সম্পদ ও আবিষ্কার একীভূত করার ফলে মানুষ একদিকে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছিল, তখন নতুন বিশেষায়ন ভিন্ন ও অনিবার্যভাবে তাদের বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। এতদিন পর্যন্ত একজন বুদ্ধিজীবীর পক্ষে বিজ্ঞানের সকল শাখা সম্পর্কেই ওয়াকিবহাল থাকা সম্ভব ছিল। উদাহরণস্বরূপ, মুসলিম ফায়লাসুফরা। পশ্চিমা দর্শন, নন্দনতত্ত্বে বেশ দক্ষ ছিল। প্রকৃতপক্ষেই, ফালসাফাহ্ এর অনুসারীদের এক সামঞ্জস্যপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ সামগ্রিক বাস্তবতা সম্পর্কে জ্ঞান দিয়েছিল। সপ্তদশ শতাব্দী নাগাদ পশ্চিমা সমাজের বিশেষ বৈশিষ্ট্য পরিগণিত হয়ে ওঠা বিশেষায়ন নিজ উপস্থিতি জানান দিতে শুরু করেছিল। জ্যোতির্বিজ্ঞান, রসায়ন, জ্যামিতির অসংখ্য শাস্ত্র ক্রমশঃ স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত হয়ে উঠেছিল। শেষ পর্যন্ত আমাদের আমলে এসে কোনও এক বিষয়ে বিশেষজ্ঞের পক্ষে অন্য কোনও বিষয়ে যোগ্যতার পরিচয় রাখাটা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। এখানে বলা যায় যে, প্রত্যেক প্রধান বুদ্ধিজীবী নিজেকে প্রথার রক্ষাকারী হিসাবে না দেখে অগ্রপথিক বিবেচনা করেছেন। তিনি ছিলেন অভিযাত্রী, নাবিকদের মতো বিশ্বের নতুন নতুন অংশে প্রবেশকারী । আপন সমাজের স্বার্থে এতদিন পর্যন্ত অজানা এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সাফল্যের নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কারের জন্য কল্পনার প্রয়াস নেন ও এই প্রক্রিয়ায় প্রাচীন পবিত্রতার ধারণাকে নাকচ করে তিনি পরিণত হয়েছেন সাংস্কৃতিক নায়কে। এক কালে যে প্রকৃতি মানব জাতিকে দাসত্বের শৃঙ্খলে আটকে রেখেছিল, তার নিয়ন্ত্রণ প্রবলভাবে আয়ত্তে চলে আসায় নতুন করে মানুষের আশা জেগে উঠেছিল । মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে, উন্নত শিক্ষা ও উন্নত আইন মানবাত্মাকে আলোকিত করে তুলতে পারে। মানুষের সহজাত ক্ষমতার ওপর এই নতুন আস্থার মানে ছিল তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে, তার নিজস্ব প্রয়াসের সাহায্যেই সে আলোকপ্রাপ্ত হতে পারে। তাদের মনে আর এই ধারণা থাকেনি যে সত্য আবিষ্কার করার জন্যে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত প্রথা বা ঐতিহ্য, কোনও প্রতিষ্ঠান বা অভিজাত গোষ্ঠী-বা এমনকি ঈশ্বর হতে প্রাপ্ত প্রত্যাদেশের ওপর নির্ভর করতে হবে।
তা সত্ত্বেও বিশেষায়নের অভিজ্ঞতার অর্থ ছিল বিশেষায়ন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভূক্ত মানুষ সমগ্রকে প্রত্যক্ষ করায় ক্রমবর্ধমান হারে ব্যর্থ হচ্ছিল। এরই পরিণামে উদ্ভাবনী শক্তিসম্পন্ন বিজ্ঞানী ও দার্শনিকরা ফের গোড়া থেকে জীবন ও ধর্ম সম্পর্কিত নিজস্ব তত্তব গড়ে তোলার দায়িত্ব অনুভব করেছেন। তাঁদের মনে হয়েছে বর্ধিত জ্ঞান ও দক্ষতা তাঁদের ওপর বাস্তবতা সম্পর্কে প্রচলিত ব্যাখ্যার দিকে দৃষ্টিপাত করার ও একে হালনাগাদ করার দায়িত্ব অর্পণ করেছে। নতুন বৈজ্ঞানিক চেতনা ছিল গবেষণামূলক, স্রেফ পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার ওপর নির্ভরশীল। আমরা দেখেছি, ফালসাফাহর প্রাচীন যুক্তিবাদ এক যৌক্তিক মহাবিশ্বের অস্তিত্বের ওপর প্রাথমিক বিশ্বাসের ওপর নির্ভরশীল ছিল। পশ্চিমা বিজ্ঞানীরা এভাবে কোনও কিছু নিশ্চিত ধরে নিতে পারেননি; অগ্রগামীরা ক্রমবর্ধমানহারে ভুলের কুঁকি গ্রহণ বা বাইবেল, চার্চ ও ক্রিশ্চান প্রথাদির মতো প্রতিষ্ঠানসমূহকে আঘাত করতে ছিলেন প্রস্তুত। ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে পুরোনো প্রমাণসমূহ’ আর পুরোপুরি সন্তোষজনক ছিল না, প্রকৃতি বিজ্ঞানী ও দার্শনিকগণ গবেষণামূলক পদ্ধতিতে প্রবল উৎসাহী থাকায় অন্যান্য বিষয় যেভাবে প্রমাণ করেছিলেন সেভাবেই ঈশ্বরের বস্তুগত সত্তা যাচাই করার দায়িত্ব বোধ করলেন।
নাস্তিক্যবাদ তখনও ঘৃণার বিষয় ছিল। আমরা দেখব, আলোকন পর্বের অধিকাংশ ফিলোসফ মোটামুটি অবচেতনে ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু তারপরেও মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তি মনে করতে শুরু করেছিল যে, এমনকি ঈশ্বরের অস্তিত্বও নিশ্চিত ধরে নেওয়া যায় না। সম্ভবত প্রথম যিনি এ বিষয়টি উপলব্ধি করে নাস্তিক্যবাদকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিলেন তিনি ফরাসি পদার্থ বিজ্ঞানী, গণিতজ্ঞ ও ধর্মতাত্ত্বিক ব্লেইজ পাসকাল (১৬২৩-৬২)। অসুস্থ কিন্তু নির্ধারিত বয়সে পৌঁছার আগেই পরিণতিপ্রাপ্ত বালক হিসবে তাকে অন্যান্য শিশুদের থেকে আলাদা করে নেওয়া হয়েছিল। বিজ্ঞানী পিতা শিক্ষা দিয়েছিলেন তাঁকে, যিনি জানতে পারেন যে ১১ বছর বয়সী ব্লেইজ গোপনে ইউক্লিদের প্রথম তেইশটি প্রতিপাদ্যের সমাধান করে ফেলেছেন। ষোল বছর বয়সে জ্যামিতির উপর একটা রচনা প্রকাশিত হয় তার, বিজ্ঞানী দেকার্তে যেটাকে এত অল্প বয়সী কারও রচনা বলে বিশ্বাস করতে চাননি। পরবর্তীকালে তিনি গণনাযন্ত্র, ব্যারোমিটার ও হাইড্রোলিক প্রেসের নকশা প্রণয়ন করেছিলেন। পাকজল পরিবার তেমন ধার্মিক ছিল না, কিন্তু ১৬৪৬ সালে তারা জানসেনিজমে দীক্ষা নিয়েছিল। ব্লেইজের বোন জ্যাকুলিন দক্ষিণ-পশ্চিম প্যারিসের পোর্ট-রয়্যাল জানসেনিস্ট কনভেন্টে যোগ দিয়ে ক্যাথলিক গোষ্ঠীর তীব্র সমর্থকে পরিণত হন। ২৩ নভেম্বর, ১৬৫৪ তারিখে রাতে স্বয়ং ব্লেইজ ‘রাত সাড়ে দশটা থেকে শুরু করে মধ্যরাতের আধঘণ্টা পর পর্যন্ত স্থায়ী এক ধর্মীয় অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন, যা দেখিয়ে দিয়েছিল যে, তাঁর বিশ্বাস খুবই দূরবর্তী এবং পুঁথিগত। মৃত্যুর পর এই প্রত্যাদেশের স্মৃতিচারণ তাঁর ডাবলেটের সঙ্গে সেলাই করা অবস্থায় পাওয়া যায়:
