তবে পৃথিবীর ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে ঈশ্বরের পূর্ব-ধারণা নিয়ে মিল্টনের ভূমিকা তাঁর স্রষ্টাকে অবিশ্বাস্য করে তুলেছে। যেহেতু প্রয়োজনের খাতিরেই ঈশ্বর আগে থেকে আদম ও ইভের পতন হবে বলে জানতেন-এমনকি স্যাটান পৃথিবীতে পৌঁছার আগেই তিনি নিশ্চয়ই সেই ঘটনার আগে নিজের কাজের ন্যায্যতা যাচাইয়ে মন দিয়েছেন। চাপিয়ে দেওয়া আনুগত্যে আনন্দ পাবেন না তিনি, পুত্রের কাছে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তিনি আদম ও ইভকে স্যাটানের মোকাবিলা করার ক্ষমতা দিয়েছিলেন। সুতরাং, তারা, আত্মরক্ষামূলক যুক্তি দেখিয়েছেন ঈশ্বর, ন্যায্যত অভিযুক্ত করতে পারবে না :
তাদের স্রষ্টাকে বা তাদের সৃষ্টিকে বা তাদের নিয়তিকে
যেন পূর্ব নির্ধারিত নিয়তি
তাদের ইচ্ছাকে বাতিল করে দিয়েছে,
চূড়ান্ত আদেশ বা উচ্চ পূর্ব-জ্ঞানে পরিত্যক্ত হয়েছে; তারা নিজেরাই
নিজেদের বিদ্রোহের ঘোষণা দিয়েছে; আমি নই:
যদি আমি আগে জানতাম,
তাদের অপরাধ বা ভুলের ওপর পূর্বজ্ঞানের কোনও প্রভাব ছিল না;
যা নির্দিষ্ট কিছু পূর্বে অজানাকে প্রমাণ করেছে…
আমি তাদের স্বাধীনভাবে সৃষ্টি করেছি,
অবশ্যই ওদের মুক্তই থাকতে হবে,
যতক্ষণ না নিজেরাই নিজেদের বন্দি করছে; না হয় আমাকে অবশ্যই
তাদের স্বভাব পাল্টে দিতে হবে ও অপরিবর্তনীয় চিরন্তন, পরম নির্দেশকে
নাকচ করতে হতো
যা তাদের স্বাধীন ইচ্ছাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে;
তারা নিজেরাই নিজেদের পতন ডেকে এনেছে।
এই নিরস ভাবনাকে সম্মান দেখানো শুধু কঠিনই নয়, বরং ঈশ্বর আবির্ভূত হচ্ছেন একজন ঠাণ্ডা, আত্ম-নিরপেক্ষ ও সমবেদনাবিহীন সত্তা হিসাবে অথচ তাঁর ধর্মের সমবেদনাই জাগিয়ে তোলার কথা। ঈশ্বরকে আমাদের কারও মতো করে ভাবতে ও কথা বলতে বাধ্য করার মাঝে ঐশী সত্তাকে মানবরূপ ও ব্যক্তিক ধারণায় উপস্থাপনের ঘটনাও তুলে ধরে। এমন একজন ঈশ্বরের মাঝে এত বেশি স্ববিরোধিতা রয়েছে তিনি সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকেন না, তাই তাঁর শ্রদ্ধা পাবারও যোগ্যতা থাকে না।
ঈশ্বরের সর্বজ্ঞতার মতো মতবাদসমূহের আক্ষরিক উপলব্ধি কোনও কাজে আসবে না। মিল্টনের ঈশ্বর কেবল শীতল আর আইননিষ্ঠই নন, তিনি ব্যাপকভাবে অনুপযুক্ত। প্যারাডাইস লস্টের শেষ দুই পর্বে ঈশ্বর আর্চঅ্যাঞ্জেল মাইকেলকে প্রেরণ করেন আদমকে তাঁর বংশধরদের মুক্তি লাভের ব্যাপারটি দেখিয়ে তাকে পাপের সান্ত্বনা দিতে। কতগুলো দৃশ্যের মাধ্যমে আদমের সামনে মুক্তির গোটা ইতিহাস উন্মোচিত হয়, যার ধারা বিবরণী দেন মাইকেল; তিনি কেইনের হাতে আবেলের মৃত্যু দেখেন, প্লাবন ও নোয়াহর কিস্তি, টাওয়ার অভ বাবেল, আব্রাহামের আহবান, মিশর হতে এক্সোডাস ও সিনাই পর্বতে আইনের অবতরণ দেখতে পান। তোরাহ্র অসম্পূর্ণতা, যা শত শত বছর ধরে ঈশ্বরের মনোনীত হতভাগ্য জাতিকে নিপীড়ন করেছে, মিকাইল ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, আরও আধ্যাত্মিক আইনের আকাঙ্ক্ষা করানোর একটা কৌশল । পৃথিবীর ভবিষ্যৎ মুক্তি লাভের এই বিবরণ অগ্রসর হওয়ার সময় রাজা ডেভিডের বীরত্বপূর্ণ ঘটনাবলী, বাবিলনে এক্সোডাস, খৃস্টের জন্ম লাভ, ইত্যাদির মাধ্যমে-পাঠকের মনে হয় মানুষকে উদ্ধার করার নির্ঘাৎ আরও সহজ ও অধিকতর প্রত্যক্ষ উপায় ছিল। এই ক্রমাগত ব্যর্থতা ও ভ্রান্তিময় সূচনা সম্বলিত অত্যাচারী পরিকল্পনাটি আগাম নির্ধারিত-এই সত্যটি এর প্রণেতার বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে গভীর সন্দেহ সৃষ্টি করে। মিল্টনের ঈশ্বর সামান্য আস্থাই সঞ্চার করেন। এটা নিশ্চয়ই তাৎপর্যপূর্ণ যে প্যারাডাইস লস্টের পর আর কোনও প্রধান ইংরেজ সৃজনশীল লেখক অতিপ্রাকৃত জগত বর্ণনার প্রয়াস পাননি। এরপর আর কোনও স্পেন্সারস বা মিল্টনের দেখা মেলেনি। এরপর অতিপ্রাকৃত ও আধ্যাত্মিক বিষয় জর্জ ম্যাকডোনাল্ড এবং সি, এস, লুইসের মতো অধিকতর প্রান্তিক লেখকদের জগতে পরিণত হয়। তারপরেও কল্পনার কাছে আবেদন সৃষ্টিতে অক্ষম ঈশ্বর বিপদাপন্ন হয়ে পড়েন।
প্যারাডাইস লস্টের একেবারে শেষে আদম ও ইভ নিঃসঙ্গভাবে স্বর্গোদ্যান ছেড়ে পৃথিবীতে নেমে আসেন। পশ্চিমের ক্রিশ্চানরা অধিকতর সেকুলার যুগের দোড়গোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল, যদিও তখনও ঈশ্বর বিশ্বাস আঁকড়ে রেখেছিল তারা। যুক্তির নতুন ধর্ম ডেইজম (Deism) নামে পরিচিত হবে। অতিন্দ্রীয়বাদ ও মিথের কল্পনা-নির্ভর অনুশীলনের কোনও অবকাশ এর ছিল না। প্রত্যাদেশের মিথ ও ট্রিনিটির মতো প্রচলিত ‘রহস্যসমূহে’র দিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল এই ধর্ম, যা কিনা বহুদিন মানুষকে কুসংস্কারের শৃঙ্খলে বন্দি করে রেখেছিল। তার বদলে এটা নৈর্ব্যক্তিক ‘ডিউসের প্রতি আনুগত্যের ঘোষণা দেয়, যাকে নিজের প্রয়াস দিয়েই আবিষ্কার করতে পারে মানুষ। ফ্রাঁসোয়া মেরি দে ভলতেয়ার ছিলেন পরবর্তীকালে আলোকন হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠা এই আন্দোলনের প্রতিমূর্তি; তাঁর ফিলসফিক্যাল ডিকশনারি (১৭৬৪) তে এই আদর্শ ধর্মের সংজ্ঞা দিয়েছেন তিনি। এটা সর্বোপরি যথাসম্ভব সহজ হবে।
যা বেশি নৈতিকতা শিক্ষা দেয় এবং সেটাই কি হওয়া উচিত নয়? যেটা মানুষকে অবাস্তব পরিণত না করেই গড়ে তুলতে চায়? যেটা কাউকে অসম্ভব, স্ববিরোধী ও অলৌকিকের প্রতি অবিবেচক এমন কিছুতে বিশ্বাস করার নির্দেশ দেয় না, যা জাতির জন্যে ক্ষতিকর ও যা সাধারণ জ্ঞান থাকার অপরাধে কাউকে চিরকালীন শাস্তি ও ভয় দেখাতে যায় না? সেটাই হওয়া উচিত নয় যেটি ঘাতকদের দ্বারা বিশ্বাস রক্ষা করে না এবং পৃথিবীকে বুদ্ধিহীন জ্ঞানের জন্যে রক্তের বন্যায় ভাসিয়ে দেয় না?… যা কেবল একজন ঈশ্বরের উপাসনার ন্যায় বিচার, সহিষ্ণুতা ও মানবতার শিক্ষা দেয়?
