আধুনিক কারিগরী সমাজের উপাদান বা বৈশিষ্ট্য কী ছিল? অতীতের সকল সভ্যতা কৃষির উপর নির্ভরশীল ছিল। নাম থেকেই যেমন বোঝা যায়, সভ্যতা ছিল নগরেরই সাফল্য বা অর্জন, যেখানে এক অভিজাত গোষ্ঠী কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের উদ্বৃত্তের ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন করত; বিভিন্ন সংস্কৃতির জন্ম দেওয়ার মতো অবকাশ ও সম্পদ তাদের ছিল। অন্যান্য প্রধান ধর্মীয় মতাদর্শের মতো মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের একই সময়ে নগরাঞ্চলে এক ঈশ্বরের ওপর বিশ্বাসের জন্ম নেয়। অবশ্য কৃষি-নির্ভর এইসব সমাজ ছিল নাজুক প্রকৃতির। ফসল, উৎপাদন, আবহাওয়া ও ভূমি ক্ষয়ের মতো বিভিন্ন চলকের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এক একটি সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটার সঙ্গে সঙ্গে এর অঙ্গীকার ও দায়িত্বসমূহেরও প্রসার ঘটায় শেষ অবধি প্রাপ্ত সম্পদ অপ্রতুল হয়ে পড়েছে। সমৃদ্ধি ও ক্ষমতার চরম শিখরে ওঠার পর অনিবার্যভাবে শুরু হয়েছে অবক্ষয় বা পতনের। নতুন পশ্চিম কিন্তু কৃষির ওপর নির্ভরশীল ছিল না। প্রযুক্তির ওপর এর নিয়ন্ত্রণ ও দক্ষতার অর্থ ছিল পশ্চিম স্থানীয় পরিস্থিতি এবং বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সময়গত পরিবর্তনের উপর নির্ভরশীল নয়। পুঞ্জীভূত মূলধন অর্থনৈতিক সম্পদে গঠন করা ও-অতিসাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত–অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত নবায়নযোগ্য মনে হয়েছে। আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়ায় পশ্চিম বেশ কিছু গভীর পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে এগিয়েছে: এটা শিল্পায়নের দিকে চালিত করেছে। পরিণতিতে কৃষিক্ষেত্রে সূচিত হয়েছে পরিবর্তন, বুদ্ধিবৃত্তিক আলোকন ঘটেছে। রাজনৈতিক সামাজিক বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এইসব মোটা দাগের পরিবর্তন নারী-পুরুষকে নিজেদের দেখার ধারণায় প্রভাব ফেলেছে ও ঐতিহ্যগতভাবে যে সত্তাকে তারা ঈশ্বর আখ্যায়িত করত তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক পর্যালোচনা করতে বাধ্য করেছে।
পশ্চিমা কারিগরী জ্ঞানভিত্তিক এই সমাজে বিশেষায়ন অত্যন্ত জরুরি ছিল: অর্থনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে সকল আবিষ্কার বা উদ্বাবন বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ ধরনের দক্ষতার দাবি করেছে। যেমন, বিজ্ঞানীরা যন্ত্রপাতি সরঞ্জাম প্রস্তুতকারীদের বর্ধিত কর্মদক্ষতার উপর নির্ভরশীল ছিলেন; শিল্পের জন্যে প্রয়োজন ছিল নতুন মেশিন ও শক্তির উৎসের পাশাপাশি বিজ্ঞানের তরফ থেকে পাওয়া তত্ত্বগত অবদান। বিভিন্ন ধরনের বিশেষায়ন ক্রমশঃ পরস্পর মিলিত হতে হতে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে: একটি অপরটিকে বিভিন্ন এবং হয়তো ইতিপূর্বে সম্পর্কহীন ক্ষেত্রে অনুপ্রাণিত করেছে। এটা ছিল এক পুঞ্জীভবন প্রক্রিয়া। একটি বিশেষ ক্ষেত্রে বিশেষায়ণের সাফল্য অন্য ক্ষেত্রে ব্যবহারের ফলে আরও ব্যাপক হয়েছে ও তা ফের এর দক্ষতার উপর প্রভাব ফেলেছে। অব্যাহত উন্নয়নের ভিত্তিতে মূলধন পদ্ধতিগতভাবে পুনঃবিনিয়োজিত হয়ে স্পষ্টতই অপ্রতিরোধ্য গতিবেগ অর্জন করে। ক্রমবর্ধমনে সংখ্যক বলয়ে বিভিন্ন স্তরের মানুষ আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়ায় আকৃষ্ট হতে শুরু করেছিল। সভ্যতা ও সাংস্কৃতিক সাফল্য আর মুষ্টিমেয় অভিজাত শ্রেণীর অধিকারে রইল না, বরং তা কারখানা-শ্রমিক, কয়লার খনির শ্রমিক, ছাপাখানার কর্মচারী ও কেরানী শ্রেণীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ল, সেটা কেবল তারা শ্রমিক বলে নয় বরং ক্রমবর্ধমান বাজারের ক্রেতা হিসাবেও। শেষ পর্যন্ত দক্ষতার তীব্র প্রয়োজনকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে এই নিম্নশ্রেণীর লোকদের শিক্ষিত ও একটা মাত্রা পর্যন্ত সমাজের সম্পদের অংশীদার হওয়ার প্রয়োজন দেখা দেবে। উৎপাদনশীলতার ব্যাপক বৃদ্ধি, পুঁজির পুঞ্জীভবন, পণ্য বাজারের সম্প্রসারণ ও সেইসঙ্গে বিজ্ঞানের নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রগতি সামাজিক বিপ্লবের সূচনা ঘটিয়েছে। ভূ-স্বামীদের ক্ষমতা হ্রাস পায়; বুর্জোয়াদের অর্থনৈতিক বিশাল শক্তি তাদের স্থান অধিকার করে নেয়। সামাজিক সংগঠনের ক্ষেত্রে নতুন ক্ষমতার ছাপ অনুভূত হয়েছিল-যা ক্রমেই পশ্চিমকে চীন ও অটোম্যান সাম্রাজ্যের মতো বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মানের কাছাকাছি মানে পৌঁছে দিয়েছে ও পরে তাদের ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম করেছে। ফরাসি বিপ্লবের বছর ১৭৮৯ সাল নাগাদ সরকারি সেবা যাচাই করা হয়েছে দক্ষতা ও উপযোগিতার আলোকে। ইউরোপের বিভিন্ন সরকার আধুনিকতার ক্রমপরিবর্তনশীল অবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে নিজেদের পুনঃসংগঠিত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে আইন-কানুন সংশোধনে ন্যস্ত হয়েছে।
প্রাচীন কৃষিনির্ভর পরিবেশে এমন কিছু কল্পনাও করা যেত না যখন আইনকে অপরিবর্তনীয় ও স্বর্গীয় মনে করা হতো। এটা ছিল প্রযুক্তিকরণের ফলে পশ্চিমে আসন্ন নয়া স্বায়ত্তশাসনের একটা লক্ষণ: নারী-পুরুষ মনে করেছে, তারাই তাদের ভাগ্য নিয়ন্তা যা আগে কখনও মনে হয়নি। আমরা দেখেছি, প্রথাগত সমাজে উদ্ভাবন ও পরিবর্তন কেমন আতঙ্কের সৃষ্টি করে, যেখানে সভ্যতাকে নাজুক অর্জন হিসাবে দেখা হয় ও অতীতের সঙ্গে ধারাবাহিকতার যে কোনও বিচ্ছেদকে প্রতিহত করা হয়েছে। কিন্তু পশ্চিমে সুচিত আধুনিক যান্ত্রিক সমাজ অব্যাহত উন্নয়ন ও প্রগতির প্রত্যাশার উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। পরিবর্তনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে অনিবার্য বলে মেনে নেওয়া হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষেই লন্ডন রয়্যাল সোসায়েটির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো প্রাচীন জ্ঞানের স্থলাভিষিক্ত করার জন্যে নতুন জ্ঞান আহরণে নিজেদের নিবেদিত করেছিল। বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের এই প্রক্রিয়ায় সাহায্য করার জন্যে তাদের বিভিন্ন আবিষ্কারকে একত্রিত করার উৎসাহ দেওয়া হয়েছে । নতুন নতুন আবিষ্কার গোপন রাখার বদলে নতুন বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের নিজস্ব ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ প্রগতি হুরান্বিত করার লক্ষ্যে জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে চেয়েছে। সুতরাং, ওইকুমিনের প্রাচীন রক্ষণশীল চেতনা অব্যাহত উন্নয়ন অনুশীলনযোগ্য এরকম বিশ্বাস ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়েছে। আগের দিনে প্রবীনরা যেখানে তরুণ প্রজন্ম গোল্লায় যাচ্ছে ভেবে শঙ্কিত বোধ করেছে, সেখানে প্রবীন প্রজন্মের মাঝেও প্রত্যাশা জেগেছে যেন তাদের সন্তানরা আরও উন্নত জীবনযাপন করতে পারে। ইতিহাস পর্যালোচনা এক নতুন মিথের প্রভাবান্বিত হয়: প্রগতি। এর সাফল্য ব্যাপক, কিন্তু এখন প্রকৃতির যে ক্ষতি এতে হয়েছে তাতে করে আমরা উপলব্ধি করেছি এই জীবন পদ্ধতিও অতীতের জীবন ধারার মতো নাজুক ও সম্ভবত যেন বুঝতে শুরু করেছি, শত শত বছর ধরে মানুষকে অনুপ্রাণিতকারী অন্যান্য মিথলজির মতোই কাল্পনিক।
