আজকের দিনে বালারমাইনের যুক্তি হাস্যকর ঠেকে। এমনকি পুরোপুরি আক্ষরিক অর্থে বিশ্বাসী ক্রিশ্চানও নরকের অবস্থান পৃথিবীর কেন্দ্রে ভাবে না। কিন্তু অনেকেই এক সুসংঘবদ্ধ সৃষ্টিতত্ত্বে ঈশ্বরেরর কোনও স্থান নেই আবিষ্কারকারী অন্যান্য বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের মুখোমুখি হয়ে প্রবল ধাক্কা খেয়েছিল।
মোল্লা সদরা যখন মুসলিম শিক্ষা দিচ্ছিলেন যে, স্বর্গ ও নরক প্রত্যেকের অন্তরের কাল্পনিক জগতে অবস্থিত; ঠিক তখন বালারমাইনের মতো বিশিষ্ট গীর্জা অধিকর্তারা প্রবল যুক্তি উপস্থাপন করছিলেন যে, এগুলোর সত্যিকার ভৌগলিক অবস্থান আছে। কাব্বানিস্টরা যখন সৃষ্টির বাইবেলিয় বিবরণকে একেবারে প্রতীকী অর্থে ব্যাখ্য করছিল আর অনুসারীদের এই মিথলজি আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ না করার জন্যে সতর্ক করছিল, ঠিক সেই সময় ক্যাথলিক ও প্রটেস্ট্যান্টরা দাবি করছিল যে, বাইবেলের প্রতিটি বর্ণনা একেবারে অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। এটা নতুন বিজ্ঞানের সামনে প্রচলিত ধর্মীয় মিথলজি নাজুক করে দেয় ও শেষ পর্যন্ত বহু লোকের পক্ষেই ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখাটাই অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ধর্মবিদরা আসন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মানুষকে তৈরি করছিলেন না। আর সংস্কারের পরবর্তী প্রটেস্ট্যান্ট ও ক্যাথলিকের মাঝে অ্যারিস্টটলবাদের প্রতি আগ্রহের কাল থেকে তারা ঈশ্বর সম্পর্কে এমনভাবে আলোচনা শুরু করেছিল যেন তিনি কোনও বস্তুগত বিষয়। শেষ পর্যন্ত অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ পাদ ও উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের সময়টা নতুন নাস্তিকদের পক্ষে ঈশ্বরকে পুরোপুরি ত্যাগ করতে সক্ষম করে তোলে।
এভাবেই স্যুভিয়ানের অত্যন্ত প্রভাবশালী জেসুইট ধর্মতাত্ত্বিক লেনার্দ লেসিয়াস (১৫৫৪-১৬২৩) তাঁর দ্য ডিভাইন প্রভিডেন্ট নিবন্ধে দার্শনিকদের ঈশ্বরের প্রতি যেন আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন। এই ঈশ্বরের অস্তিত্ব জীবনের অন্য যে কোনও বাস্তবতার মতো বৈজ্ঞানিকভাবে তুলে ধরা সম্ভব। বিশ্ব জগতের পরিকল্পনা বা আকস্মিক দুর্ঘটনা হতে পারে না, একজন প্রাইম মুভার বা প্রতিপালকের অস্তিত্বের দিকেই ইঙ্গিত করে। অবশ্য লেসিয়াসের ঈশ্বরের মাঝে ক্রিশ্চানসূচক কিছু ছিল নাঃ তিনি বৈজ্ঞানিক সত্য যাকে যে কোনও যুক্তিবাদী মানুষ আবিষ্কার করতে পারবে। লেসিয়াস কদাচ জেসাসের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি এমন ধারণা দিয়েছেন যে, ঈশ্বরের অস্তিত্ব সাধারণ পর্যবেক্ষণ, দর্শন, ধর্মের তুলনামূলক গবেষণা আর সাধারণ জ্ঞানেই বের করা সম্ভব। পশ্চিমের বিজ্ঞানী ও দার্শনিকগণ আরও যেসব বিষয় নিয়ে গবেষণা শুরু করতে যাচ্ছিলেন ঈশ্বর তেমনি একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছিলেন। ফায়সুফরা ঈশ্বরের অস্তিত্ব বিষয়ক প্রমাণাদির বৈধতা নিয়ে কখনও সন্দেহ পোষণ করেনি, কিন্তু তাদের সহধর্মবাদীরা শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে দার্শনিকদের এই ঈশ্বরের খুব সামান্যই ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে। তোমাস আকুইনাস হয়তো ধারণা দিয়েছিলেন যে, ঈশ্বর সত্তার ধারাবাহিকতায় আর একটি বস্তু মাত্র-যদিও সর্বোত্তম-কিন্তু তিনি ব্যক্তিগতভাবে দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন যে, এইসব দার্শনিক যুক্তির সঙ্গে প্রার্থনায় তাঁর অনুভূত অতিন্দ্রীয় ঈশ্বরের কোনও সম্পর্ক নেই। কিন্তু সপ্তদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে নেতৃস্থানীয় ধর্মতাত্ত্বিক ও গীর্জা-অধিপতিগণ পুরোপুরি যৌক্তিক ভিত্তিতে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ অব্যাহত রাখেন। আজকের দিনেও অনেকে তা করে আসছে। নতুন বিজ্ঞানের কাছে এসব যুক্তি অসার প্রমাণ হলো। স্বয়ং ঈশ্বরের অস্তিত্বই আক্রমণের মুখে পড়ল। কেবল কল্পনা নির্ভর অনুশীলন ও প্রার্থনায় আবিষ্কার যোগ্য ঈশ্বরকে অস্তিত্বের সাধারণ অর্থে অস্তিত্বহীন এক সত্তার প্রতীক হিসাবে দেখার বদলে ক্রমবর্ধমান হারে তাকে জীবনের অন্য যে কোনও বাস্তবতার মতো মনে করা হচ্ছিল। লেসিয়াসের মতো ধর্মতাত্ত্বিকদের মাঝে আমরা পাশ্চাত্যকে আধুনিকতার দিকে এগিয়ে যেতে দেখি, খোদ ধর্মবিদরাই ভবিষ্যতের নাস্তিকদের হাতে এমন এক ঈশ্বরকে প্রত্যাখ্যানের অস্ত্র তুলে দিচ্ছিলেন যার ধর্মীয় মূল্য ছিল খুব সামান্য এবং যিনি বহু মানুষের মনে আশা আর বিশ্বাসের পরিবর্তে আতঙ্কের জন্ম দিয়েছিলেন। দার্শনিক ও বিজ্ঞানীদের মতো সংস্কার-পরবর্তী ক্রিশ্চানরা অতিন্দ্রীয়বাদীদের কাল্পনিক ঈশ্বরকে কার্যকরভাবে বাদ দিয়ে যুক্তির ঈশ্বরের কাছে আলোকন প্রত্যাশা করেছে।
০৯. আলোকন
ষোড়শ শতাব্দীর শেষ নাগাদ পাশ্চাত্য কারিগরিকরণের এক প্রক্রিয়ায় পা রাখে যা একেবারে ভিন্ন ধরনের সমাজ ও মানবতার জন্যে এক নতুন আদর্শের জন্ম দেবে। অনিবার্যভাবেই এটা ঈশ্বরের ভূমিকা ও প্রকৃতি সম্পর্কিত পাশ্চাত্যের ধ্যান-ধারণাকে প্রভাবিত করবে। সদ্য শিল্প-উন্নত ও দক্ষ পশ্চিমের সাফল্য বিশ্বের ইতিহাসের ধারাকেও বদলে দিয়েছিল । ওইকুমিনের অন্যান্য দেশ ক্রমবর্ধমান হারে পশ্চিমা জগতকে উপেক্ষা করা কঠিন বলে আবিষ্কার করেছিল, অতীতে যেমন অন্যান্য প্রধান সভ্যতার অনেক পেছনে পড়েছিল এরা, কিংবা কিছুতেই মানিয়ে নিতে পারছিল না। কারণ আর কোনও সমাজ অনুরূপ সাফল্য অর্জন করতে পারেনি, পশ্চিম একেবারে নিজস্ব সমস্যার সৃষ্টি করছিল, সে কারণে সেগুলোর মোকাবিলাও ছিল অত্যন্ত দুরূহ। যেমন অষ্টাদশ শতাব্দীর আগে পর্যন্ত আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ইসলামি শক্তিই ছিল প্রধান। যদিও পঞ্চদশ শতাব্দীর রেনেসাঁ পাশ্চাত্যের ক্রিশ্চান জগতকে কোনও কোনও ক্ষেত্রে ইসলামি বিশ্ব হতে অগ্রবর্তী অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছিল । বিভিন্ন মুসলিম শক্তি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অনায়াসে সক্ষম ছিল। অটোমানদের ইউরোপের অভ্যন্ত রে অগ্রযাত্রা অব্যাহত ছিল। মুসলিমরা তাদের পথ অনুসরণকারী পর্তুগীজ অভিযাত্রী ও বণিকদের বিরুদ্ধে নিজস্ব অবস্থান ধরে রাখতে পারছিল । যা হোক, অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে ইউরোপ বিশ্বে প্রাধান্য বিস্তার শুরু করে; এর সাফল্যের প্রকৃতিই বুঝিয়ে দিয়েছিল যে অবশিষ্ট পৃথিবীর পক্ষে ইউরোপের সঙ্গে তাল মেলানো অসম্ভব। বৃটিশরা ভারতের নিয়ন্ত্রণও করায়ও করেছিল; তারা বিশ্বের যতটা সম্ভব অধিকার করে নেওয়ার জন্য তৈরি ছিল। পাশ্চাত্যকরণ এবং এর সঙ্গেই ঈশ্বর হতে মুক্তির দাবিকারী পাশ্চাত্যের সেকুলারিজমের কাল্টের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ।
