সমস্ত শরীর ক্ষত, রক্তাক্ত। তাঁর পবিত্র রক্ত স্রোতের মতো বেরিয়ে আসছিল চারপাশ থেকে: ‘আমাকে কেউই, বিষণ্ণ ও দুঃখভরা কণ্ঠে বলেছেন তিনি, করুণা করবে না, দয়া দেখাবে না, আমার দুঃখের সঙ্গী হবে না, যে করুণ অবস্থায় পাপীরা আমাকে নামিয়ে এনেছে, বিশেষ করে এই সময়।[৩১]
প্রচণ্ড রকম উত্তেজিত স্নায়ুর মহিলা মার্গারিট-মেরি যৌনতার প্রতি নিজের চরম ঘৃণার কথা স্বীকার গেছেন, খাবারের অসুস্থতায় ভুগেছেন, পবিত্র হৃদয়ের প্রতি নিজের ভালোবাসা দেখাতে মর্ষকামী আচরণ করেছেন, তাঁর আচরণ দেখায়, কেবল হৃদয়ের ধর্ম কীভাবে জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাঁর ক্রাইস্ট প্রায়শঃই ইচ্ছাপূরণের অতিরিক্ত কিছু নন, যার পবিত্র হৃদয় যে ভালোবাসা তিনি কখনও পাননি তা পুষিয়ে দেয়: ‘আজীবন তুমি এর প্রিয় শিষ্য থাকবে, এর আনন্দের সামগ্রী ও ইচ্ছার শিকার বলেছেন তাঁকে জেসাস, এটা তোমার দোষ-ত্রুটি শুধরে দেবে, তোমার হয়ে দায়িত্ব পালন করবে।৩২ কেবল মানুষ জেসাসের প্রতি গুরুত্ব আরোপের এরকম ধর্মানুরাগ এক অভিক্ষেপ মাত্র, যা কোনও ক্রিশ্চানকে নিউরোটিক ইগোটিজমে বন্দি করে ফেলে।
আমরা আলোকনের শীতল যুক্তিবাদ ছেড়ে অনেক দূরে এসে পড়েছি, কিন্তু সর্বোত্তম অবস্থায় হৃদয়ের ধর্মের সঙ্গে ডেইজমের একটা যোগসূত্র রয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ, পিয়েটিস্ট হিসাবে কমিগসবার্গে বেড়ে উঠেছিলেন কান্ট, এই লুথারান গোষ্ঠীতে যিযেনদর্কেরও মূল প্রোথিত ছিল। কান্টের প্রস্ত বিত স্বাধীন যুক্তির সীমানায় ধর্ম পিয়েটিস্টদের কর্তৃত্ববাদী চার্চের মতবাদসমূহের মাঝে প্রতিষ্ঠিত প্রত্যাদেশের চেয়ে ‘আত্মার একেবারে গভীরভাবে স্থাপিত ধর্মের অনেক কাছাকাছি। কান্ট যখন তাঁর ধর্ম সম্পর্কে চরম দৃষ্টিভঙ্গির জন্য পরিচিত হয়ে উঠলেন, তখন বলা হয়, তিনি তার পিয়েটিস্ট সেবকদের এই বলে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, কেবল বিশ্বাসের জন্য স্থান তৈরি করতে উগমাকে ধ্বংস করেছেন তিনি। জন ওয়েসলি আলোকন মোহিত ছিলেন ও বিশেষভাবে স্বাধীনতার আদর্শের প্রতি সহানুভূতি পোষণ করতেন। বিজ্ঞান ও কারিগরী শিক্ষায় আগ্রহী ছিলেন তিনি, শখ বশতঃ বৈদ্যুতিক পরীক্ষা-নীরিক্ষা চালিয়েছেন এবং মানুষের প্রকৃতি ও প্রগতির সম্ভাবনা নিয়ে আলোকন পর্বের আশাবাদের অংশীদার ছিলেন। আমেরিকান পণ্ডিত অ্যালবার্ট সি.আউটলার দেখিয়েছেন, নতুন হৃদয়ের ধর্ম ও আলোকন পর্বের যুক্তিবাদ, উভয়ই প্রশাসন বিরোধী ছিল এবং উভয়ই বাহ্যিক কর্তকে অবিশ্বাস করেছে; উভয়ই প্রাচীনের বিরুদ্ধে নিজেদের আধুনিকদের কাতারে ফেলেছে, উভয়ই অমানবিকতাকে ঘৃণা করেছে ও জনসেবার প্রতি উৎসাহ দেখিয়েছে। প্রকতৃপক্ষে এমন মনে হয় যেন চরম ধর্মানুরাগ আসলেই ইহুদি ও ক্রিশ্চানদের মাঝে আলোকন পর্বের আদর্শসমূহের শিকড় গেড়ে বসার পথকে প্রশস্ত করেছিল। এই দুটো চরমপন্থী আন্দোলনের মাঝে লক্ষণীয় মিল রয়েছে। এই গোষ্ঠীগুলোর অনেকেই বিভিন্ন ধর্মীয় টাবু বা প্রথা লংঘনের মাধ্যমে সময়ের ব্যাপক পরিবর্তনে সাড়া দিয়েদিল বলে মনে হয়। কেউ কেউ ব্লাসফেমাস হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে: কাউকে নাস্তিক আখ্যা দেওয়া হয়েছে, আবার কারও নেতারা নিজেদের ঈশ্বরের অবতার দাবি করে বসেছেন। এই গোষ্ঠী দুটোর অনেকেরই হাবভাবে মেসিয়ানিক সুর ছিল ও এক সম্পূর্ণ নতুন পৃথিবী আগমন অত্যাসন্ন দাবি করেছে।
১৬৪৯ সালে রাজা প্রথম চার্লসের হত্যাকাণ্ডের পর বিশেষ করে অলিভার ক্রমওয়েলের পিউরিটান সরকারের শাসনামলে ইংল্যান্ডে এক প্রলয়বাদী উত্তেজনার প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল। পিউরিটান কর্তৃপক্ষের পক্ষে সেনাবাহিনীর সদস্য ও সাধারণ মানুষের মাঝে দেখা দেওয়া ধর্মীয় উন্মাদনাকে বাগ মানানো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল, এদের অনেকের মাঝেই দৃঢ়বিশ্বাস জেগে উঠেছিল যে, প্রভুর রাজ্য প্রতিষ্ঠার দিন সমাগত। বাইবেলে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ঈশ্বর তাঁর জাতির ওপর আত্মা অবতীর্ণ করবেন ও খোদ ইংল্যান্ডেই আপন রাজ্য স্থাপন করবেন। ১৬২০-এর দশকে নিউ ইংল্যান্ডে বসতি স্থাপনকারী পিউরিটানদের মতো ক্রমওয়েল স্বয়ং যেন একই ধরনের আশা পোষণ করেছিলেন। ১৬৪৯ সালে জেরার্ড উইন্সট্যানলি সারের কবহ্যামে তার কমিউনিটি অভ ‘ডিগার্স প্রতিষ্ঠা করেন, তিনি স্বর্গোদ্যানে যখন আদম চাষ। করেছেন, মানব জাতিকে সেই আদিম অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন। তাঁর নতুন সমাজে ব্যক্তিগত সম্পত্তি, শ্ৰেণী বৈষম্য ও মানবীয় কর্তৃত্ব অস্তিত্ব হারাবে। কোয়াকারস–জর্জ ফক্স ও জেমস নায়লর ও তাদের অনুসারীরা-প্রচার করেন যে, সকল নারী-পুরুষ সরাসরি ঈশ্বরের নৈকট্য লাভ করতে পারে। প্রত্যেকের হৃদয়ে এক অন্তস্থঃ আলো আছে, একবার এর সন্ধান পাওয়ার পর পরিচর্যা করা হলে শ্রেণী ও পদমর্যাদা নির্বিশেষে প্রত্যেকে এই পার্থিব জগতেই মুক্তি লাভ করতে পারবে। ফক্স স্বয়ং তার সোসাইটি অভ ফ্রেন্ডস-এর জন্যে শান্তিবাদ, অহিংসা ও চরম সাম্যতার নীতি প্রচার করেছিলেন। প্যারিসবাসীরা বাস্তিলে হানা দেওয়ার প্রায় ১৪০ বছর আগেই ইংল্যান্ডে স্বাধীনতা, সাম্য ও সৌভ্রাতৃত্ববোধের ধারণা জন্ম লাভ করেছিল।
