আগুন
‘আব্রাহামের ঈশ্বর, ইসাকের ঈশ্বর, জ্যাকবের ঈশ্বর’ দার্শনিক এবং
পণ্ডিতদের ঈশ্বর নয়।
নিশ্চয়তা, নিশ্চয়তা, আন্তরিক, আনন্দ, শান্তি।
জেসাস ক্রাইস্টের ঈশ্বর
জেসাস ক্রাইস্টের ঈশ্বর
আমার ঈশ্বর ও তোমার ঈশ্বর
‘তোমার ঈশ্বরই হবেন আমার ঈশ্বর।’
জগৎ বিস্মৃত হয়েছে এবং ঈশ্বর ছাড়া সবকিছু।
একমাত্র গস্পেলে প্রদর্শিত পথেই তাকে পাওয়া যেতে পারে।’
অত্যাবশ্যকীয়ভাবে অতিন্দ্রীয় এই অভিজ্ঞতা বুঝিয়েছে যে, পাসকালের ঈশ্বর বর্তমান অধ্যায়ে আমাদের আলোচ্য অন্যান্য বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের ঈশ্বর হতে আলাদা ছিলেন। এই ঈশ্বর দার্শনিকদের ঈশ্বর নন; প্রত্যাদেশের ঈশ্বর ধর্মান্তরকরণের অদম্য শক্তি পাসকালকে জেসুইটদের বিরুদ্ধে তাদের চরম প্রতিপক্ষ জানসেনিস্টদের পক্ষে ঠেলে দিয়েছিল ।
ইগনেশিয়াস যেখানে গোটা বিশ্বকে ঈশ্বরময় দেখেছিলেন এবং জেসুইটদের মাঝে ঐসী সর্বব্যাপীতা ও সর্বজ্ঞতার বোধের চর্চা করার উৎসাহ জুগিয়েছিলেন, পাসকাল এবং জানসেনিস্টরা সেখানে জগতকে বিষণ্ণ ও ফাঁপা হিসাবে দেখেছেন-ঈশ্বরবিহীন মনে করেছেন। প্রত্যাদেশ সত্ত্বেও পাসকালের ঈশ্বর ‘গোপন ঈশ্বর’ রয়ে গেছেন, যৌক্তিক প্রমাণ দিয়ে যাঁকে আবিষ্কার করা যাবে না। ১৬৬৯ সালে তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত ধর্মীয় বিষয়াদি নিয়ে পাসকালের সংকলন পেনসিস-এ মানুষের অবস্থা সম্পর্কে গভীর নৈরাশ্যবাদ প্রকাশ পেয়েছে। মানুষের নীচতা এক অব্যাহত বিষয়, স্বয়ং ক্রাইস্টও যার অপসারণের অক্ষম, যিনি পৃথিবীর ধ্বংস পর্যন্ত যন্ত্রণায় ভুগবেন। বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি ও ঈশ্বরের ভীতিকর অনুপস্থিতি নতুন ইউরোপের আধ্যাত্মিকতার বড় ধরনের বৈশিষ্ট্য পরিণত হয়েছিল। পেনসিস-এর অব্যাহত জনপ্রিয়তা দেখায় যে, পাসকালের বিষাদময় আধ্যাত্মিকতা ও তার গোপন ঈশ্বর পশ্চিমের ধর্মীয় চেতনার গুরুত্বপূর্ণ কোনও স্থানে টোকা দিয়েছে বা আবেদন সৃষ্টি করেছে।
সুতরাং পাসকালের বৈজ্ঞানিক অর্জনগুলো তাকে মানুষের অবস্থা সম্পর্কে কোনও সান্ত্বনার বাণী শোনায়নি। বিশ্বের বিশালত্বের বিষয়টি চিন্তা করতে গিয়ে আতঙ্কে আড়ষ্ট হয়ে পড়েছেন তিনি:
আমি যখন মানুষের অন্ধ ও দোমড়ানো অবস্থা দেখি, যখন আমি মুক হয়ে গোটা বিশ্ব ও কোনও আলোক ছাড়াই একাকী পড়ে থাকা মানুষকে জরিপ করি, যেন বিশ্বজগতের এই কোণে হারিয়ে গেছে সে, কে তাকে এখানে এনেছে, কী কারণে এখানে এসেছে সে, মৃত্যুর পর তার কী পরিণতি হবে na জেনেই, কোনও কিছু জানারই ক্ষমতা নেই তার, তখন আতঙ্কে কেঁপে উঠি, যেন কোনও মানুষকে ঘুমন্ত অবস্থায় এক ভয়ঙ্কর নির্জন দ্বীপে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তারপর সে জেগে উঠেছে উদ্ধার পাওয়ার কোনও উপায় ছাড়াই দিশাহারা অবস্থায়। তারপর আমি এই ভেবে অবাক হয়ে যাই যে এমন করুণ অবস্থায়ও মানুষ হতাশায় নিমজ্জিত হয় না।
বৈজ্ঞানিক যুগের অতি আশাবাদকে আমরা যেন সরলীকরণ না করি এটা তার এক অসাধারণ স্মারক। পরম অর্থ বা তাৎপর্যরহিত ফাঁকা মনে হওয়া বিশ্বের অস্তিত্বের আতঙ্ক পুরোপুরি ধারণ করতে পেরেছিলেন পাসকাল। মানুষকে সব সময় তাড়া করে ফেরা অচেনা কোনও জগতে জেগে ওঠার আতঙ্কের খুব কমই এমন চমৎকারভাবে প্রকাশ পেয়েছে। পাসকাল নিজের প্রতি নিষ্ঠুর রকম সৎ ছিলেন; অধিকাংশ সমসাময়িকদের বিপরীতে তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ করার কোনও উপায় নেই। স্বভাবজাতভাবে বিশ্বাসে অক্ষম কারও সঙ্গে তর্ক করার কথা কল্পনা করার সময় তাকে বিশ্বাস করানোর মতো যুক্তি খুঁজে পাননি তিনি। একেশ্বরবাদের ইতিহাসে এটা ছিল এক নতুন পর্যায়। এর আগে পর্যন্ত কেউই গুরুত্বের সঙ্গে ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেনি। পাসকালই প্রথম ব্যক্তি যিনি মেনে নিয়েছিলেন যে, এই বেপরোয়া নতুন বিশ্বে ঈশ্বরে বিশ্বাস কেবল ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় হতে পারে। এ ক্ষেত্রে তিনিই ছিলেন প্রথম আধুনিক।
তাৎপর্যের দিক থেকে ঈশ্বরের অস্তিত্ব সংক্রান্ত পাসকালের সমস্যাটি বিপ্লবাত্মক, কিন্তু সরকারিভাবে কোনও চার্চ একে কখনও মেনে নেয়নি। সাধারণভাবে ক্রিশ্চান অ্যাপোলজিস্টরা এই অধ্যায়ের শেষে আলোচিত লেনার্দ লেসিয়াসের যৌক্তিক পদ্ধতিই পছন্দ করেছিলেন। কিন্তু এই পদ্ধতি কেবল দার্শনিকদের ঈশ্বরের দিকেই নিয়ে যেতে পারে, পাসকাল অনুভূত প্রত্যাদেশের ঈশ্বর নয়। বিশ্বাস, জোর দিয়ে বলেছেন, তিনি, ‘যৌক্তিক সম্মতি নয় বরং সাধারণ বুদ্ধির ওপর নির্ভরশীল। এটা একটা জুয়া। ঈশ্বর আছেন প্রমাণ করা অসম্ভব আবার যুক্তির কারণেই তার অস্তিত্ব অস্বীকার করাও সমানভাবে অসম্ভব: ‘তিনি (ঈশ্বর) কী বা তিনি আছেন কিনা জানার ক্ষমতা আমাদের নেই… যুক্তি এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারে না। অসীম হট্টগোল আমাদের বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। এই অসীম দূরত্বের শেষ প্রান্তে একটা মুদ্রাকে শূন্যে। ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে যেটা কোনও একদিক দিয়ে নেমে আসবে। তুমি কোন দিকে বাজি ধরবে? অবশ্য এই বাজি পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়। ঈশ্বরের পক্ষে বাজি ধরায় জয় লাভের সম্ভাবনাই বেশি। ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস স্থাপন বেছে নেওয়ায় কথা বলেছেন পাসকাল, ঝুঁকি সীমিত, কিন্তু লাভ অসীম । একজন ক্রিশ্চান বিশ্বাস নিয়ে অগ্রসর হলে এক অব্যাহত আলোকন, ঈশ্বরের উপস্থিতির সচেতনতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে সে, যা কিনা মুক্তির নিশ্চিত লক্ষণ। বাহ্যিক কর্তৃপক্ষের ওপর নির্ভর করা অর্থহীন; প্রত্যেক ক্রিশ্চান একা।
