এমনকি রেনেসাঁর সময়ও পাশ্চাত্য চেতনার অন্ধকার দিক প্রকাশ পেয়েছে। রেনেসাঁ যুগের দার্শনিক ও মানবতাবাদীরা মধ্যযুগীয় অধিকাংশ ধর্মানুরাগের ব্যাপারে তীব্র সমালোচনামুখর ছিল । স্কলাস্টিক্সদের গভীরভাবে অপছন্দ করত তারা, ঈশ্বর সম্পর্কে তাদের অনুমান বা ভাবনা ঈশ্বরকে অচেনা ও একঘেয়ে করে তুলেছে বলে মনে হয়েছে তাদের। এর বদলে ধর্ম বিশ্বাসের উৎস, বিশেষ করে সেইন্ট অগাস্তিনের কাছে ফিরে যেতে চেয়েছেন। মধ্যযুগীয়রা অগাস্তিনকে ধর্মতাত্ত্বিক হিসাবে শ্রদ্ধা করত, কিন্তু মানবতাবাদীরা কনফেশন পুনরাবিষ্কার করে এবং তাকে ব্যক্তিগত অনুসন্ধানে রত একজন সতীর্থ মনে করেছে। খৃস্ট ধর্মমত, যুক্তি দেখিয়েছে তারা, একগুচ্ছ মতবাদ নয়, বরং একটা অনুভূতি। লরেনযো ফাল্লা (১৪০৭-৫৭) যুক্তির কৌশল ও ‘মেটাফিজিক্সের দ্ব্যার্থবোধক কথাবার্তা পবিত্র ডগমার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার অসারতার ওপর জোর দিয়েছেন। সেইন্ট পলও এইসব ‘অসারতার নিন্দা জানিয়েছিলেন। ফ্রান্সেসকো পোচ (১৩০৪-৭৪) মত প্রকাশ করেছিলেন যে, ‘ধর্মতত্ত্ব আসলে কাব্য, ঈশ্বর সংক্রান্ত কাব্য,’ এটা কোনও কিছু প্রমাণ করে বলে নয় বরং তা হৃদয়কে ভেদ করে বলে কার্যকর। মানবতাবাদীরা মানুষের মর্যাদা পুনরাবিষ্কার করেছে, কিন্তু সেটা ঈশ্বরকে ত্যাগ করার কারণ হয়নি। তার বদলে, সে যুগের প্রকৃত মানুষের মতো তারা মানুষে রূপান্তরিত ঈশ্বরের মানবতার ওপর জোর দিয়েছে, কিন্তু পুরোনো নিরাপত্তাহীনতা রয়ে গিয়েছে, রেনেসাঁ ব্যক্তিত্বগণ মানুষের জ্ঞানের নাজুকতার সম্পর্কে সচেতন ছিলেন, আবার অগাস্তিনের প্রকট পাপবোধের সঙ্গেও সমব্যাথী ছিলেন তাঁরা। পেত্রাচ যেমন বলেছেন:
কতবার নিজের দুঃখ দুর্দশা আর মরণ নিয়ে ভেবেছি আমি; অশ্রুর বানে ভাসিয়ে দিতে চেয়েছি আমার সকল দাগ যাতে না কেঁদে এনিয়ে কথা বলতে পারি, কিন্তু তারপরেও এখন পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছি। ঈশ্বর প্রকৃতই মহান: আর আমি নগণ্য।
সুতরাং মানুষ ও ঈশ্বরের মাঝে বিরাট দুরত্ব রয়ে গিয়েছিল: কলোচ্চিয়ো স্যালুতাতি (১৩৩১-১৪০৬) এবং লেনার্দো ব্রুতিন (১৩৬৯-১৪৪৪) দুজনই পুরোপুরি মানব মনের ক্ষেত্রে ঈশ্বরকে দুয়ে ও অগম্য হিসাবে দেখেছেন।
কিন্তু তা সত্ত্বেও জার্মান দার্শনিক ও চাচম্যান নিকোলাস অভ কুসা (১৪০১-৬৪) ঈশ্বরকে বোঝার ব্যাপারে আমাদের ক্ষমতা সম্পর্কে বেশি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। নতুন বিজ্ঞান সম্পর্কে দারুণ রকম আগ্রহী ছিলেন তিনি, ভেবেছিলেন এর ফলে ট্রিনিটি রহস্য অনুধাবন সহজ হয়ে উঠবে। উদাহরণ স্বরূপ, গণিত একেবারেই বিমূর্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা করে, সুতরাং অন্যান্য বিদ্যায় যেটা অসম্ভব তেমন বিষয়ে এর পক্ষে একটা নিশ্চয়তা দান করা সম্ভব। এভাবে গণিতের সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন ধারণা দুটি আপাত বিপরীতমুখী মনে হলেও আসলে এগুলোকে যৌক্তিকতার প্রেক্ষিতে একই রকম বিবেচনা করা যেতে পারে। এই বিপরীতের সহাবস্থান’ ঈশ্বরের ধারণা ধারণ করে: ‘সর্বোচ্চ’র ধারণা সবকিছুকে অন্তর্ভূক্ত করে; এখানে একত্ব ও প্রয়োজনের ধারণা প্রকাশ পায় যা সরাসরি ঈশ্বরের দিকে ইঙ্গিত করে। আবার, সর্বোচ্চ রেখা কোনও ত্রিভূজ, বৃত্ত বা বলয় নয়, বরং তিনটির সমন্বয়; বিপরীতের ঐক্যও একটা ট্রিনিটি। তারপরেও নিকোলাসের বুদ্ধিদীপ্ত উপস্থাপনার ধর্মীয় অর্থ ছিল সামান্যই। এ যেন ঈশ্বরকে যুক্তির ধারায় নামিয়ে আনা । কিন্তু তাঁর বিশ্বাস, ঈশ্বর সবকিছুকে আলিঙ্গন করেন, এমনকি স্ববিরোধিতাকেও১৪ গ্রিক অর্থডক্স ধারণা-সকল সত্যি ধর্মতত্ত্ব প্যারাডিক্সিক্যাল হতে বাধ্য-এর খুব কাছাকাছি। দার্শনিক বা গণিতজ্ঞের বদলে শিক্ষক হিসাবে লেখার সময় নিকোলাস ঈশ্বরমুখী হওয়ার জন্যে ‘ক্রিশ্চানের সবকিছু পেছনে ফেলে যাওয়ার ব্যাপারে সচেতন ছিলেন, এমনকি তাকে নিজের বুদ্ধির ঊর্ধ্বে উঠতে হবে, যেতে হবে সকল বোধ আর যুক্তির বাইরে । ঈশ্বরের মুখায়ব ‘এক গোপন ও অতিন্দ্রীয় নৈঃশব্দ্যে আবৃত্ত রয়ে যাবে।
রেনেসাঁর নতুন দর্শন ঈশ্বরের মতো যুক্তির নাগালের বাইরে অবস্থানকারী গভীর ভয় বা শঙ্কার মোকাবিলা করতে পারেনি। নিকোলাসের মৃত্যুর অল্পদিনের মধ্যে তাঁর স্বদেশ জার্মানিতে এক বিশেষ ক্ষতিকর আতঙ্ক দেখা দেয় এবং সমগ্র উত্তর ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৮৪ সালে পোপ অষ্টম ইনোসেন্ট দ্য বুল সুম্মা দে সিদারেন্তস প্রকাশ করেন যা এক প্রবল উন্মাদনা সূচিত করেছিল। এটি বিক্ষিপ্তভাবে ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে গোটা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে প্রটেস্ট্যান্ট ও ক্যাথলিক উভয় সম্প্রদায়কে সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। পাশ্চাত্যের অন্ধকার চেতনা উন্মোচিত করেছে এটা। এই ভয়ঙ্কর নিপীড়নের কালে হাজার হাজার নারী-পুরুষের উপর নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়ে তাদের ভয়ঙ্কর সব অপরাধের স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করা হয়েছে। তারা স্বীকার করে নেয় যে, শয়তানের সঙ্গে যৌন মিলনে অংশ নিয়েছে তারা, আকাশ পথে হাজার মাইল দূরে উড়ে গিয়ে অশ্লীল সমাবেশে যোগ দিয়েছে যেখানে ঈশ্বরের বদলে ইবলিশের উপাসনা করা হয়। এখন আমরা জানি, ডাইনী বলে কিছু ছিল না, ঐ উন্মাদনা এক সম্মিলিত ফ্যান্টাসির প্রতিনিধিত্ব করেছে, যেখানে শিক্ষিত ইনকুইজিটরস ও তাঁদের বহু শিকার অংশ নিয়েছিল । এরা এসব স্বপ্ন দেখেছে ও সত্যিই এসব ঘটেছে বলে সহজেই বিশ্বাস করেছে। এই ফ্যান্টাসির সঙ্গে অ্যান্টি সেমিটিজম ও গভীর যৌন-আতঙ্কের যোগসূত্র ছিল। স্যাটান বা ইবলিশ এক অসম্ভব ভালো ও ক্ষমতাধর ঈশ্বরের ছায়া হিসাবে আবির্ভূত হয়েছিল । ঈশ্বরের অন্যান্য ধর্মে এমনটি ঘটেনি। উদাহরণ স্বরূপ, কোরানে স্পষ্ট বলা আছে, শেষ বিচারের দিনে স্যাটানকে (শয়তান) মার্জনা করা হবে। কোনও কোনও সুফী দাবি করেছে যে অন্যান্য দেবদূতের চেয়ে ঈশ্বরকে বেশি ভালোবাসার কারণেই সে করুণা হতে বঞ্চিত হয়েছে। সৃষ্টির পর আদমের সামনে আল্লাহ্ নতজানু হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন তাকে, কিন্তু অস্বীকৃতি জানিয়েছিল শয়তান, কারণ তার বিশ্বাস ছিল, কেবল আল্লাহ’র প্রতিই এরকম আনুগত্য দেখানো যেতে পারে। কিন্তু পশ্চিমে স্যাটান নিয়ন্ত্রণের অতীত এক অশুভ চরিত্রে পরিণত হয়েছে। বর্ধিত হারে তাকে সীমাহীন যৌনক্ষুধা ও অস্বাভাবিক বড় যৌনাঙ্গ বিশিষ্ট বিশাল জানোয়ার হিসাবে উপস্থাপন করা হচ্ছিল। নরমান কন তাঁর ইউরোপ’স ইনার ডিমনস গ্রন্থে যেমন বলেছেন, স্যাটানের এই প্রতিকৃতি কেবল এক সুপ্ত আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠার প্রকাশ ছিল না; এই ডাইনী-উন্মাদনা এক নিপীড়ক ধর্ম এবং আপাত অপ্রতিরোধ্য ঈশ্বরের বিরুদ্ধে অবচেতন অথচ অনিবার্য বিদ্রোহের প্রতিনিধিত্ব করেছে। টর্চার চেম্বারে ইনকুইজিটর ও ‘ডাইনীরা মিলে এমন এক ফ্যান্টাসির জন্ম দিয়েছে যা খৃস্টধর্মের উল্টোচিত্র। ব্ল্যাক মাস এক ভীতিকর অথচ বিকৃতভাবে সন্তোষ জাগানো অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল যেখানে ঈশ্বরের বদলে শয়তানের উপাসনা চলত, ঈশ্বরকে কর্কশ ও বড় বেশি ভীতিকর মনে হতো।
