করা হয়েছে। ক্লার্কসন ও কপের মতো র্যান্টার্সরা যখন ক্রিশ্চান টাবু অস্বীকার করছিলেন, পাপের পবিত্রতার ঘোষণা দিচ্ছিলেন, ঠিক সেই একই সময়ে ইউরোপের নানান দেশে উইচক্র্যাফটের উন্মাদনা বয়ে যাচ্ছিল। ক্রমওয়েলের ইংল্যান্ডের চরমপন্থী ক্রিশ্চানরা অতি চাহিদা সম্পন্ন ও ভয় জাগানো একজন ঈশ্বর ও ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছিল।
সপ্তম ও অষ্টম শতাব্দীতে পশ্চিমে আবির্ভূত নব-জন্ম লাভের খৃস্টধর্ম প্রায়শঃই অস্বাস্থ্যকর ছিল। এর বৈশিষ্ট্য ছিল প্রবল এবং কখনও কখনও বিপজ্জনক আবেগ ও পরিবর্তন। ১৭৩০-এর দশকে গোটা নিউ ইংল্যান্ডে ছড়িয়ে পড়া গ্রেট অ্যাওয়াকেনিং নামে পরিচিত ধর্মীয় উন্মাদনার মাঝে এ ব্যাপারটি দেখতে পাই আমরা। ওয়েসলির অনুসারী ও সহযোগী জর্জ হুইটফিন্ডের ইভেস্ক্রিলিক্যাল প্রচারণা ও ইয়েলে শিক্ষাপ্রাপ্ত জোনাথান এডওয়ার্ডসের (১৭০৩-৫৮) অনলবর্ষী সারমনে এটা অনুপ্রাণিত হয়েছিল। এডওয়ার্ডস তাঁর রচনায় এই জাগরণের বিবরণ দিয়েছেন কানেক্টিকাটের নর্দামটনে ঈশ্বরের বিস্ময়কর লীলার বিশ্বস্ত বিবরণ। সেখানে তিনি তার প্যারিশনারদের সাধারণের চেয়ে ভিন্ন কিছু নয় বলে উল্লেখ্য করেন; তারা নম্র, সুশৃঙ্খল এবং ভালো; কিন্তু ধর্মীয় উৎসাহ-উদ্দীপনাহীন। অন্যান্য কলোনির নারী-পুরুষের তুলনায় ভালো বা খারাপ কোনওটাই নয়। কিন্তু ১৯৩৪ সালে দুই তরুণের আকস্মিক অপমৃত্যু ঘটে। এঘটনায় (পরে মনে হয়েছে স্বয়ং এডওয়ার্ডসের ভয়ঙ্কর কথাবার্তায় উস্কানি পেয়ে) গোটা শহর ধর্মীয় উন্মাদনায় মত্ত হয়ে উঠেছিল। মানুষ ধর্ম ছাড়া অন্য আর কিছুই আলোচনা করতে পারছিল না। কাজকর্ম ফেলে সারাদিন বাইবেল পড়ে কাটাচ্ছিল তারা। মোটামুটি ছয় মাসের মধ্যেই সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের ভেতর প্রায় তিন শো নবজন্মলাভকারী নবদীক্ষিত ক্রিশ্চান দেখা গেছে: কখনও কখনও সপ্তাহে পাঁচজনকেও ধর্মান্তরিত হতে দেখা গেছে। এই উন্মাদনাকে এডওয়ার্ডস স্বয়ং ঈশ্বরের প্রত্যক্ষ ভূমিকা হিসাবে দেখেছিলেন; একেবারেই আক্ষরিক অর্থেই কথাটা প্রয়োগ করেছেন তিনি, এটা সামান্য ধার্মিকতার facon de Parler ছিল। না। বারবার তিনি যেমন বলেছেন, নিউ ইংল্যান্ডে ঈশ্বর যেন তাঁর প্রচলিত ভূমিকা ছেড়ে সরে এসে এখানকার মানুষকে অবিশ্বাস্য ও অলৌকিক উপায়ে পরিচালিত করছেন। অবশ্য এটা বলা প্রয়োজন, পবিত্র আত্মা কখনও কখনও অনেকটা হিস্টেরিক্যাল লক্ষণের ভেতর দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করে থাকেন। অনেক সময়, আমাদের বলছেন এডওয়ার্ডস, তারা ঈশ্বরের ভয়ে একবারে ‘ভেঙে পড়ে আর ঈশ্বরের অনুকম্পার অতীত পাপবোধের চাপে অতল গহবরে হারিয়ে যায়। এরপর আসবে একই রকম পরম উল্লাসের পালা, যখন তাদের মনে আকস্মিক মুক্তি লাভের বোধ জাগে। তারা একই সময় প্রবল হাসিতে ভেঙে পড়ত; প্রায়ই বানের জলের মতো অশ্রু বর্ষিত হতো, হাসির সঙ্গে মিশে যেত সশব্দ কান্না। কখনও কখনও সশব্দে কেঁদে ওঠা ঠেকাতে পারত না তারা। সকল প্রধান ধর্মের অতিন্দ্রীয়বাদীরা শান্ত নিয়ন্ত্রণকে প্রকৃত আলোকনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসাবে বিশ্বাস করেছে, আমরা তা থেকে অনেক দূরে সরে এসেছি।
এই প্রবল আবেগগত পরিবর্তন আমেরিকার ধর্মীয় জাগরণের বৈশিষ্ট্য রয়ে গিয়েছিল। এটা ছিল যন্ত্রণা আর প্রয়াসের প্রবল খিচুনী যুক্ত এক নতুন জন্ম, ঈশ্বরের সঙ্গে সম্রামের নতুন পাশ্চাত্য রূপ। এই অ্যাওয়াকেনিং সংক্রামক রোগের মতো আশপাশের শহর-গ্রামগুলোয় ছড়িয়ে পড়েছিল, ঠিক যেমন বহু শতাব্দী পরে ধর্মীয় উন্মাদনার আঁচে স্বভাবগতভাবে দগ্ধ নিউইয়র্ক রাজ্যকে ‘বানর্ড-ওভার ডিস্ট্রিক্ট’ বলে অভিহিত করা হবে। এই মহিমান্বিত অবস্থায়। এডওয়ার্ডস লক্ষ করেছেন যে, তাঁর নবদীক্ষিতরা সমগ্র দুনিয়াকেই আনন্দময়। অনুভব করেছে। নিজেদের তারা বাইবেল থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারত না। অনেক সময় নাওয়া-খাওয়া ভুলে যেত। সম্ভবত এখানে বিস্ময়ের কিছু নেই যে, মোটামুটি দুই বছর পর তাদের আবেগ প্রশমিত হয়ে যায়, যখন এডওয়ার্ডস লক্ষ করেন, ঈশ্বরের আত্মার আমাদের ছেড়ে ক্রমশঃ চলে যাওয়াটা বেশ যৌক্তিকভাবেই সূচিত হয়েছে। তিনি কিন্তু রূপকার্থে বলছিলেন না একথা: ধর্মীয় বিষয়ে এডওয়ার্ডস খাঁটি পশ্চিমা অক্ষরবাদী ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করেছেন, অ্যাওয়াকেনিং প্রকৃতই তাদের মাঝে ঈশ্বরের প্রত্যক্ষ প্রকাশ ছিল, প্রথম পেন্টেকস্টে পবিত্র আত্মার বাস্তব কর্মকাণ্ডের মতো। ঈশ্বর যখন আগমনের মতোই আচমকা সরে গেলেন, আবার তার স্থান আক্ষরিক অর্থেই স্যাটান দখল করে নিল। পরম আনন্দের পর এল আত্মহননের মতো হতাশা। প্রথম এক বেচারা নিজের গলা কেটে আত্মহত্যা করল। এই ঘটনার পর এ শহর এবং অন্যান্য শহরের জনতার মাঝে যেন প্রবল ধারণার সৃষ্টি হলো, এই লোককে অনুসরণ করার জন্যে কেউ যেন তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করছিল। অনেকের মনে এমন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল যে, যেন কেউ তাদের বলছিল, ‘গলা কেটে ফেল, এখনই সুবর্ণ সুযোগ। এখনই! দুজন লোক ‘অদ্ভুত, উদ্দীপনাময় বিভ্রান্তির কারণে উন্মাদ হয়ে যায়। এরপর আর কেউ ধর্মান্তরিত হয়নি। তবে যারা এই অভিজ্ঞতার পরে বেঁচে ছিল তারা অ্যাওয়াকেনিংয়ের আগের সময়ের তুলনায় আরও শান্ত ও প্রফুল্ল হয়ে উঠেছিল, কিংবা এডওয়ার্ডস তেমনটিই আমাদের বিশ্বাস করাতে চান। এমন অস্বাভাবিকতা ও দূরবস্থার মধ্যে নিজেকে প্রকাশকারী জোনাথান এডওয়ার্ডস ও তার ধর্মান্ত রিতদের ঈশ্বর বরাবরের মতোই ভীতিকর; মানুষের সঙ্গে আচরণে স্বেচ্ছাচারী। আবেগের অস্বাভাবিক পরিবর্তন, উন্মাদময় আনন্দ ও গম্ভীর হতাশা দেখায় যে, আমেরিকার বহু কম সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তি ঈশ্বরের সঙ্গে মিলিত হওয়ার ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখতে অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছে। এটা নিউটনের বৈজ্ঞানিক ধর্মে আমরা যেমন দেখি পৃথিবীর ঘটনাবলীর জন্যে, তা যত অদ্ভুতই হোক, ঈশ্বর প্রত্যক্ষভাবে দায়ী, এই বিশ্বাসকে তুলে ধরে।
