পাসকালের নৈরাজ্যবাদের বিরুদ্ধে পেনসিস-এ এক ক্রমবর্ধমান উপলব্ধি জেগে উঠেছে যে একবার বাজি ধরার পর গোপন ঈশ্বর তার সন্ধানকারীর কাছে নিজেকে প্রকাশ করেন। পাসকাল ঈশ্বরকে দিয়ে বলিয়েছেন, “আগেই যদি না পেতে তাহলে আমাকে খুঁজতে না তুমি।” একথা সত্যি যে, যুক্তি ও তর্ক প্রয়োগ করে বা প্রাতিষ্ঠানিক গির্জার শিক্ষা নিয়ে মানুষের পক্ষে দূরবর্তী ঈশ্বরের কাছে পৌঁছার পথ পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু ঈশ্বরের কাছে আত্মসমর্পণের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভেতর দিয়ে বিশ্বাসীদের মনে পরিবর্তনের বোধ জাগে, ‘বিশ্বাসী, সৎ বিনয়ী, কৃতজ্ঞ, সৎ কর্মশীল এবং প্রকৃত বন্ধু হয়ে ওঠে সে। কোনওভাবে বিশ্বাস স্থাপন ও অর্থহীনতা আর হতাশার মাঝে ঈশ্বরানুভূতি গঠনের মাধ্যমে একজন ক্রিশ্চান আবিষ্কার করবে যে জীবনের অর্থ ও তাৎপর্য খুঁজে পেয়েছে। কার্যকর বলেই ঈশ্বর একটি বাস্তবতা। বিশ্বাস বুদ্ধিবৃত্তিক নিশ্চয়তা নয়, বরং অন্ধকারে ঝাঁপিয়ে পড়া ও এমন এক অভিজ্ঞতা লাভ যা নৈতিক আলোকন নিয়ে আসে।
আরেকজন নতুন মানুষ রেনে দেকার্তে (১৫৯৬-১৬৫০) ঈশ্বর আবিষ্কারে মনের ক্ষমতার ওপর আরও বেশি আস্থাবান ছিলেন। প্রকৃতপক্ষেই তিনি জোরের সঙ্গে বলেছেন যে, স্রেফ বুদ্ধিমত্তাই আমরা যে নিশ্চয়তার সন্ধান করি। তা দিতে পারে। পাসকালের বাজি ধরার ধারণা অনুমোদন করতেন না তিনি, যেহেতু এটা একেবারেই ভক্তিমূলক অভিজ্ঞতা বা অনুভূতির ওপর নির্ভরশীল ছিল; যদিও ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কিত তাঁর প্রমাণ অন্য ধরনের ভক্তির উপর নির্ভরশীল ছিল। ফরাসি প্রবন্ধকার মাইকেল মনতেইনের (১৫৩৩-৯২) সংশয়বাদের বিরোধিতা করতে উদগ্রীব ছিলেন তিনি। মনতেইন কোনও কিছুর নিশ্চয়তা বা সম্ভাব্যতা অস্বীকার করেছিলেন। গণিতবিদ ও বিশ্বাসী ক্যাথলিক দেকার্তে এ ধরনের সংশয়বাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য নয়া গবেষণামূলক যুক্তিবাদ আনার দায়িত্ব অনুভব করেছিলেন। লেসিয়াসের মতো দেকার্তে ভেবেছিলেন, কেবল যুক্তিই মানুষকে ধর্ম ও নৈতিকতার সত্য গ্রহণে রাজি করাতে পারে যাকে তিনি সভ্যতার ভিত্তি হিসাবে দেখেছেন। বিশ্বাস আমাদের এমন কিছুই বলে না যা যৌক্তিকভাবে প্রমাণ করা যাবে নাঃ সেইন্ট পল স্বয়ং রোমানদের উদ্দেশে রচিত তার এপিল-এ ঠিক এ রকম মত প্রকাশ করেছিলেন: কারণ ঈশ্বর সম্পর্কে যা জানা সম্ভব তা মানুষের কাছে পরিষ্কার, কেননা ঈশ্বরই তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন। বিশ্ব সৃষ্টির পর থেকেই ঈশ্বরের চিরন্তন ক্ষমতা ও অলৌকিকত্ব–যত অদৃশ্যই হোক–তার সৃষ্ট বস্তুসমূহের মনের চোখে দেখার জন্যে বিরাজ করছে। দেকার্তে আরও যুক্তি দেখিয়েছেন যে, অস্তিত্বমান অন্য যে কোনও কিছুর চেয়ে সহজ ও নিশ্চিতভাবে ঈশ্ববকে জানা সম্ভব (facilius certius)। এটা পাসকালের বাজি ধরার মতোই বিপ্লবাত্মক, যেহেতু বিশেষতঃ দেকার্তের প্রমাণ পলের উল্লেখিত বাহ্যিক জগতের সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যান করেছে। সেইন্ট পল মনের প্রতিক্রিয়াজাত অন্তমুখী চিন্তাকে জাগাতে এই প্রমাণ টেনেছিলেন।
নিজ সর্বজনীন গণিতের প্রয়োগিক পদ্ধতি ব্যবহার করে যৌক্তিকভাবে সরল বা প্রথম নীতিমালার দিকে অগ্রসর দেকার্তে ঈশ্বরের অস্তিত্বের একই রকম বিশ্লেষণমূলক প্রমাণ দেওয়ার প্রয়াস পেয়েছিলেন, কিন্তু অ্যারিস্টটল, সেইন্ট পল ও অতীতের সকল একেশ্বরবাদী দার্শনিকদের বিপরীতে তিনি সৃষ্টিকে পুরোপুরি ঈশ্বরবিহীন আবিষ্কার করেছেন। প্রকৃতিতে কোনও পরিকল্পনা নেই। প্রকৃতপক্ষে গোটা বিশ্ব বিশৃঙ্খল, বুদ্ধিমান পরিকল্পনার কোনও চিহ্নই প্রকাশ করে না। সুতরাং, আমাদের পক্ষে প্রকৃতি হতে প্রথম নীতিমালা সম্পর্কে কোনও রকম নিশ্চয়তা বের করা অসম্ভব। সম্ভাব্যতা বা সম্ভাবনার পেছনে নষ্ট করার মতো সময় দেকার্তের ছিল নাঃ তিনি গণিত দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা যায় এমন নিশ্চয়তার সন্ধান করতে চেয়েছিলেন। এটা সহজ ও স্বব্যাখ্যাত প্রস্তাবনায়ও পাওয়া যেতে পারে, যেমন: ‘যা হয়ে গেছে তা আর বদলানো যাবে না,’ অনস্বীকার্যভাবে সত্য। এইভাবে তিনি একটা লাকড়ির চুলোর পাশে বসে ধ্যান করার সময় সেই বিখ্যাত প্রবাদের সন্ধান পেয়েছিলেন: Cogito, crgo sum; আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি। প্রায় বার শতাব্দী আগের অগাস্তিনের মতো মানবীয় চেতনায় ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ পেয়েছেন দেকার্তে; এমনকি সন্দেহও সন্দেহকারীর অস্তিত্ব প্রমাণ করে! বাহ্যিক জগতের কোনও কিছু সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত হতে পারি না, কিন্তু আমাদের অন্তরের অনুভূতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যেতে পারে। দেকার্তের যুক্তি আনসেল্ম-এর অন্টোলজিক্যাল প্রমাণেরই পুনরাবৃত্তিতে পরিণত হয়। আমরা যখন সন্দেহ করি, তখন অহমের সীমাবদ্ধতা ও প্রকৃতি প্রকাশিত হয়। তা সত্ত্বেও সম্পূর্ণতা সম্পর্কে আমাদের পূর্ব ধারণা না থাকলে আমরা ‘অসম্পূর্ণতা’র ধারণায় পৌঁছতে পারি না। আনসেন্মের মতো দেকার্তেও উপসংহারে পৌঁছেছিলেন যে, অস্তিত্বহীন সম্পূর্ণতার এক পর্যায়ে স্ববিরোধীতে পরিণত হবে। সুতরাং, আমাদের সন্দেহের অনুভূতি আমাদের বলে যে এক পরম ও সম্পূর্ণ সত্তা-ঈশ্বর-থাকতে বাধ্য।
