এই অস্বীকৃতির জন্যে চার্চগুলোর নিজেদের ছাড়া আর কাউকে দোষারোপ করার উপায় ছিল না, কেননা শত শত বছর ধরে তারা বিশ্বাসীর ওপর হাজারো মতবাদের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে এসেছে। প্রতিক্রিয়া ছিল অনিবার্য এবং ইতিবাচকও হতে পারে।
অবশ্য আলোকন পর্বের দার্শনিকরা ঈশ্বরের ধারণা প্রত্যাখ্যান করেননি। তারা মানুষকে চিরন্তন আগুনের ভয় দেখিয়ে হুমকি দানকারী অর্থডক্সদের নিষ্ঠুর ঈশ্বরকে অস্বীকার করেছিলেন। যুক্তির কাছে পরাজিত ঈশ্বর সংক্রান্ত রহস্যময় মতবাদসমূহ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কিন্তু পরম সত্তায় তাঁদের বিশ্বাস অটুট রয়ে গিয়েছিল। ফারনিতে একটা শ্যাপেল নির্মাণ করেছিলেন ভলতেয়ার যার লিন্টেলে খোদাই করা ছিল ‘দেও এরেক্সিত ভলতেয়ার’ এবং তিনি এ পর্যন্ত বলেছিলেন যে, ঈশ্বরের অস্তিত্ব না থাকলে তাঁকে সৃষ্টি করার প্রয়োজন হয়ে দাঁড়াত। ফিলসফিক্যাল ডিকশনারিতে তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন, অসংখ্য উপাস্যে বিশ্বাস করার চেয়ে একজন ঈশ্বরে বিশ্বাস করা মানুষের পক্ষে বেশি যৌক্তিক ও স্বাভাবিক ছিল। আদিতে বিচ্ছিন্ন গ্রাম আর সমাজে জীবনযাপনকারী মানুষ মেনে নিয়েছিল যে একজন দেবতা তাদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করেন: বহুঈশ্বরবাদীতা পরবর্তীকালের সংযোজন। বিজ্ঞান ও যুক্তিভিত্তিক দর্শন উভয়ই পরম সত্তার অস্তিত্বের কথা বলে: ‘এসব থেকে কী সিদ্ধান্তে আসতে পারি আমরা?’ ডিকশনারির নাস্তিকবাদ’-রচনার শেষে প্রশ্ন রেখেছেন ভলতেয়ার। তিনি নিজেই জবাব দিচ্ছেন:
নাস্তিক্যবাদ যারা শাসন করে তাদের অন্তরের এমনকি শিক্ষিত মানুষের মাঝেও এক অশুভ দানবীয় শক্তি, যদি তাদের জীবন নিষ্পাপও হয়ে থাকে, কেননা তারা তাদের গবেষণা থেকে দায়িত্ববান ব্যক্তিদের ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারেন; এবং এটা ঘৃণিত ধর্মান্ধতা না হলে গুণাবলীর ক্ষেত্রে এক মারাত্মক আঘাত। সর্বোপরি, আমাকে একথা যোগ করার সুযোগ দিন যে, বর্তমানে নাস্তিকের সংখ্যা সর্বকালের নিম্নতম, কেননা দার্শনিকরা জানতে পেরেছেন যে, জীবাণু ছাড়া কোনও বর্ধিষ্ণু সত্তা থাকতে পারে না, পরিকল্পনা ছাড়া কোনও জীবাণু থাকতে পারে না, ইত্যাদি।
ভলতেয়ার নাস্তিক্যবাদকে কুসংস্কার ও ধর্মান্ধতার সঙ্গে এক কাতারে স্থান দিয়েছেন, দার্শনিকগণ যা দূর করতে উদগ্রীব ছিলেন। ঈশ্বর নন, তাঁর কাছে সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছিল যুক্তির পবিত্র মানকে আক্রমণকারী ঈশ্বর সম্পর্কিত মতবাদসমূহ ।
ইউরোপের ইহুদিরাও নতুন ধারণায় প্রভাবিত হয়েছিল। স্প্যানিশ বংশোদ্ভুত ডাচ ইহুদি বারুচ স্পিনোযা (১৬৩২-৭৭) তোরাহ পাঠ করতে গিয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে জেইন্টাইল মুক্তচিন্তাবিদদের এক চক্রে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি এমন সব ধারণার জন্ম দিয়েছিলেন যেগুলো প্রচলিত ইহুদিমতবাদ হতে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল এবং যেগুলো দেকার্তের মতো বৈজ্ঞানিক চিন্তাবিদ ও ক্রিশ্চান স্কলাস্টিকদের দ্বারা প্রভাবিত ছিল। ১৬৫৬ সালে চব্বিশ বছর বয়সে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমস্টারডামের সিনাগগ থেকে বহিস্কার করা হয়। বহিষ্কারাদেশ পাঠ করার সময় সিনাগগের বাতিগুলো ক্ষীণ হতে হতে এক সময় গোটা সমাবেশকে অন্ধকারে ডুবিয়ে দেয়। এভাবে এক ঈশ্বরহীন পৃথিবীতে স্পিনোযার আত্মার অন্ধকারাচ্ছন্নতা প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করেছে তারা:
দিন ও রাতের অভিশাপ পড়ক তার ওপর; অভিশপ্ত হোক সে নিদ্রা ও জাগরণে, ঘরে ও বাইরে। ঈশ্বর যেন আর কখনও তাকে ক্ষমা না করেন বা কাছে টেনে না নেন। এখন থেকে যেন ঈশ্বরের কোপানলে দগ্ধ হতে হয় তাকে; ঐশীগ্রন্থে লিখিত সকল অভিশাপ পতিত হোক তার ওপর, জগৎ থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাক তার নাম।
এরপর স্পিনোযা আর ইউরোপের কোনও ধর্মীয় গোষ্ঠীরই সদস্য থাকলেন। না। সুতরাং তিনি ছিলেন স্বাধীন, সেকুলার দৃষ্টিভঙ্গির আদিরূপ, যা ইউরোপের সাধারণ ধারায় পরিণত হবে। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে অনেকেই আধুনিকতার নায়ক হিসাবে স্পিনোকে তার প্রতীকী নির্বাসন, বিচ্ছিন্নতা ও সেকুলার যুক্তির সন্ধানের সঙ্গে একাত্ম বোধ করে সম্মান করত।
স্পিনোযাকে নাস্তিক হিসাবে দেখা হয়েছে, কিন্তু একজন ঈশ্বরে বিশ্বাস করতেন তিনি, যদিও সে ঈশ্বর বাইবেলের ঈশ্বর নন। ফায়সুফদের মতো প্রত্যাদেশের ধর্মকে তিনি দার্শনিকদের আহরিত ঈশ্বর সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের চেয়ে নিম্ন পর্যায়ের মনে করেছেন। ধর্মীয় বিশ্বাসের ধরণকে ভুল বোঝা হয়েছে, আ থিওলজিকো-পলিটিক্যাল ট্রিটিজ-এ যুক্তি দিয়েছেন তিনি। এটা একেবারে বিশ্বাস আর কুসংস্কারের একটা মিশেলে পরিণত হয়েছে, কতগুলো অর্থহীন রহস্যের গুচ্ছ।২৪ বাইবেলিয় ইতিহাসের দিকে তীর্যক চোখে তাকিয়েছেন তিনি। ইসরায়েলিরা তাদের বোধের অতীত যে কোনও কিছুকে ‘ঈশ্বর’ ডেকে বসত। যেমন, অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ও পবিত্রতা সম্পন্ন মানুষ হওয়ায় পয়গম্বর ঈশ্বরের আত্মা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন বলা হতো। কিন্তু এ ধরনের অনুপ্রেরণা বিশেষ কোনও গোষ্ঠীর ভেতর সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং স্বাভাবিক যুক্তি দিয়ে প্রত্যেকের নাগালে ছিল: বিশ্বাসের আচার ও প্রতীকসমূহ। বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক চিন্তায় অক্ষম সাধারণ মানুষকেই কেবল সাহায্য করতে পারে।
