তাহলে পরস্পরের বিরুদ্ধে নাস্তিক্যবাদের অভিযোগ তুলে কী বোঝাতে চাইত লোকে? ফরাসি বৈজ্ঞানিক মারিন মার্সেনে (১৫৮৮-১৬৪৮) ফ্রান্সিস্কান রীতির গোঁড়া সদস্যও ছিলেন, তিনি ঘোষণা করেছিলেন, কেবল প্যারিসেই প্রায় ৫০,০০০ হাজার নাস্তিক রয়েছে। কিন্তু তাঁর উল্লিখিত অধিকাংশ নাস্তিক’ই ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিল। এভাবে মাইকেল মন্টাগের বন্ধু পীয়েরে কারিন তাঁর নিবন্ধ লেস এয়েস ভেরিতেস (১৫৮৯)-এ ক্যাথলিসিজমের পক্ষে সাফাই গেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর প্রধান রচনা দে লা গোসি-তে তিনি যুক্তির অসারতার ওপর জোর দিয়ে দাবি করেছিলেন যে, মানুষ কেবল বিশ্বাস দিয়েই ঈশ্বরের কাছে পৌঁছতে পারে। মারসেনে এর বিরোধিতা করেন এবং একে নাস্তিক্যবাদের সমার্থক হিসাবে দেখেন। আরেকজন ‘অবিশ্বাসী’র নিন্দা করেছিলেন তিনি, তাঁর নাম ইতালিয় যুক্তিবাদি জিয়ার্দানো ব্রুনো (১৫৪৮ ১৬০০); যদিও ব্রুনো আত্মা এবং বিশ্ব জগতের আদি ও অন্ত স্টোয়িক ধরনের ঈশ্বরে বিশ্বাস করতেন। মারসেনে এদের দুজনকেই নাস্তিক আখ্যা দিয়েছিলেন, কারণ ঈশ্বর সংক্রান্ত মতবাদে তাঁদের সঙ্গে তিনি দ্বিমত পোষণ করেছেন, তারা পরম সত্তার অস্তিত্ব অস্বীকার করেছিলেন বলে নয়। অনেকটা একইভাবে রোমান সাম্রাজ্যের পৌত্তলিকরা ইহুদি ও ক্রিশ্চানদের নাস্তিক বলেছে, কারণ ঈশ্বর সম্পর্কে তাদের নিজস্ব ধারণার সঙ্গে তাঁদের ধারণার মিল ছিল না। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে ‘নাস্তিক’ শব্দটি কেবল যুক্তি হিসেবেই তোলা ছিল। প্রকৃতপক্ষে, আপনার যে কোনও শত্রুকেই তখন অনায়াসে ‘নাস্তি ক’ বলে গাল দেওয়া যেত, ঠিক যেমন উনবিংশ শতাব্দীর শেষে ও বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে লোকজনকে ‘অ্যানারক্রিস্ট’ বা ‘কমিউনিস্ট’ তকমা এঁটে দেয়া হয়েছে।
সংস্কারের পর মানুষ নতুনভাবে খৃস্ট ধর্ম সম্পর্কে উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠেছিল। ডাইনী কিংবা বলা যায় অ্যানারকিস্ট বা কমিউনিস্ট’-এর মতো। নাস্তিক’ কথাটি এক সুপ্ত উদ্বেগের অভিক্ষেপ। এটা বিশ্বাস সম্পর্কে এক গোপন উদ্বেগ ফুটিয়ে তুলেছে এবং স্রষ্টাভীরুদের মনে ভয় জাগিয়ে সঙ্কাজে উৎসাহ যোগানোর একটা প্রচেষ্টা ছিল । লজ অভ একলেসিয়াস্টিক্যাল-এ অ্যাংলিক্যান ধর্মবিদ রিচার্ড হকার (১৫৫৪-১৬০০) তখন দু’ধরনের নাস্তিকের অস্তিত্ব দাবি করেন: একটা ছোট দল ঈশ্বরে বিশ্বাস করত না এবং অপর একটি বড় গোষ্ঠী এমনভাবে জীবনযাপন করত যেন ঈশ্বরের কোনও অস্তিত্ব নেই। মানুষ এ দুটোর মধ্যে পার্থক্য টানতে ভুলে যায় এবং দ্বিতীয়টি অর্থাৎ বাস্তব ভিত্তিক নাস্তিকতার দিকে ঝুঁকে পড়ে। এভাবে দ্য থিয়েটার অভ গড়’স জাজমেন্ট (১৫৯৭) টমাস বেয়ার্ডের কাল্পনিক নাস্তিক ঈশ্বরের ক্ষমতা, আত্মার অমরত্ব ও পরকালের জীবনকে অস্বীকার করে, কিন্তু দৃশ্যতঃ ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকার করেনি। জন উইংফিল্ড তার অ্যাথিজম ক্লোজড অ্যান্ড ওপেন অ্যানাটোমাইযড (১৬৩৪) শীর্ষক গবেষণামূলক নিবন্ধে দাবি করেছেন: ‘কপটাচারী একজন নাস্তিক; দুরাত্মা ধরনের মানুষ প্রকাশ্যে নাস্তিক; নিরাপদ, বেপরোয়া ও অহংকারী চরিত্র নাস্তিক: যাকে শিক্ষা দেওয়া বা সংস্কার করা যাবে না সে-ই নাস্তিক। নিউ ফাউন্ডল্যান্ডের উপনিবেশের সহায়তা দানকারী ওয়ালশ কবি উইলিয়াম ফনের (১৫৭৭-১৬৪১) চোখে যারা খাজনা আদায় করে ও সাধারণ মানুষকে বন্দি করে তারা সন্দেহাতীতভাবে নাস্তিক। ইংরেজ নাট্যকার টমাস ন্যাশে’ (১৫৬৭-১৬০১) ঘোষণা করেছেন যে, উচ্চাভিলাষী, লোভী, অতিভোজী, আত্মশ্লাঘা পোষণকারী ও পতিত, এরা সবাই নাস্তিক।
‘নাস্তিক’ শব্দটি ছিল অপমানকর। নিজেকে নাস্তিক দাবি করার কথা স্বপ্নেও কল্পনা করত না কেউ। তখনও গর্বের সঙ্গে বহন করার মতো ব্যাজে পরিণত হয়নি এটা। তা সত্ত্বেও সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে পাশ্চাত্যের অধিবাসীদের মাঝে এমন একটা মনোভাব বা দৃষ্টিভঙ্গি জেগে উঠেছিল যা ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকারের ব্যাপারটি কেবল সম্ভবই করে তোলেনি বরং কাক্ষিত করেছে। বিজ্ঞানে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থন লাভ করেছে তারা। তা সত্ত্বেও সংস্কারবাদীদের ঈশ্বর যেন নতুন বিজ্ঞানের প্রতি প্রসন্ন ছিলেন। ঈশ্বরের পরম সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী ছিলেন বলে লুথার ও কালভিন দুজনই প্রকৃতির নিজস্ব সহজাত ক্ষমতা থাকার অ্যারিস্টটলিয় ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তারা বিশ্বাস করতেন যে, প্রকৃতি ক্রিশ্চানদের মতোই নিষ্ক্রিয়, যার কেবল ঈশ্বরের কাছ থেকে উপহার হিসাবে মুক্তিকে গ্রহণ করা ছাড়া আর কিছুই করার ক্ষমতা নেই। কালভিন স্পষ্ট ভাষাতেই প্রকৃতি নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রশংসা করেছেন, কেননা প্রকৃতিতে অদৃশ্য ঈশ্বর নিজেকে তুলে ধরেছেন। বিজ্ঞান ও ঐশীগ্রন্থের মাঝে কোনও রকম বিরোধ থাকতে পারে নাঃ বাইবেলে ঈশ্বর আমাদের মানবীয় সীমাবদ্ধতার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়েছিলেন, ঠিক যেমন করে একজন সুবক্তা তার চিন্তা ও বক্তব্যকে দর্শকদের ক্ষমতা
অনুযায়ী সমন্বিত করে নেন। সৃষ্টির বিবরণ, কালভিন বিশ্বাস করতেন, বালবুটিভের (শিশুসুলভ কথাবার্তা) একটা নজীর, যেখানে জটিল ও রহস্যময় বিভিন্ন প্রক্রিয়াকে সাধারণ মানুষের মানসিকতায় ঠাই দেওয়া হয়েছে যাতে ঈশ্বরের উপর সবার বিশ্বাস বজায় থাকে। একে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করা যাবে না ।
