ঈশ্বরের অস্তিত্বের এই প্রমাণ থেকে দেকার্তে ঈশ্বরের রূপ বা প্রকৃতি সম্পর্কে সত্য উদ্ধারে অগ্রসর হয়েছেন, ঠিক যেভাবে গাণিতিক প্রমাণ তুলে ধরেছিলেন। তাঁর ডিসকোর্স অন মেথড-এ তিনি যেমন বলেছেন, অন্তত এটা নিশ্চিত যে সম্পূর্ণ সত্তা, জ্যামিতির যে কোনও সম্ভাব্য উপস্থাপনের মতোই। আছেন। ইউক্লিদিয় ত্রিভূজের তিন কোণের সমষ্টি যেমন দুই সমকোণের সমান হতে বাধ্য, ঠিক তেমনি দেকার্তের সম্পূর্ণ সত্তার নির্দিষ্ট কিছু গুণাবলী থাকতে বাধ্য। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, আমাদের এই বিশ্বের একটা বস্তুগত বাস্তবতা ও একজন সম্পূর্ণ ঈশ্বর রয়েছেন, যিনি অবশ্যই সত্যময় এবং আমাদের প্রতারিত করবেন না। ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণে জগতকে ব্যবহার করার বদলে দেকার্তে বিশ্বের বাস্তবতায় বিশ্বাস অর্জনের জন্যে ঈশ্বরের ধারণাকে ব্যবহার করেছেন। দেকার্তে তার নিজস্ব পদ্ধতিতে পাসকালের মতো একই মাত্রায় জগৎ হতে বিচ্ছিন্নতা অনুভব করেছিলেন । পৃথিবীর দিকে হাত বাড়ানোর বদলে তার মন অন্তরমূখী হয়েছে। যদিও ঈশ্বরের ধারণা মানুষকে তার আপন অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চয়তা দেয় ও তা দেকার্তের জ্ঞানতত্ত্বের জন্যে অত্যাবশ্যক ছিল কিন্তু কার্টেসিয়ান পদ্ধতি এক বিচ্ছিন্নতা ও স্বায়ত্তশাসনের ইমেজ তুলে ধরে আমাদের শতকে যা মানুষের পাশ্চাত্য ভাবমূর্তির কেন্দ্রীয় বিষয়ে পরিণত হয়েছে। জগৎ হতে বিচ্ছিন্নতা ও এক গর্বিত সম্পূর্ণতা বহু নারী-পুরুষকে নির্ভরশীল করে তোলা ঈশ্বরের সামগ্রিক ধারণাটিকেই প্রত্যাখ্যানে প্ররোচিত করবে।
একেবারে সূচনা থেকেই ধর্ম মানুষকে পৃথিবীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন ও এর মাঝে শেকড় বিস্তারে সাহায্য করে এসেছে। পবিত্র স্থানের কাল্ট জগৎ সম্পর্ক সকল ভাবনার পূর্ববর্তী ছিল এবং নারী-পুরুষকে এক ভীতিকর বিশ্বে একটা লক্ষ্য খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে। প্রাকৃতিক শক্তিসমূহের ওপর দেবত্ব আরোপ বিস্ময় ও ভয়ের প্রকাশ হিসাবে কাজ করেছে যা জগতের প্রতি মানুষের সাড়া প্রদানের অংশ ছিল। এমনকি অগাস্তিনও বেদনাময় আধ্যাত্মিকতা সত্ত্বেও পৃথিবীকে বিস্ময়কর সৌন্দর্যে ভরপুর আবিষ্কার করেছিলেন। দেকার্তে, যার দর্শন অগাস্তিনের অন্তর্মুখী ট্র্যাডিশনের ওপর প্রতিষ্ঠিত, বিস্ময় প্রকাশের অবকাশ ছিল না তাঁর; যে কোনও মূল্যে রহস্যময়তার অনুভূতি এড়িয়ে যেতে হবে, কারণ তা সভ্য মানুষ অতিক্রম করে এসেছে। তাঁর লেস মেতিওরেস নিবন্ধের সূচনায় তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, ‘আমাদের সমপর্যায়ের বা নিম্নস্তরের বস্তুর চেয়ে উচ্চ পর্যায়ের জিনিসের প্রতি বেশি শ্রদ্ধা থাকাটা আমাদের পক্ষে স্বাভাবিক। সুতরাং কবি ও শিল্পীগণ মেঘমালাকে ঈশ্বরের আসন হিসাবে তুলে ধরেছেন, কল্পনা করেছেন ঈশ্বর মেঘের ওপর শিশির কণা ঝরাচ্ছেন বা নিজ হাতে পাথরের ওপর বিদ্যুৎ নিক্ষেপ করেছেন;
এটা আমার মনে এই আশার সৃষ্টি করেছে যে, আমি যদি এমনভাবে মেঘের প্রকৃতি বর্ণনা করি যেখানে আমাদের ও এগুলোর মাঝে দেখা কোনও কিছুর বা ওগুলো থেকে নেমে আসা কোনও কিছুর প্রতি বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকানোর অবকাশ থাকবে না, তাহলে আমরা সহজেই বিশ্বাস করব যে, একইভাবে পৃথিবীর ওপর সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় সবকিছুর মূল কারণ একইভাবে আবিষ্কার করা সম্ভব।
মেঘ, বাতাস, কুয়াশা ও বিদ্যুৎকে তুচ্ছ ঘটনা হিসাবে ব্যাখ্যা করেছেন দেকার্তে, ‘বিস্ময়ের যে কোনও কারণ’ অপসারণ করার জন্যে ব্যাখ্যা করেছেন তিনি। অবশ্য দেকার্তের ঈশ্বর ছিলেন দার্শনিকদের ঈশ্বর যিনি পার্থিব ঘটনাপ্রবাহের কোনও আম দেননি। ঐশীগ্রন্থে বর্ণিত অলৌকিক ঘটনাবলীর মাঝে নয় বরং তাঁর প্রতিষ্ঠিত চিরন্তন বিধির মাঝেই নিজেকে প্রকাশ করেন তিনিঃ লেস মোতিওরেস-এ প্রাচীন ইসরায়েলিরা মরুভূমিতে যে মান্না গেয়েছিল তাকে এক ধরনের শিশির বলেও বর্ণনা করেছেন দেকার্তে। এভাবেই জন্ম হয়েছিল বিভিন্ন অলৌকিক ঘটনা ও মিথের যৌক্তিক ব্যাখ্যা খুঁজে বার করার ভেতর দিয়ে বাইবেলের ‘সত্যতা প্রমাণ করার অসম্ভব ধরনের অ্যাপোলজেটিক্সের। উদাহরণ স্বরূপ, জেসাসের পাঁচ হাজার মানুষকে খাওয়ানোর ঘটনাটিকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে উপস্থিত জনতাকে গোপনে খাবার নিয়ে আনায় জেসাসের ভৎর্সনা করে সবার সঙ্গে ভাগ করে খাবার নির্দেশ হিসাবে। এর পেছনের উদ্দেশ্য মহৎ ছিল সন্দেহ নেই, কিন্তু এখানে বাইবেলিয় বিবরণের মূল সূর-প্রতীকধর্মীতা-ক্ষুণ্ণ হয়েছে।
দেকার্তেই সব সময় রোমান ক্যাথলিক চার্চের বিধি-বিধান মানার ব্যাপারে সতর্ক ছিলেন। নিজেকে অর্থডক্স ক্রিশ্চান ভাবতেন তিনি। বিশ্বাস ও যুক্তির মাঝে কোনও বিরোধ দেখেননি। তিনি তার নিবন্ধ ডিসকোর্স অন মেথড-এ যুক্তি দেখিয়েছেন যে, এমন একটা পদ্ধতি আছে যা মানবজাতিকে সকল সত্য খুঁজে পেতে সক্ষম করে তুলবে। কোনও কিছুই এর নাগালের বাইরে নয়। সে জন্যে যা প্রয়োজন-যে কোনও শাস্ত্রের ক্ষেত্রেই-সেই পদ্ধতি ব্যবহার করলেই জ্ঞানের একটি নির্ভরযোগ্য রূপ গড়ে তোলা সম্ভব হবে যার ফলে সকল বিভ্রান্তি ও অজ্ঞতা দূর হয়ে যাবে । রহস্যময়তা তালগোলে পরিণত হয়েছিল, এবং যে ঈশ্বরকে পূর্ববর্তী যুক্তিবাদীরা অন্য ঘটনাবলী হতে আলাদা হিসাবে দেখার ব্যাপারে যত্নবান ছিল সেগুলোকেই এবার মানবীয় চিন্তাশক্তির অধীনে নিয়ে আসা হয়েছে। সংস্কারের গোঁড়ামিপূর্ণ আলোড়ন সৃষ্টির আগে ইউরোপে রহস্যময়তা শেকড় গেড়ে ওঠার অবসর পায়নি। ফলে রহস্য ও মিথলজির ওপর নির্ভর করে টিকে থাকা আধ্যাত্মিকতা, নামেই বোঝা যায় এর সঙ্গে রহস্য ও মিথলজি গভীর সম্পর্ক রয়েছে, পশ্চিমের বহু ক্রিশ্চানের কাছে অচেনা ছিল। এমনকি দেকার্তে চার্চের অতিন্দ্রীয়বীর সংখ্যা ছিল বিরল, তাদের সন্দেহের চোখে দেখা হতো। ধর্মীয় অভিজ্ঞতার ওপর অস্তিত্ব নির্ভরশীল অতিন্দ্রীয়বাদীদের ঈশ্বর দেকার্তের মতো ব্যক্তির কাছে একেবারেই অচেনা ছিলেন, যার কাছে ধ্যানের অর্থ ছিল পুরোপুরি বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ড।
