এই নতুন ধর্মীয় চেতনার সবচেয়ে চরম রূপটির সঙ্গে মধ্যযুগের শেষ পাদের ব্রেদরেন অভ দ্য স্পিরিট নামে পরিচিত ধর্মদ্রোহীদের অনেক ক্ষেত্রেই মিল রয়েছে। বৃটিশ ইতিহাসবিদ নরম্যান কন তার দ্য পারসুট অভ দ্য মিলেনিয়াম, রেভুলেশনারি মিলেনারিয়ানস অ্যান্ড মিস্টিক্যাল অ্যানারকিস্ট অভ দ্য মিডল এজেস-এ যেমন ব্যাখ্যা করেছেন, প্রতিপক্ষ ব্রেদরেন-এর বিরুদ্ধে সর্বেশ্বরবাদের অভিযোগ তুলেছিল। তারা এটা বলতে দ্বিধা করেনি যে: ‘সবকিছুই ঈশ্বর, প্রতিটি পাথরে ও মানব দেহের প্রতিটি অঙ্গে ঈশ্বর রয়েছেন, ঠিক ইউক্যারিস্টের রুটির মতো যা সন্দেহাতীত “সৃষ্ট প্রতিটি বস্তুই স্বর্গীয়”।৩৫ এটা ছিল প্লাটিনাসের দর্শনের নব ব্যাখ্যা। দ্য ওয়ান হতে উৎসাহিত সকল বস্তুও চিরন্তন সত্তা, স্বর্গীয়। অস্তিত্বমান সবকিছুই স্বর্গীয় উৎসে ফিরে যেতে চায় ও শেষ পর্যন্ত আবার ঈশ্বরের মাঝে বিলীন হবে: এমনকি ট্রিনিটি তিনটি সত্তাও শেষ অবধি আদি একত্বে বিলীন হবে। এই পৃথিবীতে আপন স্বর্গীয় প্রকৃতির স্বীকৃতির মাধ্যমে মুক্তি অর্জিত হয়। রাইনের কাছে এক কুটিরের সেলে পাওয়া জনৈক ব্রেদরেনের রচিত এক প্রবন্ধে ব্যাখ্যা করা হয়েছে: ‘স্বর্গীয় সত্তা আমার সত্তা আর আমার সত্তাই স্বর্গীয় সত্তা। ব্রেদরেন বারবার ঘোষণা দিয়েছে: প্রতিটি যুক্তিবাদী প্রাণী প্রকৃতি বা স্বভাবগত কারণেই আশীর্বাদ প্রাপ্ত।৬ এটা যতটা দার্শনিক বিশ্বাস তারচেয়ে বেশি মানবীয় সীমাকে অতিক্রম করার আবেগময় আকাক্ষা। স্ট্রাসবর্গের বিশপ যেমন বলেছেন, দেরেনরা বলে স্বভাবগত কারণে তারা ঈশ্বর, কোনওরকম পার্থক্য নেই। তারা বিশ্বাস করে স্বর্গীয় সকল সম্পূর্ণতা রয়েছে তাদের মাঝে, তারা চিরন্তন এবং চিরকালীন।[৩৭]
কন যুক্তি দেখিয়েছেন, ক্রমওয়েলের ইংল্যান্ডের কোয়াকার্স, লেবেলার্স ও র্যান্টার্স এর মতো চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো আসলে চতুর্দশ শতকের ধর্মদ্রোহী ফ্রি স্পিরিট গোষ্ঠীটিরই পুনর্জাগরণ ছিল। অবশ্যই এটা সচেতন পুনর্জাগরণ ছিল না, তবে সপ্তদশ শতকের এই উৎসাহীরা স্বাধীনভাবে এক সর্বেশ্বরবাদী দর্শন অর্জন করেছিল যাকে অচিরেই স্পিনোযা আবিস্কৃত দার্শনিক সর্বেশ্বরবাদের জনপ্রিয় ভাষ্য হিসাবে দেখাটা কঠিন। উইনস্ট্যানলি খুব সম্ভব একজন দুয়ে ঈশ্বরের অস্তিত্বে মোটেই বিশ্বাস করতেন না, যদিও তিনি অন্য চরমপন্থীদের মতো-আপন বিশ্বাসকে ধারণাগতভাবে প্রণয়নে অনিচ্ছুক ছিলেন। এইসব বিপ্লবী গোষ্ঠীর কেউই আসলে তারা তাদের মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক জেসাসের নিবেদিত প্রায়শ্চিত্তের কাছে ঋণী থাকার কথা বিশ্বাস করত না। তাদের কাছে জেসাস এমন একজনের উপস্থিতি বোঝায় যিনি গোষ্ঠীর সদস্যদের মাঝে মিশে আছেন, যাকে আসলে পবিত্র আত্মা হতে আলাদা করা যায় না। প্রত্যেকে একথা স্বীকার করেছে, পয়গম্বরত্বই ঈশ্বর লাভের প্রধান উপায় এবং আত্মার কাছে থেকে প্রাপ্ত প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণা প্রতিষ্ঠিত ধর্মগুলোর শিক্ষার চেয়ে শ্রেয়তর। ফক্স তার অনুসারীদের নীরবতার মাঝে ঈশ্বরের প্রতীক্ষা করার শিক্ষা দিয়েছিলেন, যা গ্রিক হেসিচ্যাজম বা মধ্যযুগীয় দার্শনিকদের ভায়া নেগেতির কথা মনে করিয়ে দেয়। ট্রিনিটারি ঈশ্বরের পূর্বতন ধারণা বিলুপ্ত হচ্ছিল: সর্বব্যাপী এই স্বর্গীয় সত্তাকে তিনটি সত্তায় ভাগ করা যায় না। একত্ব ছিল এর মূল সুর, যা বিভিন্ন গোষ্ঠীর একতা ও সাম্যতার নীতির মাঝে ফুটে উঠেছে। ব্রেদরেনদের মতো ব্ল্যান্টার্সদের কেউ কেউ নিজেদের স্বর্গীয় ভেবেছে: কেউ কেউ নিজেকে ক্রাইস্ট বা ঈশ্বরের নতুন অবতার দাবি করেছে। মোসায়াহ হিসাবে তারা এক বিপ্লবাত্মক মতবাদ ও নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার কথা প্রচার করেছে। এভাবে প্রেসবিটেরিয়ান সমালোচক টমাস এডওয়াডর্স তার যুক্তিপূর্ণ রচনা গ্রাগ্রায়েনা অর আ ক্যাটালগ অ্যান্ড ডিসকভারি অভ মেনি অভ দ্য এরোটর্স, হেরেসিজ, ব্লাসফেমিজ, অ্যান্ড পারনিশাস প্র্যাকটিসেস অভ দ্য সেক্টারিয়ানস অভ দিস টাইম (১৬৪০) র্যান্টার্সদের বিশ্বাসের সার কথা তুলে ধরেছেন;
সৃষ্টির প্রথম প্রত্যেক সৃষ্টিই ঈশ্বর ও প্রতিটি সৃষ্টিই ঈশ্বর, প্রাণ আছে ও শ্বাসপ্রশ্বাস নেয়, এমন প্রতিটি সৃষ্টিই ঈশ্বরের নিকট হতে নির্গত এবং আবার ঈশ্বরে প্রত্যাবর্তন করবে, সাগরের বুকে জলবিন্দুর মতো আবার মিশে যাবে তার সঙ্গে…পবিত্র আত্মায় দীক্ষিত মানুষ ঈশ্বর যেমন সব জানেন, ঠিক সেভাবে সবকিছু জানে, যা এক গভীর রহস্যময়। ব্যাপার…মানুষ যদি অন্তর থেকে জানে যে সে আশীর্বাদ পেয়েছে, যদি সে হত্যা করে বা মাতাল হয়ে পড়ে, ঈশ্বর তার মাঝে পাপ দেখেন না… গোটা পৃথিবীই সাধু, ভালো মানুষের একটা সমাজ থাকা প্রয়োজন ও সাধুদের উচিত সজ্জন এবং এ জাতীয় মানুষের সঙ্গে একই স্থানে বসবাস করা।
স্পিনোযার মতো র্যান্টার্সদের বিরুদ্ধেও নাস্তিক্যবাদের অভিযোগ উঠেছে। তারা তাদের উদারপন্থী বিশ্বাসে স্বেচ্ছায় ক্রিশ্চান টাবু লঙ্ঘন করে ব্লাসফেমাসের মতো দাবি করেছে, ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই। কান্ট বা স্পিনোযার মতো বৈজ্ঞানিক বিমূর্ততা বোঝার ক্ষমতা সবার ছিল না, কিন্তু র্যান্টার্সদের আত্ম-পরমানন্দ বা কোয়াকারদের ‘অন্তরের আলোয় বহু শতাব্দী পরে ফরাসি বিপ্লবীদের প্রকাশিত আকাঙ্ক্ষার মিল দেখা যাওয়া সম্ভব। যারা দেবনিচয়ে যুক্তি দেবীকে অধিষ্ঠিত করেছিল।
