অবশ্য, কোনও কোনও ক্রিশ্চানের কাছে একে মুক্তিদায়ী মনে হয়েছিল, যারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করত যে, ঈশ্বর বিশ্বাসের একটি পথ বন্ধ করেছেন আরেকটি খুলে দেওয়ার জন্যে। আ প্লেইন অ্যাকাউন্ট অভ জেনুইন ক্রিশ্চানিটি তে জন ওয়েসলি (১৭০৩-৯১) লিখেছেন:
কখনও কখনও আমি প্রায় বিশ্বাস করে বসেছি যে, ঈশ্বরের প্রজ্ঞা অনেক পরবর্তীকালে খৃস্টধর্মের বাহ্যিক প্রমাণকে অধিকতর কম প্রতিবন্ধক বা বাধা হিসাবে কাজ করার অনুমতি দিয়েছেন যাতে মানুষ (বিশেষ করে চিন্তাশীলরা) এখানেই আটকে না থেকে নিজেদের মাঝেও দৃষ্টিপাত করতে বাধ্য হয় ও তাদের অন্তরে দেদীপ্যমান আলো খুঁজে পায়।[২৬]
আলোকন পর্বের যুক্তিবাদের পাশাপাশি এক নতুন ধরনের ধার্মিকতার বিকাশ ঘটেছিল, যাকে প্রায়ই হৃদয় বা অন্তরের ধর্ম হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়। যদিও মগজের চেয়ে অন্তরেই এটার অবস্থান ছিল, কিন্তু এর সঙ্গে ডেইজম-এর অনেক পূর্বশর্তের মিল ছিল। নারী ও পুরুষকে বাহ্যিক প্রমাণ ও কর্তৃত্ব ত্যাগ করে প্রত্যেকের হৃদয় ও ক্ষমতায় বিরাজমান ঈশ্বরকে আবিষ্কারের তাগিদ দিয়েছে এটা। বহু ডেইস্টের মতো ওয়েসলি ভাইরা বা জার্মান পিয়েটিস্ট কাউন্ট নিকোলাস লুদভিগ ফন যিযেন (১৭০০-৬০)-এর অনুসারীরা শত শত বছরের সংযোজন ঝেড়ে ফেলে ও প্রাথমিক ক্রিশ্চানদের ‘সহজ এবং ‘খাঁটি খৃষ্টধর্মে প্রত্যাবর্তন করছে বলে ভেবেছে।
জন ওয়েলসলি আগাগোড়া আন্তরিক ক্রিশ্চান ছিলেন। অক্সফোর্ডের লিংকন কলেজের তরুণ ফেলো থাকতে ভাই চালর্সকে নিয়ে আন্ডার গ্রাজুয়েটদের এটা সমিতি গঠন করেছিলেন তিনি, যা হোলি ক্লাব নামে পরিচিত ছিল। পদ্ধতি ও শৃঙ্খলার ব্যাপারে খুব কঠোর ছিল এই সমিতি, তাই এর সদস্যরা মেথডিস্ট বলে পরিচিত ছিলেন। ১৭৩৫ সালে জন ও চার্লস মিশনারি হিসাবে আমেরিকার কলোনি জর্জিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করেন, কিন্তু দু’বছর পর অশান্ত অবস্থায় ফিরে আসেন জন, ডায়েরিতে লেখেন, ‘আমি আমেরিকায় গিয়েছিলাম ইন্ডিয়ানদের দীক্ষিত করতে, কিন্তু হায়, আমাকে দেবে কে দীক্ষা?”২৭ যাত্রাকালীন সময় ওয়েসলি মোরাভিয় গোষ্ঠীর কয়েকজন মিশনারি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন, এই গোষ্ঠীটি সকল মতবাদ এড়িয়ে ধর্মকে হৃদয়ের ব্যাপার বলে জোর দিয়েছিল। ১৭৩৮ সালে লন্ডনে অ্যাল্ডারগেট স্ট্রীটের চ্যাপেলে মোরাভিয়দের এক সমাবেশ চলাকালীন ধর্মান্তর-এর অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন তিনি যা থেকে তার মনে বিশ্বাস জন্মে, এই নতুন ধরনের খৃস্টধর্ম প্রচারের জন্য তিনি সরাসরি ঈশ্বরের কাছ থেকে নির্দেশ পেয়েছেন। সেই থেকে তিনি ও তাঁর অনুসারীরা দেশময় ঘুরে বাজার আর ক্ষেত-খামারের শ্রমিকশ্রেণী ও কৃষকদের মাঝে ধর্মপ্রচার শুরু করেছিলেন।
‘আবার জন্মলাভে’র অনুভূতিটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঈশ্বর অবিরাম মানুষের আত্মায়, যেমন বলা হয়েছে, শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছেন বোধ করাটা খুবই দরকার, ক্রিশ্চানকে যা ঈশ্বরের প্রতি ধারাবাহিক ও কৃতজ্ঞতাময় ভালোবাসায় ভরিয়ে দেয় যা সচেতনভাবে অনুভূত হয় ও একে স্বাভাবিক ও এক অর্থে ঈশ্বর পুত্রদের প্রত্যেককের জন্যে দয়া, কোমলতা ও দীর্ঘ কষ্টভোগের সাহায্যে ভালোবাসতে শেখায়। ঈশ্বর সম্পর্কিত মতবাদসমূহ অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশ্বাসীর মনে ক্রাইস্টের বাণীর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবই ধর্মের খাঁটিত্বের সেরা প্রমাণ। পিউরিটানবাদে যেমন আবেগসঞ্জাত অনুভূতিই প্রকৃত বিশ্বাসের ও সেদিক থেকে মুক্তির একমাত্র প্রমাণ। কিন্তু সর্বজনীন এই অতিন্দ্রীয়বাদ বিপজ্জনক হতে পারে। অতিন্দ্রীয়বাদীরা সব সময় আধ্যাত্মিক পথের বিপদসঙ্কুলতার ওপর জোর দিয়েছে, হিস্টেরিয়ার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছে: শান্তি ও স্থিরতা ছিল অতিন্দ্রীয়বাদের চিহ্ন। এবং নবজন্ম” খৃস্টবাদ কুয়াকার্স ও শেকার্সদের উন্মত্ত আচরণের মতো উন্মত্ততার জন্ম দিতে পারে। ফলে হতাশারও সৃষ্টি হতে পারে: কবি উইলিয়াম কাউপার উদ্ধার পাননি ভেবে উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলেন, তাঁর অনুভূতির ঘাটতিকে অভিশপ্ত হওয়ার লক্ষণ ভেবেছেন।
হৃদয়ের ধর্মের ক্ষেত্রে ঈশ্বর সম্পর্কিত মতবাদসমূহ অন্তৰ্গত আবেগের অবস্থায় পরিবর্তিত হয়। এইভাবে সাকসানিতে নিজস্ব এস্টেটে বসবাসকারী বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনের পৃষ্ঠপোষক কাউন্ট ফন নিযেনদর্ফ ওয়েসলির মতো যুক্তি দিয়েছেন যে, ধর্মবিশ্বাসের অবস্থান চিন্তায় বা মস্তিষ্কে নয় বরং হৃদয়ের আলোকিত এক প্রদীপে। পণ্ডিতগণ ‘ট্রিনিটির রহস্য নিয়ে আলোচনায় মেতে থাকতে পারেন, কিন্তু এই মতবাদের অর্থ তিনটি সত্তার পারস্পরিক সম্পর্কে নয়, বরং আমাদের কাছে তাদের তাৎপর্য।৩০ অবতার ব্যক্তি পর্যায়ে ক্রিশ্চানের নবজন্মের প্রকাশ করেছে, ক্রাইস্ট যখন হৃদয়ের অধিশ্বরে পরিণত হয়েছেন। আবেগ-নির্ভর আধ্যাত্মিকতা জেসুইট ও প্রশাসন যন্ত্রের তীব্র বিরোধিতার মুখে প্রতিষ্ঠা লাভ করা স্যারেড হার্ট অভ জেসাসের প্রতি নিবেদিত রোমান ক্যাথলিক চার্চেও দেখা দিয়েছিল। জেসুইট ও প্রশাসন এর পৌনঃপৌনিক আবেগপ্রবণ অনুভূতির বাড়াবাড়িকে সন্দেহের চোখে দেখত। আজও তা টিকে আছে: বহু রোমান ক্যাথলিক চার্চে ক্রাইস্টের উন্মুক্ত বুকে অগ্নিশিখায় পরিবেষ্টিত কণ্ডাকৃতি হৃদয় দেখানো মূর্তি আছে। এরকম দৈহিক রূপ নিয়েই তিনি ফ্রান্সের প্যারেয়-লে মনিয়ালস্থ কনভেন্টে মার্গারিট-মেরি অ্যালাকোক (১৬৪৭-৯০)-এর সামনে দেখা দিয়েছিলেন। এই ক্রাইস্টের সঙ্গে গস্পেলের ক্ষতবিক্ষত চারিত্রের কোনও মিল নেই। আত্ম-করুণার সময় তিনি মস্তিষ্ককে বাদ দিয়ে কেবল হৃদয়ের দিকে মনোনিবেশ করার বিপদকে তুলে ধরেছেন। ১৬৮২ সালে মার্গারিট মেরি লেন্ট এর সূচনায় জেসাসের আবির্ভাবের প্রসঙ্গ স্মরণ করেছেন:
