রোমান ক্যাথলিক চার্চ অবশ্য আবার সবসময় ভোলা মনের পরিচয় দেয়নি। ১৫৩০ সালে পোলিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিকোলাস কোপার্নিকাস তার দে রিভোলুশনিবাস রচনা শেষ করেন, যেখানে দাবি করা হয় যে সূর্যই মহাবিশ্বের কেন্দ্র। ১৫৪৩ সালে তাঁর মৃত্যুর অল্পদিন আগে এটি প্রকাশিত হয় এবং চার্চ কর্তৃক নিষিদ্ধ বইয়ের তালিকায় সংযোজিত হয় । ১৬১৩ সালে পিসান গণিতবিদ গ্যালিলিও গ্যালিলি দাবি করেন যে, তার আবিষ্কৃত টেলিস্কোপ কোপার্নিকাসের পদ্ধতিকে সঠিক প্রমাণ করেছে। তার ব্যাপারটা একটি cause celebre-এ পরিণত হয়েছে। ইনকুইজিশনের সামনে তলব করা হয় তাকে। বৈজ্ঞানিক বিশ্বাস ত্যাগ করার নির্দেশ দেওয়া হয় গ্যালিলিওকে; কারাবন্দি করা হয় অনির্দিষ্টকালের জন্যে। সকল ক্যাথলিক এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত পোষণ করেনি, কিন্তু রোমান ক্যাথলিক চার্চ রক্ষণশীল চেতনার কালে অন্য যে কোনও সংস্থার মতো পরিবর্তনের বেলায় সচেতনভাবে বিরোধী ছিল । চার্চকে যা আলাদা করেছিল সেটা হচ্ছে প্রতিপক্ষের ওপর জোর খাটানোর ক্ষমতা; চমৎকারভাবে চলমান এক যন্ত্র ছিল সেটা, বুদ্ধিবৃত্তিক একতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে মারাত্মক দক্ষ হয়ে উঠেছিল। অনিবার্যভাবে গ্যালিলিওর নিন্দা ক্যাথলিক দেশসমূহে বিজ্ঞানচর্চা রুদ্ধ করে দেয়, যদিও পূর্ববর্তীকালের বহু বিশিষ্ট বিজ্ঞানী, যেমন মারিন মারসেনে, রেনে দেকার্তে ও ব্লেইজ পাসকেল ক্যাথলিক বিশ্বাসে অটল ছিলেন। গ্যালিলিওর ব্যাপারটি জটিল। অবশ্য আমি এর সকল রাজনৈতিক দিক নিয়ে আলোচনা করতে চাই না। একটা সত্য উদ্ভাসিত হয়েছে, আমাদের কাহিনীর জন্যে যা গুরুত্বপূর্ণ: রোমান ক্যার্থলিক চার্চ স্রষ্টা ঈশ্বরের বিশ্বাসকে বিপদাপন্ন করেছে বলে হেলিওসেন্ট্রিক তত্ত্বের নিন্দা করেনি, করেছে এর সঙ্গে ঐশী গ্রন্থের বাণী মেলেনি বলেই।
গ্যালিলিওর বিচারের সময় বহু প্রটেস্ট্যান্টকে অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছিল ব্যাপারটা। লুথার বা কালভিন কেউই কোপার্নিকাসের নিন্দা করেননি, কিন্তু লুথারের সহযোগী ফিলিপ মেলেঞ্চথন (১৪৯৭-১৫৬০) সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর প্রদক্ষিণের ধারণা বাতিল করে দেন, কেননা এটা বাইবেলের নির্দিষ্ট কয়েকটা অনুচ্ছেদ বিরোধী। এটা প্রোটেস্ট্যান্টদের ব্যাপার ছিল না। কাউন্সিল অভ ট্রেন্টের পর ক্যাথলিকদের মাঝে নিজস্ব ঐশীগ্রন্থ সেইন্ট জেরোম অনূদিত বাইবেলের লাতিন ভাষ্য দ্য ভালগেট নিয়ে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছিল। ১৫৭৬ সালে স্প্যানিশ ইনকিউজিটর লিয়ন অভ ক্যাস্ট্রোর ভাষায়: ‘দ্য ভালগেটের লাতিন সংস্করণের সঙ্গে দ্বিমত পোষণকারী কোনও কিছু সামান্য সময়, কিংবা সামান্য সিদ্ধান্ত, ক্ষুদ্র বিধি, কোনও অভিব্যক্তি প্রকাশক শব্দ, কোনও শব্দাংশ বা কোন কিছু পরিবর্তন করা যাবে না।৪৭ অতীতে, আমরা যেনম দেখেছি, কোনও কোনও যুক্তিবাদী ও অতিন্দ্রীয়বাদী প্রতীকী ব্যাখ্যার পক্ষে বাইবেল ও কোরানের আক্ষরিক পাঠ হতে স্বেচ্ছায় সরে এসেছিল। এবার প্রটেস্ট্যান্ট ও ক্যাথলিকরা ঐশীগ্রন্থের পুরোপুরি আক্ষরিক অর্থের ওপর বিশ্বাস স্থাপন শুরু করেছিল। গ্যালিলিও ও কোপার্নিকাসের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হয়তো ইসরায়েলি, সুফী, কাব্বালিস্ট বা হেসিচ্যাস্টদের অস্বস্তিত্বে ফেলত না, কিন্তু নতুন আক্ষরিক অর্থকে আলিঙ্গনকারী ক্যাথলিক ও প্রটেস্ট্যান্টদের জন্যে সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরার তত্ত্বটি কীভাবে বাইবেলের পঙক্তির সঙ্গে খাপ খাবে: পৃথিবীও দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ, সুতরাং একে নড়ানো যাবে না,’ ‘সূর্য উদিত হয়, সূর্য অস্তমিত হয়, এর উদিত হওয়ার নির্দিষ্ট স্থান রয়েছে।’ ‘চন্দ্রকে তিনি ঋতু চক্রের জন্যে নিযুক্ত করেছেন; সূর্য জানে যে সে অস্তগামী হচ্ছে? গ্যালিলিওর কিছু কিছু মন্তব্যের কারণে চার্চের অধিকর্তারা দারুণ বিব্রত ছিলেন। যদি, তিনি যেমন বলেছেন, চাঁদে যদি মানুষ থাকে, তাহলে তারা আদমের বংশধর হবে কী করে, কীভাবেই বা তারা নোয়াহর আর্ক থেকে অবতরণ করেছিল? পৃথিবীর ঘূর্ণনের তত্ত্বের সঙ্গে ক্রাইস্টের স্বর্গারোহনের ঘটনার খাপ খাবে কীভাবে? ঐশীগ্রন্থে বলা হয়েছে স্বর্গসমূহ ও পৃথিবী মানুষের উপকারের জন্যেই সৃষ্টি করা হয়েছে। সেটা কীভাবে সম্ভব, যদি গ্যালিলিও যেমন দাবি করেছেন, পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণকারী অন্যান্য গ্রহগুলোর মতো একটা গ্রহ হয়ে থাকে? স্বর্গ ও নরককে বাস্তব স্থান হিসাবে দেখা হতো, কোপার্নিকান ব্যবস্থায় যা নির্দিষ্ট করা কঠিন ছিল। যেমন নরক একেবারে পৃথিবীর কেন্দ্রে অবস্থিত বলে ব্যাপক বিশ্বাস ছিল, দান্তে যেখানে দেখিয়েছিলেন। জেসুইট পণ্ডিত কার্ডিনাল রবার্ট বারমাইনের সদ্য প্রতিষ্ঠিত কংগ্রেনেশন ফর দ্য প্রপাগেশন অভ ফেইথ গ্যালিলিওর বিষয়ে পরামর্শ করেছিলেন, তিনিও প্রচলিত ধারণার পক্ষাবলম্বন করেছেন: নরক কবর হতে আলাদা ভূগর্ভস্থ একটা জায়গা। উপসংহারে তিনি বলেছিলেন যে, নিশ্চয়ই পৃথিবীর কেন্দ্রে এর অবস্থান। স্বাভাবিক যুক্তির ভিত্তিতে চূড়ান্ত যুক্তি উপস্থাপন করেছিলেন তিনি।
শেষটি হচ্ছে স্বাভাবিক যুক্তি। এখানে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই যে দূরাত্মা ও পাপিষ্ঠদের অবস্থান দেবদূত ও আশীর্বাদপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের হতে যতটা সম্ভব দূরে হবে। আশীর্বাদপ্রাপ্তদের আবাস হবে (আমাদের প্রতিপক্ষ যা স্বীকার করেন) স্বর্গ; সুতরাং, পৃথিবীর কেন্দ্র ছাড়া স্বর্গের চেয়ে দূরবর্তী স্থান আর কিছু হতে পারে না।
