মার্টিন লুথার (১৪৮৩-১৫৪৬) উইচক্র্যাফটে প্রবলভাবে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি ক্রিশ্চানের জীবনকে স্যাটানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হিসাবে দেখেছেন। সংস্কারকে এই উৎকণ্ঠার মোকাবিলার প্রয়াস হিসাবে দেখা যেতে পারে; যদিও অধিকাংশ সংস্কারবাদী ঈশ্বর সম্পর্কে নতুন কোনও ধারণা বা মতবাদ হাজির করেনি। মোড়শ শতাব্দীতে ইউরোপে ঘটে যাওয়া ধর্মীয় পরিবর্তনের বিরাট চক্রকে ‘সংষ্কার হিসাবে আখ্যায়িত করা অবশ্যই সরলীকরণ হয়ে পড়ে। শব্দটি যা ঘটেছে তার চেয়ে আরও সুচিন্তিত ও ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন বোঝায়। বিভিন্ন সংস্কারক-ক্যাথলিক ও প্রটেস্ট্যাট উভয়ই-এক নতুন ধর্মীয় সচেতনাকে তুলে ধরার প্রয়াস পাচ্ছিলেন যা প্রবলভাবে অনুভূত হলেও ধারণাগত রূপ বা সচেতনভাবে চিন্তা করা হয়নি। ঠিক কেন ‘সংস্কার ঘটেছিল আমরা জানি না। আজকের দিনে পণ্ডিতগণ আমাদের অতীতের পাঠ্য বইয়ের বিবরণ সম্পর্কে সতর্ক থাকতে বলেন। প্রায়শঃ যেমন মনে করা হয়, আসলে কেবল চার্চের দুর্নীতির কারণেই পরিবর্তন ঘটেনি কিংবা ধর্মীয় উৎসাহ-উদ্দীপনার হ্রাসের কারণেও নয়। প্রকৃতপক্ষে ইউরোপে ধর্মের প্রতি এক ধরনের আগ্রহের জন্ম হয়েছিল বলেই মনে হয় যা মানুষকে বাড়াবাড়ির প্রতি সমালোচনামুখর করে তুলেছিল এক সময় যা অনিবার্য মনে করা হয়েছিল। সংস্কারবাদীদের সকল ধারণা এসেছে মধ্যযুগীয় ক্যাথলিক ধর্মতত্ত্ব থেকে। ষোড়শ শতাব্দীতে সাধারণ মানুষের নতুন ধর্মানুরাগ ও ধর্মতাত্ত্বিক সচেতনতার মতো সুইটযারল্যান্ড ও জার্মানিতে জাতীয়তাবাদ ও নগরের উত্থানও বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। ইউরোপের ব্যক্তি স্বাতন্ত্রবাদ বোধও চড়া হয়ে উঠেছিল, এটা বরাবরই প্রচলিত ধর্মীয় মনোভাবে তীব্র পরিবর্তন সূচিত করে থাকে। বাহ্যিক ও সমবেতভাবে বিশ্বাসের প্রকাশের বদলে ইউরোপিয়রা ধর্মের অভ্যন্তরীণ রূপ জানতে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছিল। এইসব উপাদান বেদনাদায়ক ও প্রায়শঃ সহিংস পরিবর্তনে অবদান রেখেছিল ও পশ্চিমকে আধুনিকতার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
দীক্ষিত হবার আগে লুথার যে ঈশ্বরকে ঘৃণা করে এসেছেন তাঁকে খুশি করার সম্ভাবনার ব্যাপারে প্রায় হতাশ হয়ে পড়েছিলেন:
যদিও আমি সাধুর মতো পাপহীন জীবন যাপন করেছি, তারপরেও ঈশ্বরের সামনে অস্বস্তিতে ভরা বিবেক নিয়ে উপস্থিত হয়ে নিজেকে পাপী মনে হয়েছে। আমিও এও বিশ্বাস করতে পারিনি যে, আমার কাজ দিয়ে তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পেরেছি। পাপীকে শাস্তিদানকারী ঈশ্বরকে ভালোবাসা দূরে থাক, তাকে ঘৃণা করেছি। আমি ভালো সাধু ছিলাম, এত কঠোরভাবে নিয়ম পালন করেছি যে, যদি কোনও সাধু কখনও মনাস্টিক অনুশীলনের মাধ্যমে স্বর্গে যায় তবে মনেস্টারির আমার সতীর্থ সকল এতে সাক্ষী দেবে…তারপরেও আমার বিবেক আমাকে নিশ্চয়তা দেয়নি, বরং আমি সব সময় সন্দেহ করেছি এবং বলেছি, এটা ঠিক করোনি। তুমি যথেষ্ট অনুতপ্ত নও। স্বীকারোক্তিতে সেটা বাদ দিয়েছ তুমি।[১৭]
বর্তমানে বহু ক্রিশ্চান-প্রটেস্ট্যান্ট ও ক্যাথলিক উভয়ই-এই লক্ষণ শনাক্ত করতে পারবে, সংস্কার যাকে সম্পূর্ণ দূর করতে পারেনি। লুথারের ঈশ্বর তাঁর ক্রোধে বৈশিষ্টমণ্ডিত । সাধু, পয়গম্বর বা সামিস্টদের কেউই এই ঐশী ক্রোধ সহ্য করতে পারেননি। স্রেফ, সাধ্যানুযায়ী করার প্রয়াসই যথেষ্ট নয়। ব্যক্তিক ঈশ্বর চিরন্তন ও সর্বব্যাপী, সুতরাং ‘আত্ম-তুপ্ত পাপীদের প্রতি তাঁর ক্রোধ বা আক্রোশও তাই অপরিমেয় এবং অসীম। তার ইচ্ছা জানার উপায় নেই। ঈশ্বরের আইন বা ধর্মীয় রীতিনীতি পোষণ আমাদের বাঁচাতে পারবে না। প্রকৃতপক্ষে, আইন শুধু অভিযোগ ও ত্রাস আনতে পারে, কারণ এটা আমাদের অপূর্ণাঙ্গতার মাত্রা দেখিয়ে দিয়েছে। আশার বাণী শোনানোর বদলে আইন ঈশ্বরের ক্রোধ, পাপ, ঈশ্বর সকাশে মৃত্যু এবং নরকবাসের কথা প্রকাশ করেছে।
ন্যায্যতার মতবাদ প্রণয়নের সময় লুথারের ব্যক্তিগত সাফল্য এসেছিল। মানুষ নিজেকে রক্ষা করতে পারে না। ঈশ্বর ন্যায্যতা’র, পাপী ও ঈশ্বরের সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের প্রয়োজনীয় সবকিছুর যোগান দেন। ঈশ্বর সক্রিয়, মানুষ স্রেফ নিষ্ক্রিয়। আমাদের সকর্ম’ ও আইনের অনুসরণ আমাদের ন্যায্যতার কারণ নয় বরং ফল মাত্র। ঈশ্বর আমাদের রক্ষা করেছেন বলেই আমরা ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে পারি। সেইন্ট পল ‘বিশ্বাসে ন্যায্যতা’ বলে একথাই বোঝাতে চেয়েছিলেন। লুথারের তত্ত্বের নতুন কিছুই ছিল নাঃ চতুর্দশ শতাব্দীর গোড়া থেকেই ইউরোপে এর চল ছিল। কিন্তু লুথার একে আবিষ্কার করে আপন করে নেওয়ার ফলে তাঁর উদ্বেগ উৎকণ্ঠা তিরোহিত হয়ে যায়। এরপর আগত প্রত্যাদেশ ‘আমার মাঝে এমন বোধ জাগিয়ে তোলে যেন আমার নবজন্ম হয়েছে; আমি যেন উন্মুক্ত তোরণ দিয়ে স্বর্গে প্রবেশ করেছি।[২০]
তারপরেও মানব প্রকৃতি সম্পর্কে পুরোপুরি নৈরাশ্যবাদী রয়ে যান তিনি। ১৫২০ সালের দিকে তার থিয়োলজি অভ দ্য ক্রস প্রণয়ন করেন তিনি। এই শব্দগুচ্ছ সেইন্ট পল থেকে নিয়েছিলেন তিনি। সেইন্ট পল করিন্থীয় নবদীক্ষিতদের বলেছিলেন, ক্রাইস্টের ক্রস দেখিয়ে দিয়েছিল যে, ঈশ্বরের নির্বুদ্ধিতা মানবীয় প্রজ্ঞার চেয়ে শ্রেয় ও ঈশ্বরের দুর্বলতা মানুষের শক্তির চেয়ে শক্তিমান।২১ ঈশ্বর ‘পাপীদের ন্যায্যতা দান করেন, একেবার মানবীয় বিচারে যারা কেবল শাস্তিরই যোগ্য। মানুষের কোছে যা দুর্বলতা সেখানেই ঈশ্বরের শক্তি প্রকাশিত হয়েছে। লুরিয়া যেখানে কাব্বালিস্টদের শিক্ষা দিয়েছিলেন যে কেবল আনন্দ ও প্রশান্তিতেই ঈশ্বরকে পাওয়া সম্ভব, লুথার সেখানে দাবি করেছেন, একমাত্র কষ্ট ও ক্রসেই ঈশ্বরকে পাওয়া যেতে পারে।২২ এই অবস্থান থেকে স্কলাস্টিসিজমের বিরুদ্ধে যুক্তি খাড়া করেন তিনি-মানবীয় চাতুরি প্রকাশকারী ও ‘যেন স্পষ্ট বোধগম্য এমনভাবে ঈশ্বরের অদৃশ্য ব্যাপার প্রত্যক্ষকারী’ মিথ্যা কষ্ট ও ক্রসের মাধ্যমে’২৩ অনুধাবণকারী প্রকৃত ধর্মতাত্ত্বিকের পার্থক্য তুলে ধরেন। চার্চের ফাদারগণ যেভাবে ট্রিনিটি ও অবতারের মতবাদ প্রণয়ন করেছিলেন সেদিক থেকে এগুলোকে সন্দেহভাজন মনে হয়, এগুলোর জটিলতা জটিলতা ‘প্রতাপের ধর্মতত্ত্বের২৪ অসারতার কথাই বলে। তা সত্ত্বেও লুথার নাইসিয়া, এফিসাস এবং চ্যালসেডনদের অর্থডক্সির প্রতি অনুগত রয়ে গিয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তার ন্যায্যতা তত্ত্ব ক্রাইস্টের ঐশ্বরিকতা ও তাঁর ত্রিত্ববাদী মর্যাদার ওপর নির্ভরশীল ছিল। ঈশ্বর সংক্রান্ত প্রচলিত ধারণা খৃস্টজগতে এত গভীরভাবে প্রোথিত ছিল যে, লুথার বা কালভিন এ ব্যাপারে প্রশ্ন তোলেননি, কিন্তু লুথার অসত্য ধর্মতাত্ত্বিকদের অস্পষ্ট মতবাদ প্রত্যাখ্যান করেছেন। আমার কাছে কী মূল্য আছে এর? জটিল খৃস্টতত্ত্বীয় মতবাদের মুখোমুখি হয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনিঃ ক্রাইস্ট তাঁর ত্রাণকর্তা জানাটাই ছিল সব।২৫
