লুথার এমনকি ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণের ব্যাপারেও সন্দিহান ছিলেন। তোমাস আকুইনাস ব্যবহৃত যুক্তিভিত্তিক বিতর্কের মাধ্যমে একমাত্র পৌত্তলিক দার্শনিকদের ‘ঈশ্বর’কেই জানা যেতে পারে । লুথার বিশ্বাস দ্বারা আমাদের ন্যায্যতা প্রতিপাদনের দাবি করে ঈশ্বর সম্পর্কে সত্য ধারণা গ্রহণ করার কথা বোঝননি। বিশ্বাসের জন্যে তথ্য, জ্ঞান ও নিশ্চয়তার প্রয়োজন নেই’ এক সারমনে প্রচার করেছেন তিনি, বরং প্রয়োজন তার অনুভূত, অপ্রয়াস লব্ধ এবং অজ্ঞাত মহত্বের কাছে আনন্দময় বাজি ধরে স্বাধীন আত্মসমর্পণ ।২৬ বিশ্বাসের ক্ষেত্রে সমস্যাদির সমাধানের বেলায় তিনি পাসকাল ও কিয়ের্কেগার্দের পূর্বগামী ছিলেন। বিশ্বাস’ কোনও বিশেষ ক্রীডের কতগুলো প্রস্তাবনার প্রতি সম্মতি জ্ঞাপন বোঝায়নি এবং অর্থডক্স মতানুযায়ী এটা আস্থা নয়। বরং বিশ্বাস হচ্ছে আস্থা স্থাপন করে একটা সত্তার উদ্দেশ্যে অন্ধকারে ঝাঁপ দেওয়া। এটা এক ধরনের জ্ঞান এবং অন্ধকার যা কিছুই দেখতে পায় না। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ঈশ্বর তাঁর প্রকৃতি বা রূপ নিয়ে অনুমান নির্ভর আলোচনা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন। কেবল যুক্তি দিয়ে তাঁর দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রয়াস বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়াতে পারে, জন্ম দিতে পারে হতাশার-যেহেতু আমরা কেবল ঈশ্বরের ক্ষমতা, প্রজ্ঞা ও. বিচার আবিষ্কারেই সক্ষম হব, যা কেবল কঠিন পাপীদের ভয় দেখাতে সক্ষম। ঈশ্বর সম্পর্কে যৌক্তিক আলোচনায় লিপ্ত হওয়ার বদলে ক্রিশ্চানের উচিত হবে ঐশীগ্রন্থে প্রকাশিত সত্য অনুধাবন করা ও সেগুলোকে আপন করে নেওয়া। লুথার তাঁর স্মল ক্যাটেশিজম-এ সংকলিত ক্রীডে সেটা কীভাবে করতে হবে দেখিয়েছেন:
আমি বিশ্বাস করি, অনন্ত অসীমের পিতার সন্তান ও কুমারী মেরীর গর্ভে জন্মগ্রহণকারী মানুষ আমার প্রভু; যিনি আমাকে উদ্ধার করেছেন, একজন দিশাহারা ঘৃণিত প্রাণী এবং আমাকে সকল পাপ, মৃত্যু ও শয়তানের কবল হতে রক্ষা করেছেন; কিন্তু সেটা সোনা-রূপা দিয়ে নয় বরং তাঁর পবিত্র ও মূল্যবান রক্ত দিয়ে, তার পাপহীন কষ্ট ও মৃত্যু দিয়ে, যেন আমি তাঁর হয়ে যাই, তার ছায়াতলে বেঁচে থাকি ও আজীবন ন্যায়ের পথে তার সেবা করি, তাঁর আশীর্বাদ পাই, এমনকি যখন তিনি মৃত হতে পূনরুত্থিত হন এবং অনন্তকাল রাজত্ব করেন।[২৮]
স্কালাস্টিক ধর্মতত্ত্বে শিক্ষা পেয়েছিলেন লুথার, কিন্তু পরে বিশ্বাসের অধিকতর সরল ধরণ বেছে নিয়েছেন ও চতুর্দশ শতাব্দীর বিরস ধর্মতত্ত্বের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন যা তার আতঙ্ক প্রশমিত করতে পারেনি। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা ঠিক কীভাবে ন্যায্যতা পেয়েছি ব্যাখ্যা দেওয়ার বেলায় নিজেই অস্পষ্টতার দোষে অভিযুক্ত হয়ে পড়েন তিনি। লুথারের গুরু অগাস্তিন শিক্ষা দিয়েছিলেন যে, পাপীর ওপর অর্পিত ন্যায়নিষ্ঠা তার নয়, ঈশ্বরের । লুথার একে কিঞ্চিৎ ঘুরিয়ে দিয়েছেন। অগাস্তিন বলেছিলেন, এই স্বর্গীয় ন্যায়নিষ্ঠা আমাদের অংশে পরিণত হয়েছে; লুথার জোর দিয়েছেন যে, এটা পাপীর বাইরেই রয়ে গেছে, কিন্তু ঈশ্বর একে এমনভাবে দেখেছেন যেন এটা আমাদের একান্ত নিজস্ব হয়ে গেছে। এটা পরিহাসের বিষয় যে, সংস্কার আরও বৃহত্তর মতবাদগত বিভ্রান্তি ও নতুনতর মতবাদের বিস্তার ঘটিয়েছিল, কারণ এগুলো যেসব গোষ্ঠীকে প্রতিস্থাপিত করতে চেয়েছিল সেগুলোর মতোই কোনও কোনওটা নজীরবিহীন ও নাজুক ছিল।
ন্যায্যতার মতবাদ প্রণয়নের পর নিজের পুর্নজন্মের দাবি করেছিলেন লুথার, কিন্তু আসলে তাঁর সকল উৎকণ্ঠার অবসান ঘটেছে বলে মনে হয় না। তিনি ক্রুদ্ধ, অস্থির ও সহিংস মানুষই রয়ে গিয়েছিলেন। সকল প্রধান ধর্মীয় প্রথা দাবি করে যে, যেকোনও আধ্যাত্মিকতার অ্যাসিড টেস্ট হচ্ছে ঠিক কোন মাত্রায় সেটা দৈনন্দিন জীবনে আত্তীকৃত হয়েছে। বুদ্ধ যেমন বলেছিলেন আলোকপ্রাপ্তির পর যে কারও উচিত হবে বিপণি কেন্দ্রে প্রত্যাবর্তন করা ও সকল প্রাণীর প্রতি দয়া প্রদর্শনের চর্চা করা। এক ধরনের শান্তিবোধ, অচঞ্চলতা ও প্রেমময়-দয়া হচ্ছে সকল সত্য ধর্মদর্শনের প্রধান বৈশিষ্ট্য। কিন্তু লুথার ছিলেন প্রবলভাবে অ্যান্টি-সেমাইট, নারী-বিদ্বেষী, যৌনতার ব্যাপারে ঘৃণা ও আতঙ্ক বোধ করতেন তিনি, এবং বিশ্বাস করতেন যে, বিদ্রোহী সকল কৃষককে হত্যা করা উচিত। প্রতিহিংসা পরায়ণ ঈশ্বরের দর্শন ব্যক্তিগত ক্রোধে ভরিয়ে তুলেছিল তাঁকে। মনে করা হয়, উদ্ধত চরিত্রের কারণে সংস্কার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংস্কারবাদী হিসাবে কাজ শুরুর আগে তাঁর বহু ধারণাই অর্থডক্স ক্যাথলিকরা গ্রহণ করেছিল, সেগুলোর চর্চা নতুন প্রাণশক্তি যোগাতে পারত; কিন্তু লুথারের আগ্রাসী কৌশল সেগুলো অপ্রয়োজনীয় সন্দেহের সঙ্গে দেখার কারণ হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদে লুথার জন কালভিনের (১৫০৯-৬৪) চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন; লুথারের চেয়ে বেশি মাত্রায় রেনেসাঁর আদর্শের ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো, তাঁর সুইস সংস্কার উদীয়মান পাশ্চাত্যের মূল্যবোধের ওপর গভীর প্রভাব সৃষ্টি করেছিল। ষোড়শ শতাব্দীর শেষ নাগাদ কালভিনিজম’ আন্তর্জাতিক ধর্ম হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল এবং ভালো বা খারাপ যাই হোক, সমাজকে বদলে দিতে পেরেছিল; জনগণকে তা এই মর্মে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে যে, তারা যা চায় তাই অর্জন করতে পারে। কালভিনিস্টিক ধ্যান-ধারণা ১৬৪৫ সালে অলিভার ক্রমওয়েলের অধীনে ইংল্যান্ডে পিউরিটান বিপ্লবে অনুপ্রেরণা দিয়েছিল আর ১৬২০ এর দশকে নিউ ইংল্যান্ডে উপনিবেশ স্থাপনে সাহায্য করেছে। লুথারের মৃত্যুর পর তাঁর মতবাদ মূলত জার্মানিতেই সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু কালভিনের ধারণা যেন আরও প্রগতিশীল প্রতীয়মান হয়েছে। অনুসারীরা তাঁর শিক্ষার উন্নয়ন ঘটিয়ে সংস্কারের দ্বিতীয় ধারার সূচনা ঘটায়। ইতিহাসবিদ হিউ ট্রেভর রোপার যেমন মন্তব্য করেছেন, অনুসারীরা কালভিনিজমকে রোমান। ক্যাথলিসিজমের চেয়ে অনেক সহজে পরিত্যাগ করেছিল-সে কারণেই প্রবাদবাক্য ‘একবার যে ক্যাথলিক, সে আজীবন ক্যাথলিক’-এর জন্ম। তা সত্ত্বেও কালভিনিজম এর ছাপ রেখেছে: পরিত্যক্ত হলেও সেকুলার দৃষ্টিভঙ্গিতে একে প্রকাশ করা যেতে পারে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এটা বেশি সত্যি। বহু আমেরিকান যারা এখন আর ঈশ্বরে বিশ্বাসী নয় তারা পিউরিটান কর্ম-নীতি মেনে চলে এবং নির্বাচনের কালভিনিস্টিক ধারণা বিশ্বাস করে, নিজেদের তারা মনোনীত জাতি’ মনে করে যাদের পতাকা ও আদর্শের আধা-ঐশ্বরিক উদ্দেশ্য রয়েছে। আমরা দেখেছি, সকল প্রধান ধর্মই এক অর্থে সভ্যতার এবং আরও নির্দিষ্টভাবে নগরের সৃষ্টি। ধনী বণিক শ্রেণী যখন প্রাচীন পৌত্তলিক রাষ্ট্রযন্ত্রের স্থান দখল করে নিয়তিকে নিজের হাতে নিতে চেয়েছে তখনই এসব ধর্মের উদ্ভব ঘটেছিল। ইউরোপের উন্নয়নশীল শহরগুলোর বুর্জোয়াদের কাছে খৃস্ট ধর্মের কালভিনিস্টিক রূপ বিশেষভাবে আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল, যার অধিবাসীরা নিপীড়নমূলক ধারাক্রমের শিকল হতে মুক্তি চেয়েছিল।
