ঈশ্বরকে নিজস্ব যান্ত্রিক ব্যবস্থায় সীমিতকারী ইংরেজ পদার্থ বিজ্ঞানী ইসাক নিউটন (১৬৪২-১৭২৭) একইভাবে ক্রিস্টান ধর্মকে রহস্যময়তা হতে মুক্ত করতে উদগ্রীব ছিলেন। গণিত নয়, তার সূচনা বিন্দু ছিল মেকানিক্স, কেননা জ্যামিতিতে দক্ষতা অর্জনের আগে একজন বিজ্ঞানীকে নিখুঁতভাবে বৃত্ত আঁকা শিখতে হয়। দেকার্তে যেখানে সত্তা, ঈশ্বর, এই প্রাকৃতিক জগতের অস্তিত্ব, এই ক্রমানুসারেই প্রমাণ করেছিলেন, সেখানে নিউটন শুরু করেছিলেন ভৌত জগৎ ব্যাখ্যার প্রয়াস দিয়ে যেখানে ঈশ্বর এক অত্যাবশ্যকীয় অংশ। নিউটনের পদার্থ বিজ্ঞানে প্রকৃতি সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়, ঈশ্বরই ছিলেন সকল ক্রিয়াকর্মের একক উৎস। এভাবে অ্যারিস্টটলের মতবাদের মতো ঈশ্বর ভৌত নিয়মনীতির ধারাবাহিকতা মাত্র। নিউটন তাঁর বিখ্যাত রচনা ফিলোসফিয়া নেচারালিস প্রিন্সিপিয়া (দ্য প্রিন্সিপলস্ অভ ন্যাচারাল ফিলোসফি) (১৬৮৭)য় গাণিতিক পরিভাষায় এমনভাবে বিভিন্ন মহাজাগতিক ও পার্থিব বস্তুর সম্পর্ক বর্ণনা করার প্রয়াস পেয়েছেন যাতে একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা গঠন করা যায়। নিউটন আবিস্কৃত মহাকর্ষ বলের ধারণা তার ব্যবস্থার বিভিন্ন অংশ বা উপাদানকে একত্রিত করেছে। মহাকর্ষ বলের ধারণায় কোনও কোনও বিজ্ঞানী রুষ্ট হয়েছিলেন, নিউটনের বিরুদ্ধে অ্যারিস্টটলের বস্তুর আকর্ষণী ক্ষমতার ধারণায়। ফিরে যাবার অভিযোগ তুলেছিলেন তাঁরা। এমন দৃষ্টিভঙ্গি ঈশ্বরের সার্বভৌমত্ব সম্পর্কিত প্রটেস্ট্যান্ট ধারণার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ছিল। নিউটন এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন: এক সার্বভৌম ঈশ্বরই ছিলেন তার ব্যবস্থার মূল, কেননা এমন একজন স্বর্গীয় মেকানিকের অস্তিত্ব ছাড়া এর অস্তিত্বই থাকত না।
মহাবিশ্ব নিয়ে চিন্তা করার সময় পাসকাল ও দেকার্তের বিপরীতে নিউটন নিশ্চিত ছিলেন যে, তাঁর কাছে ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ রয়েছে। মহাজাগতিক বস্তুগুলো পারস্পরিক মহাকর্ষ বলের টানে এক বিশাল গোলাকৃতি বস্তুপিণ্ডে পরিণত হয়নি কেন? কারণ এ ব্যাপারটি ঠেকাতেই এগুলোকে অসীম মহাশূন্যে যথেষ্ট বা পর্যাপ্ত দূরত্ব বজায় রেখে সযত্নে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি তাঁর বন্ধু সেইন্ট পল-এর ডিন রিচার্ড বেন্টলির কাছে যেমন ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, একজন স্বর্গীয় তত্ত্বাবধায়ক’ ছাড়া এটা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াত: ‘আমার মনে হয় না কেবল প্রাকৃতিক শক্তি দিয়ে এর ব্যাখ্যা করা সম্ভব, বরং আমি এর জন্যে একে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত এজেন্টের পরামর্শ ও হস্তক্ষেপ স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছি। একমাস পর, বেন্টলিকে আবার লিখেছিলেন তিনিঃ ‘অভিকর্ষ গ্রহগুলোকে চলমান করে থাকতে পারে, কিন্তু একটি ঐশী ক্ষমতা ছাড়া ওগুলো যেভাবে সূর্যের চরদিকে ঘুরছে তেমন ঘূর্ণন অর্জন সম্ভব ছিল না, সুতরাং এ কারণে এবং অন্যান্য যুক্তি দিয়েও আমি এই ব্যবস্থা’র জন্যে একজন বুদ্ধিমান এজেন্টের উপস্থিতি মানতে বাধ্য হচ্ছি। উদাহরণস্বরূপ, পৃথিবী নিজের অক্ষের ওপর ঘণ্টায় এক হাজার মাইলের বদলে মাত্র একশ মাইল বেগে ঘুরলে রাতের দৈর্ঘ্য হতো দশগুণ বেশি আর পৃথিবী এত ঠাণ্ডা থাকত যার ফলে প্রাণের অস্তিত্ব সম্ভব হতো নাঃ দীর্ঘ দিনের সময় প্রচণ্ড উত্তাপ সমস্ত খেতখামার পুড়িয়ে দিত। যে সত্তাটি সবকিছু এত নিখুঁতভাবে পরিকল্পনা করেছেন তিনি মহাবুদ্ধিধর একজন মেকানিক হতে বাধ্য। বুদ্ধিমান হওয়া ছাড়াও এই এজেন্টকে এই বিশাল বস্তুসমূহকে সামাল দিতে যথেষ্ট শক্তিমান হতে হয়েছে। নিউটন উপসংহার টেনেছেন: এই অসীম ও জটিল ব্যবস্থাকে গতি দানকারী আদিম শক্তি ছিল দোমিনেশিও যা বিশ্বজগৎ সৃষ্টির জন্যে দায়ী, যা ঈশ্বরকে স্বর্গীয় করেছে। অক্সফোর্ডের আরবী ভাষার প্রথম অধ্যাপক এডওয়ার্ড পোকক নিউটনকে জানিয়েছিলেন যে লাতিন শব্দ ডিউস আরবী দু-প্রভু-শব্দ হতে নেওয়া হয়েছে। সুতরাং ডেমিনিয়ন হচ্ছে ঈশ্বরের অত্যাবশ্যকীয় গুণ, সম্পূর্ণতা নয়, যা দেকার্তের ঈশ্বর আলোচনার সূচনা বিন্দু ছিল । প্রিন্সিপিয়ার উপসংহার ‘জেনারেল শালিয়ামে’ নিউটন ঈশ্বরের প্রচলিত গুণাবলীকে তাঁর বুদ্ধিমত্তা ও ক্ষমতা হতে উদ্ধার করেছেন:
সূর্য, গ্রহ ও ধূমকেতুসমূহের এই সুন্দরতম ব্যবস্থা কেবল এক বুদ্ধিমান ও শক্তিশালী সত্তার নির্দেশ ও কর্তৃত্ব হতেই সৃষ্টি হতে পারে…তিনি অনন্ত ও অসীম, সর্বশক্তিমান ও সর্বজ্ঞ; অর্থাৎ তার স্থায়িত্ব অনাদি হতে অনন্তকাল পর্যন্ত; তার অস্তিত্ব অসীম হতে অসীমে, তিনি সকল বস্তুকে নিয়ন্ত্রণ করেন, যা কিছু আছে বা থাকতে পারে তার সবই জানেন…আমরা কেবল তাঁর প্রাজ্ঞ ও অনন্য পরিকল্পনা ও চূড়ান্ত কারণ দ্বারাই তাঁকে জানি; আমরা তাঁকে তাঁর সম্পূর্ণতার জন্যে শ্রদ্ধা করি, কিন্তু আমরা তাঁকে তাঁর কর্তৃত্বের জন্যে সম্মান ও মান্য করি: কারণ আমরা তাঁর দাস হিসাবে তাঁকে মান্য করি এবং কর্তৃত্ব, দূরদর্শিতা ও চূড়ান্ত কারণ বিহীন একজন ঈশ্বর নিয়তি ও প্রকৃতি ছাড়া আর কিছুই নন। অন্ধ মেটাফিজিক্যাল প্রয়োজন, যা অবশ্যই সর্বত্র ও সবসময় এক রকম, বস্তুর মাঝে বৈচিত্র্য সৃষ্টি করতে পারে না। প্রাকৃতির বস্তুসমূহে আমরা যে বৈচিত্র প্রত্যক্ষ করি, যা বিভিন্ন কালে ও স্থানের সঙ্গে মানানসই তা কেবল অত্যাবশ্যকীয়ভাবে অস্তিতৃমান সত্তার ধারণা আর ইচ্ছা হতেই সৃষ্টি হতে পারে।
