১৭৬৭ সালে যখন ফিদন প্রকাশিত হয়, আত্মার অমরত্বের পক্ষে এর দার্শনিক যুক্তি ইতিবাচকভাবে, আবার কখনও কখনও পৃষ্ঠপোষকতার সঙ্গে জেন্টাইল বা ক্রিশ্চান বলয়ে গৃহীত হয়েছিল। এক তরুণ সুইস প্যাস্টর ইয়োহান ক্যাস্পার লেভের লেখেন যে, লেখক খৃস্টধর্ম গ্রহণে প্রস্তুত আছেন; মেলেসনকে তিনি প্রকাশ্যে তাঁর ইহুদিবাদের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরার জন্যে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন । মেন্দেলসন তখন প্রায় ইচ্ছার বিরুদ্ধেই ইহুদিবাদের পক্ষে যৌক্তিক বিতর্কে অবতীর্ণ হন, যদিও মনোনীত জাতি বা প্রতিশ্রুত ভূমির মতো প্রচলিত বিশ্বাস লালন করতেন না তিনি। তাঁকে একটা সীমারেখা টানতে হয়েছিল: তিনি স্পিনোযার পথে যেতে চাননি বা ইহুদিবাদের পক্ষে তাঁর যুক্তি বেশি সফল হলে ক্রিশ্চানদের আক্রোশ নেমে আসুক, তাও নয়। অন্যান্য ডেইস্টের মতো তিনি যুক্তি তুলে ধরেছিলেন যে, সত্যিসমূহ যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করা গেলেই কেবল প্রত্যাদেশ গ্রহণ করা যেতে পারে । ট্রিনিটির মতবাদ তার নির্ধারিত যোগ্যতা অর্জন করেনি। ইহুদিবাদ প্রত্যাদিষ্ট ধর্ম ছিল না, বরং প্রত্যাদিষ্ট আইন। ঈশ্বর সম্পর্কে ইহুদিদের ধারণা গোটা মানব জাতির স্বাভাবিক ধর্মের ঈশ্বরের ধারণায় অনুরূপ, স্বাধীন যুক্তি দিয়েই প্রমাণ করা যেতে পারে। মেন্দেলসন প্রাচীন সৃষ্টি তত্ত্বীয় ও অন্টোলজিক্যাল প্রমাণের ওপর নির্ভর করেছেন; এই বলে যুক্তি দিয়েছেন যে, আইনের ভূমিকা ছিল ইহুদিদের ঈশ্বর সম্পর্কে সঠিক ধারণা গড়ে তোলা ও বহুঈশ্বরবাদীতা এড়াতে সাহায্য করা । সহিষ্ণুতার আবেদন জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেছিলেন তিনি। ইহুদিবাদসহ যুক্তি ভিত্তিক বিশ্বজনীন ধর্ম ঈশ্বরকে জানার অন্যান্য উপায়কে শ্রদ্ধা করতে শেখাবে, এটাই প্রত্যাশিত; ইউরোপের চার্চগুলো শত শত বছর ধরে যার ওপর নিপীড়ন চালিয়ে এসেছে।
ইহুদিরা মেন্দেলনের চেয়ে ইম্যানুয়েল কান্টের দর্শনে অনেক বেশি প্রভাবিত হয়েছিল; তার ক্রিটিক অভ পিউর রিজন (১৭৮১) মেন্দেলসনের জীবনের শেষ দশকে প্রকাশিত হয়। কান্ট আলোকনের সংজ্ঞা দিয়েছেন ‘মানুষের স্ব-আরোপিত অভিভাবকত্ব হতে এক্সোডাস’ বা বাহ্যিক কর্তৃত্বের ওপর আস্থা স্থাপন’২৫ বলে। স্বায়ত্তশাসিত নৈতিক বিবেকের মাধ্যমে অগ্রসর হওয়াই ঈশ্বরকে জানার একমাত্র উপায়, যাকে তিনি বলেছেন ‘ব্যবহারিক যুক্তি। তিনি চার্চের কর্তৃত্ব, প্রার্থনা ও আচারাদির মতো ধর্মের অনেক আনুষ্ঠানিকতা বাদ দিয়েছেন, মানুষকে যেগুলো আপন ক্ষমতায় নির্ভর করা হতে বিরত রাখে ও অন্যের ওপর নির্ভর করতে উৎসাহিত করে। কিন্তু কান্ট ঈশ্বরের ধারণার বিরুদ্ধে ছিলেন না। কয়েক শতাব্দী আগের আল-গাযযালির মতো তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন যে, ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কিত প্রচলিত যুক্তিগুলো অর্থহীন, কারণ আমাদের মন কেবল স্থান বা কালে অস্তিত্বমান বস্তুকেই বুঝতে পারে; এর বাইরে অবস্থানকারী বস্তুনিচয় বিবেচনা করার যোগ্যতা রাখে না। তবে তিনি একথা মেনে নিয়েছিলেন যে, মানুষের এই সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে যাবার স্বাভাবিক প্রবণতা রয়েছে; সে ঐক্যের একটা নীতির সন্ধান করে যা আমাদের সামঞ্জস্যপূর্ণ সমগ্র হিসাবে বাস্তবতার একটা দর্শন দেবে। এটাই ঈশ্বরের ধারণা। যুক্তি দিয়ে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়, আবার উল্টোটিও প্রমাণ করা অসম্ভব। ঈশ্বরের ধারণা আমাদের জন্যে অত্যাবশ্যক ছিল: এটা আদর্শ সীমা প্রকাশ করেছে যা আমাদের জগৎ সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণা লাভে সক্ষম করে তুলেছে।
সুতরাং, কান্টের ক্ষেত্রে ঈশ্বর একটি সুবিধা বা সুযোগ মাত্র যার অপব্যবহার হতে পারে। প্রাজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের ধারণা বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে ও দেউস এক্স মেশিনা (deus ex machina)র উপর অলস নির্ভরতার দিকে ঠেলে দেবে। এটা অপ্রয়োজনীয় রহস্যময়তার উৎসও হয়ে দাঁড়াতে পারে যা চার্চের ইতিহাসকে ক্ষতবিক্ষতকারী সেই দুঃসহ বিবাদের মতো বিবাদ সৃষ্টি করে । কান্ট হয়তো নিজেকে নাস্তিক মানতেন না। সমসাময়িকেরা তাঁকে ধার্মিক হিসাবে বর্ণনা করেছেন, যিনি অশুভের প্রতি মানুষের ক্ষমতার ব্যাপারে গভীরভাবে সজাগ ছিলেন। এটাই তার কাছে ঈশ্বরের ধারণাকে অত্যাবশ্যকীয় করে তুলেছিল। তিনি তার ক্রিটিক অভ প্র্যাকটিক্যাল রিজন-এ যুক্তি দিয়েছেন যে, নৈতিক জীবন যাপন করার জন্যে নারী ও পুরুষের একজন পরিচালনাকারী দরকার, যিনি সগুণকে সুখ দিয়ে পুরস্কৃত করবেন। এই দৃষ্টিকোণে, ঈশ্বরকে স্রেফ দ্বিতীয় চিন্তা হিসাবে নীতি ব্যবস্থার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। ধর্মের কেন্দ্রবিন্দু এখন আর ঈশ্বরের রহস্য নয়, বরং খোদ মানুষ। ঈশ্বর এক কৌশলে পরিণত হলেন যিনি আমাদের আরও দক্ষতার সঙ্গে ও নৈতিকতা মেনে কাজ করতে সক্ষম করে তোলেন, তিনি আর সকল সত্তার মূল থাকলেন না। অচিরেই কিছু মানুষ তার স্বাধীনতার আদর্শকে আরেক কদম বাড়িয়ে এই প্রায় ক্ষীণকায় ঈশ্বরকে পুরোপুরি বাদ দেবে। কান্ট ছিলেন পশ্চিমের প্রথম কয়েকজনের অন্যতম যারা প্রচলিত প্রমাণের বৈধতার প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, দেখিয়ে দিয়েছেন আসলে এগুলো কিছু প্রমাণ করে না । এসব প্রমাণ আর কখনওই আগের মতো বিশ্বাসযোগ্য প্রতীয়মান হবে না।
