দেকার্তের মতো ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণের ক্ষেত্রে অন্টোলজিক্যাল প্রমাণের দ্বারস্থ হয়েছেন স্পিনোযা। খোদ ‘ঈশ্বরের ধারণাটিই ঈশ্বরের অস্তিত্বকে প্রমাণ করে, কেননা অস্তিত্বহীন একটি সম্পূর্ণ সত্তা এক্ষেত্রে স্ববিরোধী হয়ে পড়ত। ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রয়োজনীয় ছিল, কারণ বাস্তবতা সম্পর্কিত অন্যান্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার বেলায় প্রয়োজনীয় নিশ্চয়তা ও আস্থা কেবল এখান থেকেই মেলে। বিশ্বজগৎ সম্পর্কে আমাদের বৈজ্ঞানিক উপলব্ধি দেখায় যে, হাজারো নিয়ম-নীতি একে নিয়ন্ত্রণ করছে। স্পিনোর চোখে ঈশ্বর মৌলিক আইন বা নিয়ম মাত্র, অস্তিত্বমান সকল চিরন্তন আইনের সারৎসার। ঈশ্বর একটি বস্তুগত সত্তা, বিশ্বজগতকে নিয়য়ন্ত্রণকারী নিয়মের সমতুল্য ও অনুরূপ। নিউটনের মতো স্পিনোযাও উৎসারণের প্রাচীন দার্শনিক মতবাদের কাছে ফিরে গেছেন! ঈশ্বর যেহেতু সকল বস্তুতে-বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক-মিশে আছেন এবং পরিব্যাপ্ত করে রেখেছেন, সুতরাং এঁকে এসব বস্তুর অস্তিত্ব নির্দেশকারী নিয়ম হিসাবে শনাক্ত করা যেতে পারে । জগতে ঈশ্বরের কর্মধারা আলোচনা করার অর্থ অস্তিত্বের গাণিতিক ও কার্যকারণ সংক্রান্ত নীতিমালার বর্ণনা দান। এটা ছিল দুয়েতার চরম অস্বীকৃতি।
মতবাদটিকে অনুজ্জ্বল মনে হয়, কিন্তু স্পিনোর ঈশ্বর প্রকৃত অতিন্দ্রীয়বাদী বিস্ময়ে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। অস্তিত্বমান সকল বিধি-বিধানের সমন্বয় হিসাবে ঈশ্বর সম্পূর্ণ নিখুঁত, যিনি সবকিছুকে ঐক্য ও ছন্দে সম্পর্কিত করেছেন। মানুষ যখন দেকার্তের নির্দেশিত পথে তাদের মনের কর্মধারা নিয়ে ভাবে, তখন নিজেদের ভেতর ঈশ্বরের চিরন্তন ও অসীম সত্তাকে সক্রিয় হতে উন্মুক্ত করে দেয়। প্লেটোর মতো স্পিনোযা বিশ্বাস করতেন, সহজাত ও স্বতঃস্ফুর্ত জ্ঞান পরিশ্রম সাপেক্ষ সত্য আহরণের চেয়ে ঢের প্রবলভাবে ঈশ্বরের উপস্থিতিকে প্রকাশ করে। জ্ঞানে আমাদের আনন্দ ও সুখ ঈশ্বরের ভালোবাসার সমান, এই উপাস্য চিন্তার কোনও বাহ্যিক বস্তু নন বরং প্রত্যেক মানুষের মনের গভীরে মিশে থাকা চিন্তারই কারণ ও নীতি। প্রত্যাদেশ বা স্বর্গীয় আইনের কোনও প্রয়োজন নেই: এই ঈশ্বর গোটা মানবজাতির জন্যে সহজগম্য আর কেবল তোরাই প্রকৃতির চিরন্তন আইন। স্পিনোযা প্রাচীন মেটাফিজিক্সকে নতুন বিজ্ঞানের সঙ্গে একই কাতারে নিয়ে এসেছিলেন: তাঁর ঈশ্বর নিওপ্লেটোনিস্টদের ঈশ্বরের মতো অতীত নন বরং আকুইনাসের মতো দার্শনিকদের বর্ণিত পরম সত্তার কাছাকাছি। কিন্তু এই ঈশ্বর আবার অর্থডক্স একেশ্বরবাদীদের অনুভূত অতিন্দ্রীয়বাদী ঈশ্বরেরও নিকটবর্তী। ইহুদি, ক্রিশ্চান ও দার্শনিকরা স্পিনোযাকে নাস্তিক ভাবতে চেয়েছে: এই ঈশ্বরের মাঝে ব্যক্তিক কিছু নেই, যিনি বাকি বাস্তবতা হতে অবিচ্ছেদ্য। প্রকৃতপক্ষে স্পিনোযা ঈশ্বর
শব্দটি ব্যবহার কেরছিলেন কেবল ঐতিহাসিক কারণে; তিনি নাস্তিকদেও সাথে একমত প্রকাশ করেছেন, যাদের দাবি ছিল বাস্তবতাকে ‘ঈশ্বর’ আর ‘ঈশ্বর’ নন এভাবে ভাগ করা যায় না। ঈশ্বরকে অন্য কিছু থেকে আলাদা করা না গেলে প্রচলিত অর্থে তিনি আছেন বলা অসম্ভব হয়ে পড়ে। স্পিনোযা আসলে যা বলতে চেয়েছিলেন সেটা হলো, আমরা সাধারণত যে অর্থে ব্যবহার করি সেই। অর্থের সঙ্গে মানানসই কোনও ঈশ্বর নেই। অবশ্য অতিন্দ্রীয়বাদী ও দার্শনিকরা শত শত বছর ধরে একথাই বলে আসছিলেন। কেউ কেউ বলেছে আমাদের জানা জগতের বাইরে আর কিছুই নেই। দুয়ে এন সফের অনুপস্থিতি না। থাকলে স্পিনোর সর্বেশ্বরবাদ কাব্বালাহর সঙ্গে মিলে যেত; আমরা চরম। অতিন্দ্রীয়বাদ ও আসন্ন নতুন নাস্তিক্যবাদের মাঝে সম্পর্ক অনুভব করতে পারতাম।
জার্মান দার্শনিক মোজেস মেলেসন (১৭২৯-৮৬) আধুনিক ইউরোপে ইহুদিদের প্রবেশের পথ খুলে দিয়েছিলেন, যদিও গোড়াতে নির্দিষ্ট ইহুদি-দর্শন গড়ে তোলার ইচ্ছা তার ছিল না। ধর্মের মতো মনস্তত্ত্ব ও নন্দনতত্ত্বে আগ্রহী ছিলেন তিনি। তাঁর প্রথমদিকের রচনা ফিদন ও মর্নিং আওয়ার্স জার্মান আলোকনের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেই রচিত হয়েছিল: এগুলোয় যৌক্তিক ভিত্তিতে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়েছে, ইহুদি দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নটিকে বিবেচনা করেনি । ফ্রান্স ও জার্মানির মতো দেশগুলোয় আলোকনের উদার ধারণাসমূহ মুক্তি আনে ও ইহুদিদের সমাজে যোগ দেওয়ায় সক্ষম করে। এই মাস্কিলিমদের–আলোকপ্রাপ্ত ইহুদিদের এভাবে আখ্যায়িত করা হতো–জার্মান আলোকনের ধর্মীয় দর্শন গ্রহণে অসুবিধা ছিল না। ইহুদি মতবাদে খৃস্টধর্মের মতো একই রকম মতবাদ সংক্রান্ত বিকার কখনওই ছিল না। এর মৌল বিষয়গুলো বস্তুত আলোকনের যৌক্তিক ধর্মের অনুরূপই ছিল: জার্মানিতে যা
তখনও ঘটনার ধারণা ও মানবীয় কর্মকাণ্ডে ঈশ্বরের হস্তক্ষেপ মেনে নিয়েছে। মনিং আওয়ার্স-এ মেন্ডেলসনের দার্শনিক ঈশ্বর বাইবেলের ঈশ্বরের খুবই কাছাকাছি। ইনি মেটাফিজিক্যাল বিমূর্ত কিছু নন, একজন ব্যক্তিক ঈশ্বর। প্রজ্ঞা, মহত্ব, ন্যায়বিচার, প্রেমময় দয়া ও বুদ্ধিমত্তার মতো মানবীয় বৈশিষ্ট্যবালী সর্বোচ্চ মাত্রায় এই পরমসত্তায় প্রয়োগ করা যায়।
কিন্তু এর ফলে মেন্দেলসনের ঈশ্বর একেবারে আমাদের মতো হয়ে যান। তাঁর ধর্মটি টিপিক্যাল আলোকনের বিশ্বাস ছিল; শীতল নিরাবেগ এবং ধর্মীয় অভিজ্ঞতার প্যারাডক্স ও দ্ব্যর্থবোধকতাসমূহ যেন উপেক্ষা করতে চায়। মেলেসন ঈশ্বর বিহীন জীবনকে অর্থহীন মনে করেছেন, কিন্তু তাঁর এই ধর্ম আবেগময় ধর্ম নয়: তিনি যুক্তি দিয়ে আহরণযোগ্য ঈশ্বরের জ্ঞানেই সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট ছিলেন। ঈশ্বরের মহত্বের ওপরই ধর্মতত্ত্ব টিকে থাকে। মানুষকে কেবল প্রত্যাদেশের ওপর নির্ভর করে থাকতে হলে, যুক্তি উত্থাপন করেছেন মেলেসন, সেটা ঈশ্বরের মহত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন হয়ে পড়ত, কারণ অসংখ্য মানুষ দৃশ্যতঃ ঐশী পরিকল্পনা থেকে বাদ পড়ে গিয়েছে। সুতরাং তাঁর দর্শন ফালসাফাহুর দাবিকৃত দুর্বোধ্য বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা যা কেবল মুষ্টিমেয়দের পক্ষে অর্জন-সম্ভব–বাদ দিয়ে প্রত্যেকের আয়ত্তাধীন বোধশক্তির ওপর নির্ভর করেছে। অবশ্য, এই ধরনের পদ্ধতির বিপদ রয়েছে, কারণ তা এমন এক ঈশ্বরকে আমাদের নিজস্ব সংস্কারাদির সঙ্গে এক করে সেগুলোকে পরম করে তোলা খুবই সহজ হয়ে যায়।
