কালভিনের ধারণার ওপর ভিত্তি করে পিউরিটানরা ধর্মীয় বোধ গড়ে তুলেছিল এবং ঈশ্বরকে স্পষ্ট এক সংগ্রাম হিসাবে আবিষ্কার করেছে। তিনি যেন সুখ বা সমবেদনায় তাদের সিক্ত করেননি। তাদের জার্নাল ও আত্মজীবনী দেখায়, পূর্ব নির্ধারিত নিয়তির ব্যাপারে বিকারগ্রস্থ হয়ে পড়েছিল তারা; উদ্ধার মিলবে না ভেবে শঙ্কিত ছিল। ধর্মান্তরকরণ এক কেন্দ্রীয় বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। ভয়াবহ নিপীড়নমূলক নাটক, যেখানে ‘পাপী’ ও তার আধ্যাত্মিক গুরু আত্মার জন্যে ‘সংগ্রামে লিপ্ত। প্রায়শ্চিত্তকারীকে প্রায়শঃ মারাত্মক অপমানের মুখোমুখি বা ঈশ্বরের কৃপার জন্যে প্রকৃত হতাশার বোধে জর্জরিত হতে হতো, যতক্ষণ না ঈশ্বরের ওপর সামগ্রিক নির্ভরতার বিষয়টি তার উপলব্ধিতে আসছে। ধর্মান্তকরণ প্রায়ই মনস্তাত্ত্বিক অ্যাব্রিঅ্যাকশন উপস্থাপিত করত-চরম হতাশা হতে মহাউল্লাসের পর্যায়ে চরম পরিবর্তন। নরক ও শাস্তির প্রতি মাত্রাতিরিক্ত জোরের সঙ্গে আত্মসমীক্ষার বাড়াবাড়ি যোগ হওয়ায় অনেকের মাঝেই বিষণ্ণতার রোগ দেখা দিয়েছিল: আত্মহত্যা যেন সাধারণ প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল । পিউরিটানরা এর জন্যে শয়তানকে দায়ী করেছে যে কিনা তাদের জীবনে ঈশ্বরের মতোই ক্ষমতাবান মনে হয়েছে। পিউরিটানিজমের ইতিবাচক দিকও ছিল: কাজের ক্ষেত্রে মানুষকে এটা গৌরব এনে দিয়েছিল: এর আগে পর্যন্ত যাকে দাসত্ব হিসাবে দেখা হতো এবার সেটাই এক ‘আহবান’ বিবেচিত হয়েছিল। এর জরুরি প্রলয়বাদী আধ্যাত্মিকতা কাউকে কাউকে নয়া বিশ্বে উপনিবেশে স্থাপনে অনুপ্রাণিত করেছে। কিন্তু এর সবচেয়ে খারাপ দিক ছিল, পিউরিটান ঈশ্বর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছেন ও যারা মনোনীত নয় তাদের প্রতি কঠোর অসহিষ্ণুতার অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন।
প্রটেস্ট্যান্ট ও ক্যাথলিকরা পরস্পরকে এখন প্রতিপক্ষ হিসাবে দেখে, কিন্তু ঈশ্বর সম্পর্কে তাদের ধারণা ও অনুভূতিতে আশ্চর্যরকম মিল রয়েছে। কাউন্সিল অভ ট্রেন্টের (১৫৪৫-৬১) পর ক্যাথলিক ধর্মতাত্ত্বিকরাও নিও-অ্যারিস্টটলিয়ান ধর্মতত্ত্ব গ্রহণ করেছিলেন। ঈশ্বরের গবেষণাকে যা প্রাকৃতিক বিজ্ঞান আবিষ্কারের পর্যায়ে নামিয়ে এনেছিল । সোসায়েটি অভ জেসাসের প্রতিষ্ঠাতা লয়োলার ইগনেশিয়াস (১৪৯১-১৫৫৬)-এর মতো সংস্কারকরা প্রত্যক্ষ ঈশ্বরের অভিজ্ঞতা লাভের প্রটেন্ট্যান্ট গুরুত্ব ও প্রত্যাদেশের উপলব্ধি ও একেবারে আপন করে নেওয়ার ব্যাপারটিকে সমর্থন করেছেন। প্রথম দিকে জেসুইটদের জন্যে বিকশিত আধ্যাত্মিক অনুশীলনের (স্পিরিচুয়াল এক্সারসাইসেজ)-এর মূল। লক্ষ্য ছিল ধর্মান্তকরণের প্রেরণা জাগানো, যা কিনা যুগপৎ যন্ত্রণাময় ও আনন্দপূর্ণ অভিজ্ঞতা হতে পারে। আত্মমূল্যায়ন ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপর গুরুত্বদানকারী নির্দেশকের সঙ্গে একজন একজন করে ত্রিশদিন দীর্ঘ এই সাধনা পিউরিটান আধ্যাত্মিকতার চেয়ে ভিন্ন ছিল না। অনুশীলনগুলো অতিন্দ্রীয়বাদের পদ্ধতিগত ও খুব কার্যকর সাধনা তুলে ধরে। অতিন্দ্রীয়বাদীরা প্রায়শঃই এমন সব অনুশীলনের প্রয়োগ করেছে যার সঙ্গে বর্তমান কালের সাইকোঅ্যানালিস্টদের কৌশলের মিল রয়েছে। সুতরাং, এটা কৌতূহলোদ্দীপক যে অনুশীলনগুলো আজও ক্যাথলিক ও অ্যাংলিক্যানরা এক ধরনের বিকল্প চিকিৎসা দেওয়ার উদ্দেশ্যে অনুসরণ করে থাকে।
ইগনেশিয়াস অবশ্য ভুয়া অতিন্দ্রীয়বাদের বিপদ সম্পর্কে সজাগ ছিলেন। লুরিয়ার মতো অবিচলতা ও আনন্দের প্রতি জোর দিয়েছিলেন তিনি, তাঁর রুলস অভ দ্য ডিসারনমেন্ট অভ স্পিরিটস-এ অনুসারীদের চরম আবেগের বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন, যা কোনও কোনও পিউরিটানকে সর্বনাশের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। অনুশীলনকারী সম্ভাব্য যেসব আবেগের মুখোমুখি হতে পারে সেগুলোকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করেছিলেন তিনিঃ ধ্যানের সময় কোনগুলো ঈশ্বরের কাছ থেকে আসবে আর কোনগুলো আসবে শয়তানের তরফ থেকে। ঈশ্বর অনুভূত হবেন শান্তি, আনন্দ ও মনের চাঙা ভাব’ হিসাবে, অন্যদিকে বিষণ্ণতা, উদ্বিগ্ন ভাব ও বিক্ষিপ্ততা আসে ‘অশুভ আত্মা’ হতে। ইগনেসিয়াশের নিজস্ব ঈশ্বর অনুভূতি ছিল তীব্র: এটা তাঁকে আনন্দে কাঁদাত। একবার তিনি বলেছিলেন, এর অনুপস্থিতিতে তার পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব হতো না। কিন্তু আবেগের তীব্র ওঠানামাকে অবিশ্বাস করতেন তিনি; নতুন সত্তায় যাত্রায় শৃঙ্খলার প্রয়োজনের ওপর জোর দিয়েছিলেন। কালভিনের মতো খৃস্টধর্মকে তিনি ক্রাইস্টের মুখোমুখি দাঁড়ানো বলে বিবেচনা করেছিলেন, এক্সারসাইজ-এ যা উল্লেখ করেছেন: যার পরিণতি ছিল ‘ভালোবাসার জন্যে ধ্যান, যা সবকিছুকে ঈশ্বরের মহানুভবতার সৃষ্টি এবং এর প্রতিফলন হিসাবে দেখে। ইগনেসিয়াশের চোখে গোটা জগই ঈশ্বরে পরিপূর্ণ। অনুশীলন প্রক্রিয়া চলাকালে তাঁর অনুসারীরা স্মরণ করত:
আমরা প্রায়ই দেখেছি একেবারে তুচ্ছাতিতুচ্ছ জিনিসও কীভাবে তাঁর আত্মাকে ঈশ্বর পানে ধাবিত করতে পারত, যিনি এমনকি তুচ্ছ বস্তুতেও সুমহান। ছোট একটা গাছ, পাতা, ফুল বা ফল, নগণ্য একটা কেঁচো বা ছোট্ট একটা জানোয়ার দেখেই ইগনেসিয়াশ মুক্ত হয়ে স্বর্গে উধ্বোরোহণ করতে পারতেন এবং পৌঁছে যেতেন বোধের অতীত জগতে।
