নিউটন বাইবেলের উল্লেখ করেননিঃ আমরা কেবল জগৎ সম্পর্কে ধ্যানের মাধ্যমেই ঈশ্বরকে জানতে পারি। এতদিন পর্যন্ত সৃষ্টি সংক্রান্ত মতবাদ এক আধ্যাত্মিক সত্য প্রকাশ করে এসেছিল: ইহুদিবাদ ও খৃস্টধর্ম উভয়েই দেরিতে সংযুক্ত হয়েছে এটা এবং বরাবরই কিছুটা সমস্যাসঙ্কুল ছিল। নতুন বিজ্ঞান এবার সৃষ্টিকে মঞ্চের কেন্দ্রে নিয়ে এল এবং ঈশ্বর সংক্রান্ত ধারণার ক্ষেত্রে মতবাদের আক্ষরিক ও যান্ত্রিক উপলব্ধিকে মূল বিষয়ে পরিণত করল । আজকের দিনে মানুষ ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকার করার সময় প্রায়শঃই নিউটনের বিশ্ব জগতের স্রষ্টা এবং প্রতিপালক ঈশ্বরকেই প্রত্যাখ্যান করে থাকে। বিজ্ঞানীরা এই ঈশ্বরকে আর মেনে নিতে পারছেন না।
নিজের ব্যবস্থায় ঈশ্বরকে স্থান দেওয়ার জন্যে স্বয়ং নিউটন কিছু বিস্ময়কর সমাধানের আশ্রয় নিয়েছিলেন, তার ব্যবস্থাটি প্রকৃতির কারণেই স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার প্রয়োজন ছিল। মহাশূন্য অপরিবর্তনীয় ও অসীম হলে-তার ব্যবস্থার দুটো প্রধান বৈশিষ্ট্য-সেখানে ঈশ্বরের স্থান কোথায়? মহাশূন্যই এক অর্থে স্বর্গীয় নয়, যেহেতু এর অনন্ত ও অসীমতার গুণ আছে? এটা কী তবে দ্বিতীয় স্বর্গীয় সত্তা, সময়ের সূচনা কাল হতেই যা ঈশ্বরের সঙ্গে বিরাজমান ছিল? এই সমস্যা সম্পর্কে আগাগোড়া সচেতন ছিলেন নিউটন। প্রথমদিকের রচনা দে গ্রাভিতেশনে এত্ অ্যাকিউপন্দিও ফ্লুইদোরাম-এ তিনি উৎসারণের প্লেটোনিক তত্ত্বে ফিরে গিয়েছিলেন। ঈশ্বর যেহেতু অসীম, নিশ্চয়ই তিনি সর্বত্র বিরাজমান। মহাশূন্য ঈশ্বরের অস্তিত্বের ফল, ঐশী সর্বব্যাপীতা হতে চিরন্তনভাবে উৎসারিত হচ্ছে। তাঁর ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ হিসাবে এর সৃষ্টি হয়নি, বরং তাঁর সর্বব্যাপী সত্তার অনিবার্য পরিণতি বা বিস্তার হিসাবে এটা অস্তিত্বমান ছিল। একইভাবে, স্বয়ং ঈশ্বর সময় ও স্থান গঠন করেছেন যার মাঝে আমরা বাঁচি, চলাফেরা করি, অস্তিত্ব লাভ করি। অন্যদিকে সৃষ্টির প্রথম দিনে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে ঈশ্বর কর্তৃক বস্তুর সৃষ্টি। কেউ চাইলে, একথা বলতে পারে যে, তিনি মহাশূন্যের কোনও কোনও স্থানকে আকার, ঘনত্ব, স্পর্শবোধ ও সহিষ্ণুতা দিয়ে গুণান্বিত করেছেন। শূন্য হতে সৃষ্টির খৃস্টীয় মতবাদের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব, কেননা ঈশ্বর মহাশূন্য হতে বস্তগত বিষয়সমূহকে অস্তিত্ব দিয়েছেন: শূন্য হতেই বস্তু উৎপাদন করেছেন তিনি।
দেকার্তের মতো নিউটনেরও রহস্যময়তার প্রতি দুর্বলতা ছিল না, একে তিনি অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের সমতুল্য বলেছেন। খৃস্টধর্মকে অলৌকিকতা থেকে মুক্ত করতে উদগ্রীব ছিলেন তিনি, তাতে খৃস্টীয় ঐশ্বরিকতার মতো গুরুত্বপূর্ণ মতবাদসমূহের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি হলেও। ১৬৭০ দশকে তিনি গুরুত্বের সঙ্গে ট্রিনিটির মতবাদ নিয়ে ধর্মতত্ত্বীয় গবেষণা শুরু করেছিলেন। তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, আথানাসিয়াস প্যাগান ধর্মান্তরিতদের আকৃষ্ট করার জন্যে এটাকে চার্চের ওপর আরোপ করেছিলেন। আরিয়াসই সঠিক ছিলেন: জেসাস ক্রাইস্ট অবশ্যই ঈশ্বর ছিলেন না; ওল্ড টেস্টামেন্টের সেসব অনুচ্ছেদ ট্রিনিট্রির মতবাদ ও অবতারের ধারণা প্রমাণের জন্যে ব্যবহৃত হয়েছিল সেগুলো সঠিক নয়। আথানাসিয়াস ও তাঁর সহকর্মীরা এগুলো বানিয়ে ঐশীগ্রন্থে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন এবং এভাবে সাধারণ মানুষের। মূল, আদিম কল্পনায় আবেদন সৃষ্টি করেছিলেন: মানুষের মনের উত্তপ্ত ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন অংশটি ধর্মীয় ব্যাপারে রহস্যময়তার প্রতি চিরদিনই দুর্বল; এ কারণে তারা যা সবচেয়ে কম বোঝে সেটাই বেশি পছন্দ করে। খৃস্টধর্ম থেকে এই বিভ্রান্তি দূর করা নিউটনের এক বিকারে পরিণত হয়েছিল। ১৬৮০ দশকের গোড়ার দিকে প্রিন্সিপিয়া প্রকাশের অল্পদিন আগে একটা প্রবন্ধের কাজ শুরু করেছিলেন নিউটন, তিনি যেটার নাম দিয়েছিলেন, দ্য ফিলোসফিক্যাল অরিজিন্স অভ জেন্টাইল থিওলজি। এখানে তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন, নোয়াহ আদিম ধর্ম-এক জেন্টাইল ধর্মতত্ত্ব-প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যা কুসংস্কারমুক্ত ছিল এবং এক একক ঈশ্বরের যৌক্তিক প্রার্থনার পক্ষে কথা বলেছেন। একমাত্র নির্দেশনা ছিল ঈশ্বরের ভালোবাসা ও প্রতিবেশীর প্রতি ভালোবাসা। মানুষের প্রতি ঈশ্বরের একমাত্র মন্দির প্রকৃতি নিয়ে ভাবার নির্দেশ ছিল। পরবর্তী প্রজন্মগুলো এই অবিমিশ্র ধর্মটিকে অলৌকিক আজগুবি গল্প দিয়ে দুষিত করেছে। কেউ কেউ আবার বহুঈশ্বরবাদীতা ও কুসংস্কারের দিকে প্রত্যাবর্তন করেছে। তা সত্ত্বেও ঈশ্বর বারবার মানুষকে আবার সঠিক পথে পরিচালনা করার জন্য পয়গম্বরদের প্রেরণ করেছেন। পিথাগোরাস এই ধর্ম সম্পর্কে জানতে পেরে তা পশ্চিমে নিয়ে আসেন। মানুষকে সত্য পথে ফিরিয়ে আনার জন্যে প্রেরিত পয়গম্বরদের একজন ছিলেন জেসাস, কিন্তু তাঁর খাঁটি ধর্ম আথানাসিয়াস ও তাঁর সহচররা দূষিত করেছেন। বুক অভ রিভেলেশনে ত্রিত্ববাদের উত্থানের ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে-’তোমাদের পশ্চিমের অদ্ভুত এই ধর্ম,’ ‘তিনজন সমান ঈশ্বরের কাল্ট’-ধ্বংসের বিভীষিকা হিসাবে।[১৫]
পশ্চিমে ক্রিশ্চানরা ট্রিনিটির মতবাদ বরাবরই জটিল বলে আবিষ্কার করেছে। তাদের নতুন যুক্তিবাদ আলোকন পর্বের দার্শনিক ও বিজ্ঞানীদের এটা পরিত্যাগে উদগ্রীব করে তোলে। ধর্মীয় জীবনে রহস্যময়তার ভূমিকা নিউটনের বোধের অতীত ছিল। গ্রিকরা ট্রিনিটিকে মনকে বিস্ময়াভিভূত করে রাখতে এবং মানুষের বুদ্ধি দিয়ে ঈশ্বরের প্রকৃতি উপলব্ধি করা কখনও সম্ভব নয়, একথা মনে করিয়ে দিতে ব্যবহার করেছিল। নিউটনের মতো বৈজ্ঞানিকের পক্ষে অবশ্য এই ধরনের মনোভাব পোষণ করা খুবই কঠিন ছিল। বিজ্ঞানের সুবাদে মানুষ শিখছিল যে, সত্য জানার জন্যে তাদেরকে একেবারে গোড়া থেকে শুরু করার জন্যে অতীতকে বাতিল করতে তৈরি থাকতে হবে। অবশ্য শিল্পকলার মতো ধর্মের ক্ষেত্রেও বর্তমানকে দেখার একটা দৃষ্টিকোণ পাওয়ার জন্যে অতীতের সঙ্গে সংলাপ সংশ্লিষ্ট । ঐতিহ্য বা প্রথা নারী-পুরুষকে একটা সূচনা বিন্দু হতে অগ্রসর হতে সক্ষম করে তোলে যার ফলে সে জীবনের চূড়ান্ত অর্থ সম্পর্কে চিরন্তন। জিজ্ঞাসা নিয়ে ভাবতে পারে। সুতরাং, ধর্ম ও শিল্পকলা বিজ্ঞানের মতো কাজ করে না। অবশ্য, অষ্টাদশ শতাব্দীতে ক্রিশ্চানরা খৃস্টধর্ম বিশ্বাসের ক্ষেত্রে নতুন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগ শুরু করে নিউটনের মতো একই সমাধানে পৌঁছে। ইংল্যান্ডের ম্যাথু টিল্ডাল ও জন টোল্যান্ডের মতো চরমপন্থী ধর্মতাত্ত্বিকগণ ফের। মূলে ফিরে যাবার জন্য ব্যাকুল ছিলেন, খৃস্টধর্মকে রহস্যমুক্ত করে সত্য ধর্ম প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন তাঁরা। ক্রিশ্চানিটি নট মিস্ট্রিয়াস (১৬৯৬)-এ টোল্যান্ড যুক্তি দেখিয়েছেন যে, রহস্য কেবল ‘স্বেচ্ছাচারিতা ও কুসংস্কারের দিকে চালিত করে। ঈশ্বর নিজেকে স্পষ্টভাবে প্রকাশে অক্ষম চিন্তা করা হবে আক্রমণাত্মক। ধর্মকে অবশ্যই যৌক্তিক হতে হবে। ক্রিশ্চানিটি অ্যাজ ওল্ড অ্যাজ ক্রিয়েশন (১৭৩০)-এ নিউটনের মতো আদি ধর্ম সৃষ্টি ও পরবর্তীকালের সংযোজনসমূহ বাদ দেওয়ার প্রয়াস পেয়েছিলেন টিল্ডাল। যৌক্তিকতাই ছিল। সকল সত্য ধর্মের কষ্টিপাথর: ‘সৃষ্টির আদি থেকেই আমাদের সবার হৃদয়ে। প্রকৃতি ও যুক্তির একটা ধর্ম হয়ে আছে যার মাধ্যমে মানুষকে অবশ্যই। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মকে বিচার করে দেখতে হবে। পরিণাম হিসাবে প্রত্যাদেশ অপ্রয়োজনীয়, কেননা আমাদের নিজস্ব যৌক্তিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে সত্য জানা। সম্ভব; ট্রিনিটি ও অবতারবাদের মতো রহস্যগুলোর নিখুঁত যৌক্তিক ব্যাখ্যা আছে; এগুলোকে সাধারণ বিশ্বাসীদের কুসংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক গীর্জার দাস করে রাখার জন্যে ব্যবহার করা উচিত নয়।
