এসব চরম ধারণা গোটা মহাদেশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলে একদল নতুন ইতিহাসবিদ বস্তুনিষ্ঠভাবে চার্চের ইতিহাস পর্যালোচনা শুরু করেছিলেন। এভাবে ১৬৯৯ সালে গটফ্রাইড আরনল্ড তার নিরপেক্ষ হিস্ট্রি অভ দ্য চার্চেস ফ্রম দ্য বিগিনিং অভ দ্য নিউ টেস্টামেন্ট টু সিক্সটিন এইটি এইট প্রকাশ করেছিলেন। এখানে তিনি যুক্তি দেখান যে, বর্তমানে যাকে অর্থডক্স বিবেচনা করা হচ্ছে আদিম চার্চে তার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। ইয়োহান লরেন ফন মোশিম (১৬৯৪-১৭৫৫) তাঁর কর্তৃত্বপূর্ণ রচনা ইন্সটিটিউশনস অভ এক্লিসিয়েস্টিক্যাল হিস্ট্রি (১৭২৬)-তে পরিকল্পিতভাবে ইতিহাসকে ধর্মতত্ত্ব হতে আলাদা করে নেন এবং সত্যতা প্রতিপাদন ছাড়াই মতবাদের বিকাশ তুলে ধরেন। জর্জ ওয়ালশ জিওভান্নি বাট ও হেনরি নরিসের মতো ইতিহাসবিদগণ আরিয়ানিজম, ফিলিওক বিরোধ এবং চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীর বিভিন্ন খৃষ্টতত্ত্বীয় বিতর্ক ও জটিল মতবাদগত বিতর্কের ইতিহাস পর্যালোচনা করেন। ঈশ্বর ও ক্রাইস্টের প্রকৃতি সংক্রান্ত মৌলিক ডগমাসমূহ শত শত বছর সময় পরিক্রমায় সৃষ্টি হয়েছে, নিউ টেস্টামেন্টের এগুলো অস্তিত্ব নেই জানতে পেরে বহু বিশ্বাসী অস্বস্তিতে পড়ে গিয়েছিল; তর মানে কি এগুলো ভুয়া ছিল? অন্যরা আরও অগ্রসর হয়ে খোদ নিউ টেস্টামেন্টের ক্ষেত্রেই নতুন বস্তুনিষ্ঠতা প্রয়োগ করেছে। হারমান স্যামুয়েল রিমারাস (১৬৯৪-১৭৬৮) স্বয়ং জেসাসের একটি সমালোচনামূলক জীবনী রচনারই প্রয়াস পেয়েছিলেন: ক্রাইস্টের মানব রূপের প্রশ্নটি আর অতিন্দ্রীয়বাদী বা মতবাদগত বিষয় ছিল না বরং যুক্তির কালে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। এ ঘটনা ঘটার পর সত্যিকার অর্থে সংশয়বাদের আধুনিক কাল সুচিত হলো। রিমারাস যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে, জেসাস কেবল একটি ঈশ্বরের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন; কিন্তু তাঁর মেসিয়ানিক মিশন ব্যর্থ হলে তিনি হতাশায় মৃত্যুবরণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, গস্পেলে জেসাস কখনও মানব জাতির পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে আসার কথা বলেননি যা পাশ্চাত্য খৃস্টধর্মের মূল বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এই ধারণা কেবল খৃস্টধর্মের আসল প্রতিষ্ঠাতা সেইন্ট পল পর্যন্ত চিহ্নিত করা যায়। সুতরাং, জেসাসকে ঈশ্বর হিসাবে মানা উচিত হবে না আমাদের, বরং তাকে একজন ‘উল্লেখযোগ্য, সাধারণ, মহান ও ব্যবহারিক ধর্মের শিক্ষকের মর্যাদা দেওয়া যেতে পারে।
এসব বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা ঐশীগ্রন্থের আক্ষরিক অর্থ উপলব্ধির ওপর নির্ভরশীল ছিল এবং এখানে ধর্ম বিশ্বাসের প্রতীকী বা উপমাগত প্রকৃতি অগ্রাহ্য করা হয়েছে। এ ধরনের সমালোচনা শিল্পকলা বা কাব্যের সমালোচনার মতোই অপ্রাসঙ্গিক বলে আপত্তি জানাতে পারেন কেউ। কিন্তু বহু লোকের কাছে বৈজ্ঞানিক চেতনা মানদণ্ডে পরিণত হওয়ার পর অন্য কোনওভাবে গস্পেল পাঠ তাদের জন্যে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। পশ্চিমের ক্রিশ্চানরা তাদের ধর্মবিশ্বাসের আক্ষরিক উপলব্ধির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে মিথ থেকে অপরিবর্তনীয়ভাবে পিছু হটে আসে: কোনও গল্প বাস্তবিকই সত্য হবে নইলে সেটি বিভ্রান্তি। ধর্মের মূল সম্পর্কিত প্রশ্ন, বলা যায়, বুদ্ধদের চেয়ে ক্রিশ্চানদের কাছে অনেক বেশি গুরুত্ববহ ছিল, কারণ তাদের একেশ্বরবাদী ট্র্যাডিশন সবসময় দাবি করে এসেছে যে, ঈশ্বর ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহে প্রকাশিত হয়েছেন। সুতরাং, বৈজ্ঞানিক যুগে ক্রিশ্চানদের সংহতি বজায় রাখতে হলে এসব প্রশ্নের মোকাবিলার প্রয়োজন ছিল। টিন্ডাল বা মারসের তুলনায় প্রচলিত বিশ্বাস লালনকারী কোনও কোনও ক্রিশ্চান ঈশ্বর সম্পর্কে পশ্চিমের প্রচলিত উপলব্ধিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে শুরু করে। লুথারান জন ফ্রাইডম্যান মেয়ার তাঁর উইটেনবার্গস ইনোসেন্স অভ আ ডাবল মার্ডার (১৬৮১)-এ লেখেন যে, আনসেল্ম বর্ণিত প্রায়শ্চিত্তের প্রচলিত মতাবাদ যেখানে ঈশ্বরকে আপন পুত্রের মৃত্যু কামনাকারী হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে সেটি ঐশী সত্তা সম্পর্কে অসম্পূর্ণ ধারণা তুলে ধরে। তিনি ন্যায়পরায়ণ ঈশ্বর’, ‘ক্ষুব্ধ ঈশ্বর’ ও ‘তিক্ত ঈশ্বর’ যার কঠিন ক্ষতি পূরণের দাবি বহু ক্রিশ্চানকে আতঙ্কে ভরিয়ে তুলেছে এবং তাদের নিজস্ব ‘পাপপূর্ণতা’ হতে সরে আসার শিক্ষা দিয়েছে। ক্রিশ্চান ইতিহাসের এসব নিষ্ঠুরতা দেখে ক্রিশ্চানরা অধিক হারে বিব্রত বোধ করেছে যে ন্যায়পরায়ণ ঈশ্বরের নামে ইতিহাসের ভীতিকর ক্রুসেড, ইনকুইজিশন ও অত্যাচার চালানো হয়েছে। অর্থডক্স মতবাদে বিশ্বাস করার জন্যে মানুষের ওপর অত্যাচার চালানোর ব্যাপারটি বিশেষ করে উদারতা ও বিবেকের স্বাধীনতার প্রতি অনুরক্ত একটা সময়ে আতঙ্কজনক মনে হয়েছে। সংস্কারের কারণে সূচিত রক্তপাত ও এর পরবর্তী পরিস্থিতি যেন ছিল শেষ অবলম্বন।
যুক্তিকেই একমাত্র উত্তর মনে হয়েছে। তারপরেও রহস্যময়তাহীন একজন ঈশ্বর যে রহস্য তাকে শত শত বছর অন্যান্য ধর্মের কার্যকর ধর্মীয় মূল্যে পরিণত করে করেছে, অধিকতর কল্পনাশক্তির ও সহজাত প্রকৃতির অধিকারী ক্রিশ্চানদের কাছে আবেদন রাখতে পারবেন? পিউরিটান কবি জন মিল্টন (১৬০৮-৭৪) চার্চের অসহিষ্ণুতার রেকর্ড জেনে বিশেষভাবে বিব্রত বোধ করেছিলেন। আপন সময়ের প্রকৃত মানুষ মিল্টন তাঁর অপ্রকাশিত প্রবন্ধ অন ক্রিশ্চান ডকট্রিন-এ সংস্কারকে সংস্কার করার প্রয়াস পেয়েছিলেন ও নিজের জন্যে এমন একটি ধর্মীয় বিশ্বাস আবিষ্কার করতে চেয়েছিলেন যা অন্যদের বিশ্বাস ও বিবেচনার উপর নির্ভরশীল নয়। ট্রিনিটির মতো প্রচলিত মতবাদসমূহ সম্পর্কেও সন্দিহান ছিলেন তিনি। তা সত্ত্বেও এটা তাৎপর্যপূর্ণ যে তাঁর মাস্টারপিস প্যারাডাইস লস্ট-এর প্রকৃত নায়ক স্বয়ং স্যাটান, ঈশ্বর নন, মানুষের কাছে যার কাজ ন্যায্য প্রতিপন্ন করতে চেয়েছেন তিনি। ইউরোপের নতুন মানুষের বহু গুণাগুণ রয়েছে স্যাটানের: সে কর্তৃত্ব অগ্রাহ্য করে, অজানার বিরুদ্ধে নিজেকে স্থাপন করে ও নরক হতে নতুন সৃষ্ট পৃথিবীর ভেতর দিয়ে যাত্রার সময় প্রথম অভিযাত্রীতে পরিণত হয়। অবশ্য মিল্টনের ঈশ্বর যেন পশ্চিমের অক্ষরবাদিতার সহজাত অবাস্তবতা প্রকাশ করেন। ট্রিনিটির অতিন্দ্রীয়বাদী উপলব্ধি ছাড়া পুত্রের অবস্থান এই কবিতায় একেবারে দ্ব্যর্থবোধক রয়ে যায়। এটা মোটেই পরিষ্কার নয় যে, তিনি দ্বিতীয় স্বর্গীয় সত্তা নাকি দেবদূতদের মতো সৃষ্টি, যদিও কিছুটা উচ্চ মর্যাদার। যে কোনও অবস্থায় তিনি ও পিতা দুটো সম্পূর্ণ আলাদা সত্তা যাদের পরস্পরের উদ্দেশ্য জানতে ক্লান্তিকর দীর্ঘ কথোপথনে লিপ্ত হতেই হবে, যদিও পুত্র পিতার স্বীকৃত বাণী ও প্রজ্ঞা।
