পূর্বেকার সুইস ধর্মতাত্ত্বিক হুলদ্রিচ যিউংগলি, (১৪৮৪-১৫৩১)-এর মতো কালভিন সেভাবে ডগমায় আগ্রহী ছিলেন নাঃ ধর্মের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়গুলো ছিল তাঁর বিবেচনার বিষয়। তিনি সরল ধার্মিকতার দিকে প্রত্যাবর্তন করতে চেয়েছেন, কিন্তু ট্রিনিটির অ-বাইবেলসুলভ উৎস সত্ত্বেও এই মতবাদ আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন। দ্য ইন্সটিটিউট অভ দ্য ক্রিশ্চান রিলিজিয়ন-এ তিনি যেমন লিখেছেন, “ঈশ্বর নিজেকে একক হিসাবে ঘোষণা দিয়েছেন, কিন্তু আমাদের সামনে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে তিনি তিনজন ব্যক্তি হিসাবে অস্তিত্ববান।৩১ ১৫৫৩ সালে ট্রিনিটি মানতে অস্বীকৃতি জানানোয় স্প্যানিশ ধর্মতাত্ত্বিক মাইকেল সারবেতাসকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করিয়েছিলেন কালভিন। ক্যাথলিক স্পেন ছেড়ে পালিয়ে যান সারবেতাস এবং কালভিনের জেনিভায় আশ্রয় নেন, তিনি অ্যাপল এবং চার্চের আদি পিতাদের ধর্মে ফিরে যাবার দাবি করেন, যারা কখনও এই অসাধারণ মতবাদের কথা শোনেননি। কিছুটা ন্যায়সঙ্গতভাবেই সাববেতাস যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে ইহুদি ঐশীগ্রন্থের কঠোর একেশ্বরবাদীতার বিরোধিতা করে এমন কিছুই নিউ টেস্টামেন্টে নেই। ট্রিনিটির মতবাদ মানব সৃষ্ট যা মানুষের মনকে প্রকৃত ক্রাইস্ট হতে সরিয়ে ত্রিরূপী ঈশ্বরকে আমাদের সামনে খাড়া করেছে।৩২ ইতালির দুজন। সংস্কারবাদী-জর্জিয়ো ব্ল্যানদ্ৰাতা (১৫১৫-১৫৮৮) ও ফস্তাস সোসিনাস (১৫৩৯-১৬০৪)-তার বিশ্বাসে সমর্থন যোগান। এঁরা দুজনই জেনিভায় পালিয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু সেখানে গিয়ে বুঝতে পারেন যে, তাদের ধ্যান ধারণা সুইস সংস্কারের পক্ষে বেশ রেডিক্যাল। তারা এমনকি প্রায়শ্চিত্ত সম্পর্কিত পশ্চিমের প্রচল ধারণাও মানতেন না। নারী-পুরুষ ক্রাইস্টের মৃত্যুর ফলে ন্যায্যতা পেয়েছে, এটা তারা বিশ্বাস করতেন না; বরং সেটা কেবল ঈশ্বরে তাদের বিশ্বাস বা আস্থার ফল। ক্রাইস্ট দ্য সেভিয়র গ্রন্থে সোসিনাস নাইসিয়ার তথাকথিত অর্থডক্সি প্রত্যাখ্যান করেছেন: ঈশ্বরের পুত্র’ কথাটি জেসাসের স্বর্গীয় রূপ সম্পর্কিত কোনও মন্তব্য নয়, বরং এখানে এটাই বোঝানো হয়েছে যে, ঈশ্বর তাকে বিশেষভাবে ভালোবেসেছিলেন। আমাদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার জন্যে প্রাণ দেননি তিনি, বরং শিক্ষক ছিলেন তিনি, আমাদের মুক্তির পথ দেখিয়ে দিয়েছেন এবং শিক্ষা দিয়েছেন।’ ট্রিনিটির মতবাদ সম্পর্কে বলা যায়, এটা একেবারেই ‘আজগুবী ব্যাপার, যুক্তি বিবর্জিত একটা কাল্পনিক গল্প যা বিশ্বাসীকে তিনজন আলাদা ঈশ্বরে বিশ্বাস স্থাপনে উৎসাহিত করে। সারবেতাসের মৃত্যুদণ্ডের পর ব্ল্যান্দ্রাতা ও সোসিনাস উভয়ই পোল্যান্ড ও ট্রান্সসিলভিনিয়ায় পালিয়ে যান, সঙ্গে নিয়ে যান তাঁদের ‘ইউনিটারিয়ান’ ধর্ম ।
যিউইংগলি ও কালভিন ঈশ্বর সম্পর্কিত অধিকতর প্রচলিত ধারণায় নির্ভর করেছেন ও লুথারের মতো ঈশ্বরের পরম সার্বভৌমত্বের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এটা স্রেফ বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্বাস নয়, বরং গভীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ফল ছিল। ১৫১৯ সালের আগস্ট মাসে জুরিখে মিনিস্ট্রির শুরুর অল্প পরেই যিউইংগলি প্লেগে আক্রান্ত হন, যা শেষ পর্যন্ত শহরের এক চতুর্থাংশ জনগোষ্ঠী ধ্বংস করে দিয়েছিল। নিজেকে বাঁচানোর কোনও উপায়ই নেই বুঝতে পেরে পুরোপুরি অসহায় হয়ে পড়েন তিনি। সাহায্যের জন্যে সাধুদের কাছে প্রার্থনা করা বা চার্চকে তার হয়ে অনুকম্পা চাইতে বলার কথা মাথায়ই আসেনি। বরং তার বদলে নিজেকে ঈশ্বরের দয়ার ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। এই সংক্ষিপ্ত প্রার্থনাটি রচনা করেছেন তিনি।
তোমার যা ইচ্ছা করো
কারণ আমার কোনও নেই।
আমি তোমার পাত্র
পূর্ণাঙ্গ বা বিচূর্ণ করার জন্যে।
তাঁর আত্মসমর্পণ ছিল ইসলামের আদর্শের অনুরূপ। ইহুদি ও মুসলিমদের মতো বিকাশের একটা তুলনাযোগ্য পর্যায়ে পশ্চিমের ক্রিশ্চানরা আর মধ্যস্থতাকারীদের মেনে নিতে রাজি ছিল না, বরং তারা ঈশ্বরের প্রতি নিজেদের অবিচ্ছেদ্য দায়িত্বের বোধ গড়ে তুলছিল। কালভিনও তাঁর সংস্কারকৃত ধর্মকে ঈশ্বরের একচ্ছত্র কর্তৃত্বের উপর ভিত্তি করে গড়ে তুলেছিলেন। নিজের পরিবর্তনের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ আমাদের জন্যে রেখে যাননি তিনি। তাঁর কমেন্টারি অন দ্য সালমস গ্রন্থে কেবল এটুকু বলেছেন যে, এটা পুরো ঈশ্বরের কীর্তি। প্রথাগত চার্চ ও ‘পাপাসির কুসংস্কারে পুরোপুরি শৃঙ্খলিত ছিলেন তিনি। মুক্তি অর্জনে যুগপৎ অনিচ্ছুক ও অক্ষম ছিলেন, তাঁকে সরিয়ে আনার বেলায় ঈশ্বরের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয়েছিল: অবশেষে ঈশ্বর তার ক্ষমতার গুপ্ত লাগাম দিয়ে আমার পথকে ভিন্ন দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছেন…বহু বছরের অবাধ্য মনকে আচমকা বশ মানিয়ে নিয়েছেন।[৩৫]
ঈশ্বর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলেন, কালভিন ছিলেন একেবারে ক্ষমতাহীন, তা সত্ত্বেও আপন ব্যর্থতা ও অক্ষমতার তীব্র অনুভূতির দ্বারাই একটা বিশেষ মিশনের জন্যে তাঁকে নির্বাচিত করা হয়েছে বলে বুঝতে পেরেছিলেন তিনি।
অগাস্তিনের সময় থেকেই আকস্মিক বিশ্বাস পরিবর্তন পশ্চিমা খৃস্টধর্মের বিশ্বাসের বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছিল। প্রটেস্ট্যান্ট মতবাদ অতীতের সঙ্গে আকস্মিক ও প্রবল সম্পর্কচ্ছেদের প্রথা হিসাবে ক্রিয়াশীল রয়ে যাবে, আমেরিকান দার্শনিক উইলিয়াম জেমস যাকে বলেছেন ‘অসুস্থ আত্মা সমূহের জন্যে দ্বিতীয় জন্ম নেওয়া’ ধর্ম। ক্রিশ্চানরা ঈশ্বরের এক নতুন বিশ্বাসে ‘জন্ম গ্রহণ করছিল; তারা মধ্যযুগীয় চার্চের স্বর্গ এবং তাদের মাঝখানে বিরাজমান অসংখ্য মধ্যস্থতাকারীকে প্রত্যাখ্যান করেছে। কালভিন বলেছেন, উদ্বেগবশতঃ মানুষ সাধুদের প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করে এসেছিল; তারা একজন ক্রুদ্ধ ঈশ্বরকে তার কাছের মানুষদের তোয়াজ করে প্রসন্ন করতে চেয়েছিল। কিন্তু সাধুদের কাল্ট প্রত্যাখ্যান সত্ত্বেও প্রটেস্টান্টরা প্রায়শঃই প্রায় একই মাত্রার উদ্বেগের প্রকাশ ঘটিয়েছে। সাধুরা অকার্যকর, এ সংবাদ পাওয়ার পর এই নিরাপোস ঈশ্বর সম্পর্কিত আতঙ্ক ও বৈরিতার একটা উল্লেখযোগ্য অংশ যেন এক তীব্র প্রতিক্রিয়াসহ বিস্ফোরিত হয়েছিল। ইংরেজ মানবতাবাদী টমাস মূর সাধু-পুজার বহুঈশ্বরবাদীতার বিরুদ্ধে বহু ভৎর্সনামূলক রচনায় ব্যক্তিগত ঘৃণার ছাপ আবিষ্কার করেছিলেন। তাদের চরিত্র হননের ভেতর দিয়ে এর প্রকাশ ঘটেছিল। বহু প্রোটেস্ট্যান্ট ও পিউরিটান ওল্ড টেস্টামেন্টের প্রতিমা বিরোধিতাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে, তারা সাধু এবং ভার্জিন মেরির মূর্তি ধ্বংস করে চার্চ ও ক্যাথেড্রালের ফ্রিসকোগুলোর ওপর চুন লেপ্টে দেয়। তাদের এই তীব্র উন্মাদনা দেখিয়ে দিয়েছে যে, তারা সাধুদের কাছে তাদের পক্ষে মধ্যস্থতা করার জন্যে প্রার্থনার সময় যেমন ভীত ছিল ঠিক সে রকমভাবেই বিরক্তি উদ্রেককারী ও ঈর্ষাতুর ঈশ্বরকে আক্রমণ করতে গিয়ে ভীতির শিকার হয়েছে। এটা আরও দেখিয়েছে, কেবল ঈশ্বরকে উপাসনা করার উৎসাহ স্থির বিশ্বাস হতে জন্ম নেয়নি বরং এক উদ্বেগাকূল প্রত্যাখ্যান ছিল এটা যা প্রাচীন ইসরায়েলিদের আশেরাহর খুঁটি ভাঙায় উৎসাহ যুগিয়েছিল ও প্রতিবেশীদের দেবতাদের খিস্তি-খেউড়ে ভাসিয়ে দিতে প্ররোচিত করেছিল।
