মূলত পূর্বনির্ধারিত নিয়তি বিশ্বাসের জন্যে কালভিনকে স্মরণ করা হয়ে থাকে, কিন্তু আসলে এই বিষয়টি তাঁর চিন্তাধারার কেন্দ্রবিন্দু ছিল না; তার মৃত্যুর আগে পর্যন্ত এটা কালভিনিজমের জন্যে অপরিহার্য হয়ে ওঠেনি। ঈশ্বরের সর্বশক্তিমানতা ও সর্বজ্ঞতার সঙ্গে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার সমন্বয় সাধনের সমস্যাটি ঈশ্বরের ওপর নরত্ব আরোপের ফলে দেখা দিয়েছিল। আমরা দেখেছি, নবম শতাব্দীতে মুসলিমরা এই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল; তারা কোনও যৌক্তিক সমাধান খুঁজে পায়নি; পরিবর্তে তারা ঈশ্বরের রহস্য ও দুর্বোধ্যতার ওপর জোর দিয়েছে। এটি গ্রিক অর্থডক্স ক্রিশ্চানদের জন্য কখনও সমস্যা হয়ে দেখা দেয়নি, এরা প্যারাডক্সের অনুরাগী ছিল; একে আলো ও উদ্দীপনার উৎস হিসাবে দেখা গেছে; কিন্তু পশ্চিমে এটা বিতর্কের বিষয়বস্তু ছিল, যেখানে ঈশ্বরের অধিকতর ব্যক্তিক ধারণা বজায় ছিল। মানুষ এমনভাবে ‘ঈশ্বরের ইচ্ছার কথা বলার চেষ্টা করত যেন তিনি কোনও মানবসত্তা; আমাদের মতোই সীমাবদ্ধতার অধীন ও জাগতিক কোনও শাসকের মতো আক্ষরিক অর্থে পৃথিবীকে শাসন করছেন। তা সত্ত্বেও ক্যাথলিক চার্চ ঈশ্বর হতভাগ্যদের চির নরক বাস স্থির করে রেখেছেন, এই ধারণার নিন্দা জানিয়েছিল। উদাহরণ স্বরূপ, অগাস্তিন পূর্ব নির্ধারিত নিয়তি’ কথাটিকে মনোনীতদের রক্ষা করার ক্ষেত্রে ঈশ্বরের সিদ্ধান্ত বোঝাতে প্রয়োগ করেছিলেন, কিন্তু হতভাগ্য কিছু আত্মার নরক বাস ঘটবে মানতে চাননি। যদিও তাঁর প্রতিপাদ্যের যৌক্তিক অনুসিদ্ধান্ত ছিল তাই। ইনস্টিটিউটে পূর্ব নির্ধারিত নিয়তি সম্পর্কে খুব বেশি আলোকপাত করেননি কালভিন । আমাদের দিকে যখন তাকাই, স্বীকার গেছেন তিনি, তখন সত্যি মনে হয় ঈশ্বর অন্যদের তুলনায় কিছু সংখ্যক লোককে বেশি সুবিধা দিয়েছেন। কেউ কেউ যখন স্পেলের প্রতি সাড়া দেয় তখন অন্যরা কেন নিস্পৃহ থাকে? ঈশ্বর কি তবে কোনও খামখেয়ালি বা অন্যায় আচরণ করছেন? কালভিন এটা অস্বীকার করেছেন: কাউকে পছন্দ বা প্রত্যাখ্যানের আপাতঃ চিত্রটি ঈশ্বরের রহস্যের নিদর্শন। এ সমস্যার কোনও যৌক্তিক সমাধান ছিল না, যেখানে বোঝায় যে ঈশ্বরের ভালোবাসা ও তার বিচার সমন্বয়ের অতীত। কিন্তু এটা ক্যালভিনকে খুব একটা বিচলিত করেনি; কেননা ডগমায় খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না তিনি।
কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর কালভিনিস্টদের’ যখন একদিকে লুথারান ও অন্যদিকে রোমান ক্যাথলিকদের কাছ থেকে আলাদা পরিচয় দেওয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল তখন জেনিভায় কালভিনের ডান হাত থিওদোরাস ব্যে (১৫১৯-১৬০৫) নেতৃত্ব হাতে তুলে নেন এবং পূর্ব নির্ধারিত নিয়তিবাদকে কালভিনিজম-এর মূল বিষয়ে পরিণত করেন। নিষ্ঠুর যুক্তির সাহায্যে তিনি প্যারাডক্সকে অপসারিত করেন । ঈশ্বর যেহেতু সর্বশক্তিমান, এতে বোঝা যায়, আপন ত্রাণ লাভের ক্ষেত্রে মানুষের কিছুই করার নেই। ঈশ্বর অপরিবর্তনীয় এবং তার বিধানমালা যথাযথ ও চিরন্তন: এভাবে তিনি অন্তহীনকাল হতেই কাউকে কাউকে উদ্ধার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং বাকী সবার জন্য নির্ধারিত করে রেখেছেন নরকবাস । এই অস্বস্তিকর মতবাদের ব্যাপারে কোনও কোনও কালভিনিস্ট প্রবল শঙ্কা বোধ করেছে। লো ক্যান্ট্রিজে জ্যাকব আরমিনাস যুক্তি দেখিয়েছেন যে, এটা বাজে ধর্মতত্ত্বের একটা নজীর, কেননা এখানে এমনভাবে ঈশ্বরের কথা বলা হয়েছে যেন তিনি সাধারণ কোনও মানুষ। কিন্তু কালভিনিস্টরা বিশ্বাস করত যে, আর দশটা বিষয়ের মতোই ঈশ্বর সম্পর্কেও বস্তুগত আলোচনা করা যায়। প্রটেস্ট্যান্ট ও ক্যাথলিকদের মতো তারাও এক নতুন অ্যারিস্টটলিজম গড়ে তুলছিল যেখানে যুক্তি ও মেটাফিজিক্সের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এটা সেইন্ট তোমাস আকুইনাসের অ্যারিস্টটলিজমের চেয়ে আলাদা ছিল, কেননা নব্য ধর্মতাত্ত্বিকরা অ্যারিস্টটলের যৌক্তিক পদ্ধতির ব্যাপারে আগ্রহী হলেও তার চিন্তার বিষয়বস্তুর প্রতি তেমন আগ্রহী ছিলেন না। তারা খৃস্টধর্মকে একটা সামঞ্জস্যপূর্ণ যৌক্তিক পদ্ধতি হিসাবে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন, যা পরিচিত নীতিমালা হতে সিলোজিস্টিক যুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বের করে আনা সম্ভব। অবশ্যই প্রবল স্ববিরোধী ছিল এটা, কারণ সংস্কারবাদীরা ঈশ্বর সম্পর্কে এ ধরনের যৌক্তিক আলোচনা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছিল। পরবর্তী সময়ে পূর্ব নির্ধারিত নিয়তির কালভিনিস্ট মতবাদ দেখিয়েছে যে, ঈশ্বরের স্ববিরোধিতা ও রহস্যময়তাকে কাব্য হিসাবে। বিবেচনা না করে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিন্তু ভীতিকর যুক্তির ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করতে গেলে কী অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে। প্রতীকীভাবে ব্যাখ্যা না করে বাইবেল একেবারে আক্ষরিক অর্থে ব্যাখ্যা করা হলে ঈশ্বর সম্পর্কে এর ধারণা অসম্ভবের। পর্যায়ে পর্যবসিত হয়ে থাকে। পৃথিবীর বুকে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনার জন্যে আক্ষরিক অর্থে দায়ী একজন উপাস্যকে কল্পনা করার সঙ্গে মারাত্মক স্ববিরোধিতা জড়িত। বাইবেলের ‘ঈশ্বর’ আর দুয়ে ও একক সত্তা থাকেন না, বরং নিষ্ঠুর ও স্বৈরাচারী শাসকে পরিণত হন। পূর্বনির্ধারিত নিয়তির মতবাদ এরকম ব্যক্তিক ঈশ্বরের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে।
