র্যান্টার্সদের বেশ কয়েকজন নিজেদের মেসায়াহ, ঈশ্বরের পুর্ণাবতার দাবি করেছেন-যিনি এক নতুন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করবেন। তাদের জীবনের যে বিবরণ আমাদের কাছে রয়েছে তাতে কারও কারও ক্ষেত্রে মানসিক বৈকল্যের লক্ষণ দেখা যায়, তা সত্ত্বেও তারা অনুসারীদের একটা দল পেয়েছিলেন, এটা নিঃসন্দেহে সে সময়ের ইংল্যান্ডের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক প্রয়োজন মিটিয়েছিল। এভাবেই ১৬৪৬ সালে প্লেগে পরিবারের সদস্যদের হারিয়ে এক সম্মানীয় গৃহস্থ উইলিয়াম ফ্রাঙ্কলিন মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। নিজেকে ঈশ্বর ও ক্রাইস্ট দাবি করে সতীর্থ ক্রিশ্চানদের হতবিহ্বল করে দেন তিনি, পরে অবশ্য নিজের দাবি প্রত্যাহার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তাঁকে পুরোপুরি সুস্থ মনে হলেও স্ত্রীকে ছেড়ে অন্য নারীদের শয্যাসঙ্গী হতে শুরু করেছিলেন তিনি, যাপন করছিলেন নিন্দাহঁ ভিক্ষুকের জীবন। এইসব নারীদের একজন, মেরি গ্যাডবারি দিব্য দর্শন লাভ এবং কণ্ঠস্বর শুনতে শুরু করে এবং ভবিষ্যদ্বাণী করে এক নতুন সামাজিক ব্যবস্থার যা সকল শ্রেণী বৈষম্য দূর করে দেবে। ফ্রাঙ্কলিনকে নিজের প্রভু ও ক্রাইস্ট হিসাবে গ্রহণ করে সে। তারা বেশ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অনুসারী পেয়েছিলেন বলে মনে হয়; কিন্তু ১৬৫০ সালে তাদের গ্রেপ্তার, প্রহার ও ব্রিডওয়েলে কারাবন্দি করা হয়। মোটামুটি প্রায় একই সময়ে জনৈক জন রবিনসও ঈশ্বরের মর্যাদা লাভ করেছিল; নিজেকে পিতা ঈশ্বর দাবি করেছিল সে, তার বিশ্বাস ছিল শিগগিরই তার স্ত্রী জগৎ পরিত্রাতার জন্মও দেবে।
ইতিহাসবিদদের কেউ কেউ রবিনস ও ফ্রাঙ্কলিনদের মতো লোকদের র্যান্টার্স হিসাবে মানতে চান না, তাঁরা বলেন, আমরা কেবল প্রতিপক্ষের কাছ থেকেই তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্ক জানতে পারি, যারা হয়তো ধর্মীয় যুক্তির কারণে তাদের বিশ্বাসের বিকৃতি ঘটিয়েছে। কিন্তু জ্যাকব বথিউমলি, রিচার্ড কপিন এবং লরেন্স ক্লার্কসনের মতো উল্লেখযোগ্য র্যান্টার্সদের বিবরণ রক্ষা পেয়েছে যেখানে একই রকম জটিল ধারণা দেখা যায় তারাও এক বিপ্লবী সামাজিক বিশ্বাসের প্রচার করেছেন। দ্য লাইট অ্যান্ড দ্য ডার্ক সাইডস অভ গড় (১৬৫০) শীর্ষক নিবন্ধে বথিউমালি এমন ভাষায় ঈশ্বর সম্পর্কে আলোচনা করেছেন যা ঈশ্বর তাঁকে স্মরণকরী মানুষের চোখ, কান আর হাত হয়ে যান-এই সুফী বিশ্বাসের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়; হে ঈশ্বর, তোমাকে কী বলব আমি?’ তিনি জানতে চান। কারণ যদি বলি আমি তোমাকে দেখি, তাহলে সেটা তোমার নিজেকে দেখা ছাড়া আর কিছু না; কারণ আমার মাঝে নিজেকে দেখা ছাড়া তোমাকে দেখার কোনও ক্ষমতা নেই: যদি বলি তোমাকেই জানি, সেটা নিজেকে জানা ছাড়া আর কিছু না।৩৯ যুক্তিবাদীদের মতো ট্রিনিটি মতবাদ প্রত্যাখ্যান করেছেন বথিউমলি; সুফীর মতো করেই একথা বলে ক্রাইস্টের ঐশ্বরিকতায় নিজের বিশ্বাসকে নিয়ন্ত্রিত করেছেন যে, ক্রাইস্ট স্বর্গীয় হলেও মাত্র একজন ব্যক্তিতে ঈশ্বর প্রকাশিত হতে পারেন নাঃ তিনি মানুষ ক্রাইস্টের মাঝে অবস্থানের মতোই প্রকৃত ও বস্তুগতভাবে অন্য মানুষ ও প্রাণীর দেহে অবস্থান করেন। সুস্পষ্ট স্থানীয় কোনও ঈশ্বরের উপাসনা বহুঈশ্বরবাদীতার একটা ধরণ: স্বর্গ কোনও স্থান নয়, বরং ক্রাইস্টের আধ্যাত্মিক উপস্থিতি। বথিউমলি বিশ্বাস করতেন, ঈশ্বরের বাইবেলিয় ধারণা অপর্যাপ্ত: পাপ কোনও কর্ম নয়, বরং একটা অবস্থা, আমাদের স্বর্গীয় প্রকৃতির। ঘাটতি । কিন্তু তারপরেও রহস্যজনকভাবে ঈশ্বর পাপেও উপস্থিত আছেন, যা সোজা কথায় ঈশ্বরের অন্ধকার দিক, আলোর কিঞ্চিৎ অভাব মাত্র। প্রতিপক্ষ বথিউমলিকে নাস্তিক বলে নিন্দা জানিয়েছে, কিন্তু তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ফক্স, ওয়েসলি এবং যিযেনবার্গ চেতনা হতে দূরবর্তী নয়, যদিও বেশ। চাঁছাছোলাভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ের পিয়েটিস্ট ও মেথডিস্টদের মতো তিনি দূরবর্তী ও অমানবিকভাবে বস্তুনিষ্ঠ হয়ে ওঠা এক ঈশ্বরকে অন্তরীকরণ করার প্রয়াস পেয়েছিলেন ও প্রচলিত মতবাদকে ধর্মীয় অনুভূতিতে পরিবর্তন করতে চেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে আলোকন পর্বের দার্শনিক ও হৃদয়ের ধর্মের অনুসারীদের কর্তৃত্বের প্রত্যাখ্যান ও অত্যাবশ্যকীয়ভাবে মানবতার আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির অংশীদার ছিলেন।
পাপের পবিত্রতার গভীরভাবে উত্তেজক ও বিদ্রোহী মতবাদ নিয়ে কাজ করছিলেন বথিউমলি। ঈশ্বর যদি সবকিছু হন, পাপ কিছুই নয়-লরেন্স ক্লার্কসন এবং অ্যালাস্টেয়ার-এর মতো র্যান্টার্সরা প্রচলিত যৌন আচরণ বিধি লঙ্ঘন বা প্রকাশ্যে মুখখিস্তি ও ব্লাসফেমি করে এই বিষয়টি তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছিলেন। কপ বিশেষত মাতলামী ও ধূমপানের জন্যে বিখ্যাত ছিলেন। র্যান্টার হওয়ার পর তিনি স্পষ্টতই দীর্ঘদিন দমিয়ে রাখা ইচ্ছা পূরণ করেছিলেন গালিগালাজ আর মুখখিস্তি করে। আমরা শুনতে পাই, তিনি লন্ডনে এক চার্চের পুলপিটে দাঁড়িয়ে টানা এক ঘন্টা গালিগালাজ করেছিলেন এবং এক ট্যাভার্নের হোস্টেসকে এমন জঘন্য মুখ খারাপ করেছিলেন যে বেচারি পরে কয়েক ঘন্টা ধরে আতঙ্কে কেঁপেছে। এটা মানব জাতির পাপময়তার ওপর অস্বাস্থ্যকর মনোযোগ সম্পন্ন নিপীড়ক পিউরিটান নৈতিকতার প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকতে পারে। ফক্স ও তাঁর কোয়াকাররা জোরের সঙ্গে বলেছেন, পাপ কোনভাবেই অনিবার্য ছিল না। তিনি অবশ্যই বন্ধুদের পাপে উৎসাহ দেননি, র্যান্টার্সদের উদ্ধৃঙ্খলতাকে তিনি ঘৃণা করতেন, কিন্তু তারও আশাব্যঞ্জক নৃতত্ত্ব প্রচার এবং ভারসাম্য আনতে চেয়েছিলেন। লরেন্স ক্লার্কসন তাঁর রচনা সিঙ্গল আই-তে যুক্তি দিয়েছেন যে, ঈশ্বর যেহেতু সকল বস্তুকে ভালো অবস্থায় সৃষ্টি করেছেন, সেহেতু কেবল মানুষের কল্পনাতেই পাপে’র অবস্থান। ঈশ্বর স্বয়ং বাইবেলে দাবি করেছেন যে, তিনি অন্ধকারকে আলোয় পরিণত করবেন। একেশ্বরবাদীরা সবসময় পাপের বাস্তবতাকে মেনে নিতে অসুবিধার সম্মুখীন হয়ে এসেছে, যদিও অতিন্দ্রীয়বাদীরা আরও অধিকতর হলিস্টিক দর্শন আবিষ্কারের প্রয়াস পেয়েছে। নরউইচের জুলিয়ান বিশ্বাস করতেন যে, পাপ মানানসই ও কোনওভাবে প্রয়োজনীয়। কাব্বালিস্টরা মত দিয়েছিল যে, রহস্যজনকভাবে পাপ ঈশ্বরের মাঝে প্রোথিত। ক্লার্কসন ও কপদের মতো ব্যান্টার্সদের চরম উদারবাদকে একজন ক্রুদ্ধ প্রতিশোধপরায়ণ ঈশ্বরের মাধ্যমে বিশ্বাসীকে আতঙ্কিত করে তোলা নিপীড়ক খৃস্টধর্মকে ঝেড়ে ফেলার প্রয়াস হিসাবে দেখা যেতে পারে। যুক্তিবাদী ও ‘আলোকিত’ ক্রিশ্চানরাও ঈশ্বরকে নিষ্ঠুর কর্তৃত্বময় চরিত্র হিসবে উপস্থাপনকারী ধর্মের সংযোজন ঝেড়ে ফেলার প্রয়াস পাচ্ছিল। একজন কোমলতর উপাস্য আবিষ্কার করতে চেয়েছে তারা।
