পিউরিটানদের মতো জেসুইটরাও ঈশ্বরকে এক গতিময় শক্তি হিসাবে অনুভব করেছে যা সর্বোত্তম অবস্থায় তাদের আত্মবিশ্বাস ও শক্তিতে পুর্ণ করে দিতে পারত। পিউরিটানরা আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে নিউ ইংল্যান্ডে বসতি করার সময় জেসুইট মিশনাররা সারা বিশ্ব ঘুরে বেরিয়েছে: ফ্রান্সিস বাভিয়র (১৫০৬ ১৫৫২) ভারত ও জাপানে খৃস্টধর্ম প্রচার করেন, ম্যাত্তিও রিচি (১৫৫২ ১৬১০) গস্পেল পৌঁছে দিয়েছেন চীনে এবং রোবার্ত দে নবিলি (১৫৭৭ ১৬৫৬) নিয়ে গেছেন ভারতে। আবার পিউরিটানদের মতোই জেসুইটরা প্রায়শঃই উৎসাহী বিজ্ঞানচর্চাকারী ছিল এবং এমন মত প্রকাশ করা হয় যে, রয়াল সোসায়েটি অভ লন্ডন বা অ্যাকাডেমিয়া দেল সিমেন দো নয়, বরং সোসায়েটি অভ জেসাসই ছিল বিশ্বের প্রথম বৈজ্ঞানিক গোষ্ঠী।
তা সত্ত্বেও ক্যাথলিকরা যেন পিউরিটানদের মতোই অস্বস্তিতে ছিল। যেমন ইগনেসিয়াশ নিজেকে এমন মহাপাপী হিসাবে দেখতেন যে, তিনি প্রার্থনা করতেন মৃত্যুর পর যেন লাশ একটা গোবরের স্তূপে ফেলে রাখা হয় যাতে পাখী আর কুকুর তা খেয়ে শেষ করে ফেলতে পারে। চিকিৎসকরা তাকে এই বলে সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, প্রার্থনা সভায় এমন প্রবলভাবে কান্না চালিয়ে গেলে তাঁর দৃষ্টিশক্তি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। নারীদের জন্যে নগ্নপদ সন্ন্যাসীনি কারমেলাইটদের মঠজীবনাচারকে সংস্কারকারী তেরেসা অভ আভিলা নিজের জন্যে নরকে রক্ষিত এক ভয়ঙ্কর জায়গা দর্শন করেছিলেন। এই পর্যায়ের সাধুরা যেন ঈশ্বর ও জগৎসংসারকে সমন্বয়ের অতীত বিপরীতমুখী শক্তি হিসাবে দেখেছেন: ত্রাণ লাভের জন্যে জগৎ ও সকল স্বাভাবিক মায়া ত্যাগ করতে হবে। দান-খয়রাত আর সৎকর্ম করে জীবনযাপনকারী ভিনসেন্ট দ্য পল প্রার্থনা করেছেন, ঈশ্বর যেন বাবা-মায়ের প্রতি তার ভালোবাসা কেড়ে নেন; ভিজিটেশন বৃত্তির প্রতিষ্ঠাতার জেন ফ্রান্সিস দে শ্যানতাল আপন ছেলের নিথর দেহ টপকে কনভেন্টের পথে যাত্রা করেছিলেন; মাকে বাধা দেওয়ার জন্যে দরজার চৌকাঠে শুয়ে পড়েছিল সে। রেনেসাঁ যেখানে স্বর্গ-মর্তের মিলনের প্রয়াস পেয়েছে, ক্যাথলিক সংস্কার সেখানে এদের একেবারে আলাদা করার চেষ্টা চালিয়েছে। ঈশ্বর পাশ্চাত্যের সংস্কৃত ক্রিশ্চানদের দক্ষ ও ক্ষমতাশালী করেছিলেন হয়তো, কিন্তু তিনি তাদের সুখী করেননি। উভয়পক্ষের জন্যেই সংস্কারের সময়টি একটা মহাআতঙ্কের পর্যায় ছিল; অতীতের প্রতি প্রবল নিন্দা, তিক্ত ভৎর্সনা ও অভিশাপের প্রাবল্য, ধর্মদ্রোহ ও মতবাদগত বিভক্তির আতঙ্ক, পাপ সম্পর্কে অতিক্রিয়াশীল সচেতনতা এবং নরক সম্পর্কিত বিকার বিরাজ করছিল। ১৬৪০ সালে ডাচ ক্যাথলিক কর্নেলিয়াস জানসেনের বিতর্কিত গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়, যাতে নব্য কালভিনিজমের মতো এক ভীতিকর ঈশ্বরের কথা বলা হয়েছে যিনি নির্বাচিতদের বাদ দিয়ে আর সবার জন্যে অনন্ত নরকবাস নির্ধারিত করে রেখেছেন। স্বাভাবিকভাবেই বইটি ‘ঈশ্বরের কৃপার অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতার মতবাদ শিক্ষা দিয়েছে যা সত্য এবং সংস্কার মতবাদের অনুসারী”*২ আবিষ্কার করে কালভিনিস্টরা এ বইয়ের প্রশংসা করেছে।
ইউরোপের এই ব্যাপক আতঙ্ক আর হতাশাকে আমরা কীভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি? চরম উদ্বেগের একটা কাল ছিল এটা: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভরশীল এক নতুন ধরনের সমাজের পত্তন ঘটতে যাচ্ছিল যা কিনা অচিরেই গোটা বিশ্ব অধিকার করে নেবে। তা সত্ত্বেও ঈশ্বর যেন এসব আতঙ্ক দূর করে সেফার্দিক ইহুদিরা ইসাক লুরিয়ার মিথে যেমন সান্ত্বনার খোঁজ পেয়েছিল সে রকম সান্ত্বনা দিতে পারছিলেন না। পাশ্চাত্যের ক্রিশ্চানরা যেন সবসময়ই ঈশ্বরকে বাড়তি চাপ হিসাবে দেখে এসেছে ও এই ধর্মীয় উদ্বেগ দূর করার প্রয়াস পাওয়া সংস্কারবাদীরা যেন শেষ পর্যন্ত পুরো ব্যাপারটাকে আরও জটিল করে তুলেছে। লক্ষ লক্ষ মানুষের চিরন্তন নরকবাস নির্ধারিত করে রাখা পাশ্চাত্যের ঈশ্বর যেন তারতুলিয়ান বা অগাস্তিনের সবচেয়ে বিমর্ষতম কল্পনার করা উপাস্যের চেয়েও কর্কশ ও রূঢ় হয়ে উঠেছিলেন। এমনকি হতে পারে যে, ঈশ্বর সম্পর্কে সম্পূর্ণ কল্পনানির্ভর মিথলজি ও অতিন্দ্রীয়বাদ আক্ষরিক অর্থে ব্যাখ্যা করা সম্ভব এমন একজন ঈশ্বরের মিথগুলোর চেয়ে মানুষকে দুঃখ কষ্ট অতিক্রমে অধিকতর কার্যকরভাবে সাহস যোগাতে সক্ষম?
প্রকৃতপক্ষেই যোড়শ শতাব্দীর শেষ নাগাদ ইউরোপের অনেকেই অনুভব করতে শুরু করেছিল যে, ধর্মের মারাত্মক অমর্যাদা করা হয়েছে। ক্যাথলিকদের হাতে প্রটেস্ট্যান্ট ও প্রটেস্ট্যান্টদের হাতে ক্যাথলিকদের হত্যায় বিতৃষ্ণ হয়ে। পড়েছিল তারা। সত্য বা মিথ্যা প্রমাণ করা সম্ভব নয় এমন কিছু ধারণা রক্ষা করতে গিয়ে হাজার হাজার লোক শহীদ হয়েছিল। মুক্তি লাভের জন্যে অপরিহার্য বিবেচিত অসংখ্য মতবাদ প্রচারকারী গোষ্ঠীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছিল। ধর্মতাত্ত্বিক পছন্দের সংখ্যা অনেক বেড়ে গিয়েছিল; অসংখ্য ধর্মীয় ব্যাখ্যার ছড়াছড়ি দেখে অনেকেই হতবিহ্বল ও অসহায় বোধ করছিল। কেউ কেউ হয়তো বিশ্বাস স্থাপনে আগের চেয়ে কঠিন বলেও ভেবেছে। সুতরাং, এটা তাৎপর্যপূর্ণ যে, ইতিহাসের এই পর্যায়ে এসে পাশ্চাত্যের ঈশ্বরের ইতিহাসে মানুষ নাস্তিক’ আবিষ্কার করতে শুরু করে, যাদের সংখ্যা ঈশ্বরের পুরোনো শত্রু এবং শয়তানের মিত্র ‘ডাইনীদের’ সমানই বলা যায়। বলা হয়ে থাকে, এই নাস্তিকরা’ ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকার করেছে এবং নিজেদের বিশ্বাসে লোকদের আকর্ষণ করে সমাজের বাঁধন শিথিল করে দিচ্ছিল। তা সত্ত্বেও আজকের পৃথিবীতে আমরা যেমন নাস্তিক্যবাদ দেখি তেমন পূর্ণাঙ্গ নাস্তিকতা তখন ছিল অসম্ভব। লুসিয়েন ফেবভ্রে তার দ্য প্রবলেম অভ আনবিলিফ ইন দ্য সিক্সটিন্থ সেঞ্চুরীতে যেমন দেখিয়েছেন, এই সময় ঈশ্বরের অস্তিত্ব পুরোপুরি অস্বীকার করার ধারণাগত অসুবিধা ছিল পাহাড়সম। জন্ম থেকে শুরু করে মৃত্যু এবং দীক্ষা, চার্চইয়ার্ডে শেষকৃত্য পর্যন্ত নারী পুরুষের জীবনের সকল পর্যায়ে ছিল ধর্মের প্রাধান্য। দৈনন্দিন প্রতিটি কাজ, যার শুরু হতো গির্জার ঘণ্টা-ধ্বনির মাধ্যমে বিশ্বাসীকে প্রার্থনায় যোগ দেওয়ার আহবান জানানোর মাধ্যমে, ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রথায় ছিল পরিপূর্ণ ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রাধান্য ছিল এগুলোর-এমনকি বিভিন্ন গোষ্ঠী ও বিশ্ববিদ্যালয়ও ছিল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। ফেবদ্রে যেমন তুলে ধরেছেন, ঈশ্বর এবং ধর্ম এমন। ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত ছিল যে, এই পর্যায়ে কেউ একথা বলার চিন্তা করেনিঃ ‘সুতরাং আমাদের জীবন, আমাদের গোটা জীবন, খৃস্ট ধর্ম শাসন। করছে। আমাদের জীবনের কত সামান্য অংশ ইতিমধ্যে সেকুলার হয়েছে সেই তুলনায় আর সবকিছু ধর্ম দিয়ে পরিচালিত, নিয়ন্ত্রিত ও সংগঠিত হচ্ছে! ধর্মের প্রকৃতি বা ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো প্রয়োজনীয় বস্তুনিষ্ঠতা অর্জনকারী ব্যতিক্রমী কোনও ব্যক্তির অস্তিত্ব থাকলেও তার পক্ষে তখনবার বিজ্ঞান বা দর্শন হতে কোনও রকম সাহায্য বা সমর্থন পাওয়া সম্ভব ছিল না । এক গুচ্ছ বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা কিছু সংক সামঞ্জস্যপূর্ণ যুক্তি অস্তিত্ব লাভ না করা পর্যন্ত কারও পক্ষে এমন একজন ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকার করার সম্ভব ছিল না, যার ধর্ম ইউরোপের নৈতিক, আবেগজাত, সৌন্দর্য সংক্রান্ত এবং রাজনৈতিক জীবনকে আকৃতি দিয়েছে ও নিয়ন্ত্রণ করেছে। এই সমর্থন ছাড়া এ জাতীয় অস্বীকৃতি কেবল ব্যক্তিগত ঝোঁক বা চকিত খেয়াল মাত্র যা গভীর বিবেচনার যোগ্যতা রাখে। ফেবদ্রে যেমন দেখিয়েছেন, ফরাসি ভাষার মতো স্বদেশী ভাষার শব্দ ভাণ্ডারে বা বাক্য গঠনে সংশয়বাদের প্রতিশব্দ ছিল না। পরম, আপেক্ষিক,’ ধারণা’ ও ‘সংজ্ঞা’র মতো শব্দগুলোর তখনও চল হয়নি। আমাদের আরও মনে রাখতে হবে যে, বিশ্বের কোনও সমাজই তখনও জীবনের এক অপরিহার্য অংশ হিসাবে ধরে নেওয়া ধর্মকে বাদ দেয়নি। অষ্টাদশ শতাব্দীর একেবারে শেষ পর্যায়ে আসার পরেই কেবল মুষ্টিমেয় কয়েকজন ইউরোপিয়র পক্ষে ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকার করা সম্ভব হয়েছিল।
