ইউরোপের ক্রিশ্চানরা এ রকম ইতিবাচক আধ্যাত্মিকতার জন্ম দিতে পারেনি। তারাও ঐতিহাসিক বিপর্যয়ের শিকার হয়েছিল যা স্কলাস্টিক্সদের দার্শনিক ধর্মে প্রশমিত হওয়া সম্ভব ছিল না। ১৩৪৮ সালের ব্ল্যাক ডেথ, ১৪৫৩ সালে কন্সতান্তিনোপলের পতন, আভিগনন ক্যাপটিভিটির গির্জা সংক্রান্ত কেলেঙ্কারি (১৩৩৪-৪২) ও চরম বিবাদ (১৩৭৮-১৪১৭) মানবীয় অবস্থার অক্ষমতাকে স্পষ্ট করে দিয়েছিল, বদনাম বয়ে এনেছিল চার্চের। ঈশ্বরের সহায়তা ছাড়া মানুষের পক্ষে যেন তখন ভীতিকর বিপদ হতে নিস্তার লাভ অসম্ভব ঠেকেছে। তো, চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতাব্দীতে অক্সফোর্ডের দানস স্কটাস (১২৬৫-১৩০৮)-দানস স্কটাস এরিজেনার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা যাবে না–ও ফরাসি ধর্মাতাত্ত্বিক জা দে গরসন (১৩৬৩-১৪২৯)-এর মতো ধর্মতাত্ত্বিকদের উভয়ই ঈশ্বরের সার্বভৌমত্বের ওপর জোর দিয়েছেন, যিনি চরম শাসকের মতোই মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণ করেন। নারী ও পুরুষের পক্ষে মুক্তি লাভের ক্ষেত্রে কিছুই করণীয় নেই; ভালো কাজের নিজস্ব কোনও মূল্য নেই, ঈশ্বর প্রসন্ন হয়ে এগুলোকে ভালো বলেছেন বলেই ভালো। তবে এই দুই শতকে গুরুত্বের পরিবর্তন ঘটেছিল। গারসন স্বয়ং অতিন্দ্রীয়বাদী ছিলেন, তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ঈশ্বরের প্রকৃতি বোঝার জন্যে সত্য ধর্মের ওপর ভিত্তি করে যুক্তি দিয়ে খোঁজার চেয়ে উচ্চাভিলাষী অনুসন্ধান ছাড়াই ঈশ্বরের প্রতি ভালোবাসা বজায় রাখাই শ্রেয়তর। আমরা যেমন দেখেছি, চতুর্দশ শতাব্দীতে ইউরোপে অতিন্দ্রীয়বাদের একটা জোয়ার দেখা দিয়েছিল, মানুষও বুঝতে শুরু করেছিল যে, যে রহস্যকে তারা ‘ঈশ্বর’ ডাকে তাকে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে যুক্তি যথেষ্ট নয়। টমাস আ কেম্পিস তাঁর দ্য ইমিটেশন অভ ক্রাইস্ট–এ যেমন বলেছেন:
যদি তোমার মাঝে বিনয় না থাকে, সে কারণে ট্রিনিটিকে রুষ্ট কর, তাহলে ট্রিনিটি নিয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনার মূল্য কী…একে সংজ্ঞায়িত করতে পারার চেয়ে বরং অনেক বেশি মর্মপীড়া রোধ করব আমি। গোটা বাইবেল যদি তোমার মুখস্থ থাকে, সমস্ত দার্শনিকের সকল শিক্ষা জানা যাকে, ঈশ্বরের অনুগ্রহ ও ভালোবাসা ছাড়া এসব তোমার কী কাজে আসবে?
দ্য ইমিটেশন অভ ক্রাইস্ট রুক্ষ অস্পষ্ট ধার্মিকতা নিয়েই পাশ্চাত্যে সকল আধ্যাত্মিক ক্লাসিকের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। এই শতাব্দীগুলোয় ধার্মিকতা বর্ধিত হারে মানুষ জেসাসের ওপর কেন্দ্রীভূত হয়েছিল। ক্রসের অবস্থান তৈরি জেসাসের শারীরিক কষ্ট ও বেদনার বিস্তারিত প্রকাশ নিয়ে কাজ করেছে। চতুর্দশ শতাব্দীর এক অজ্ঞাতনামা লেখকের মেডিটেশন আমাদের বলছে, লাস্ট সাপার ও অ্যাগনি ইন গার্ডেনের ওপর রাতের বেশির ভাগ সময় ধ্যান করে সকালে জেগে উঠেও তার চোখজোড়া কান্নার কারণে তখনও লাল হয়ে থাকা উচিত। সঙ্গে সঙ্গে তাকে ধ্যানের মধ্য দিয়ে ক্যালভেরির দিকে জেসাসের এগিয়ে যাওয়া অনুসরণ করতে হবে ঘন্টায় ঘন্টায়। কর্তৃপক্ষের কাছে জেসাসের প্রাণ ভিক্ষা চাওয়ার কথা কল্পনা করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে পাঠককে, কারাগারে তার পাশে বসে তার হাতকড়া ও শিকলে বাঁধা পায়ে চুমু খেতে বলা হয়েছে। আনন্দ বর্জিত এই অনুশীলনে পুনরুত্থানের ওপর সামান্যই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে; বরং তার বদলে জেসাসের মানবরূপের অসহায়ত্বের উপরই জোর দেওয়া হয়েছে বেশি। প্রবল আবেগ ও আধুনিক পাঠকের কাছে বিকৃত কৌতূহল বলে মনে হওয়া একটা ব্যাপার অধিকাংশ রচনার বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এমনকি বিখ্যাত অতিন্দ্রীয়বাদী সুইডেনের ব্রিজিত কিংবা নরউইচের জুলিয়ানও জেসাসের শারীরিক অবস্থার ভয়ঙ্কর বিবরণ দিয়েছেন:
তাঁর প্রিয় মুখ আমি দেখেছি, শুষ্ক, রক্তশূন্য, মড়ার মতো ফ্যাকাশে। আরও মলিন, মৃতবৎ, প্রাণহীন হয়ে উঠল। তারপর মূত, নীল বর্ণ ধারণ করল, আস্তে আস্তে বাদামী নীল হয়ে এল, ক্রমশ নীল হয়ে আসছিল মাংস। আমার জন্যে তাঁর আশীর্বাদপুষ্ট চেহারার মাঝে আবেগের ছাপ দেখা যাচ্ছিল, বিশেষ করে তার ঠোঁটে। সেখানেও সেই চার রঙ দেখেছি আমি, যদিও আগে যখন দেখেছিলাম তখন তরতাজা, লাল ও চমৎকার ছিল। মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করাটা ছিল খুবই দুঃখজনক। আমার চোখের সামনেই তার নাক কাঁপতে কাঁপতে শুকিয়ে গেল আর মৃত্যুর ছোঁয়ায় শুকিয়ে তার প্রিয় দেহ হয়ে গেল কালো ও বাদামী।
এই বিবরণ আমাদের জার্মান কুসিফিক্সের কথা মনে করিয়ে দেয়। চতুর্দশ শতাব্দীর সেই ভীতিকর পাঁকানো রক্তাক্ত দেহ ভেসে ওঠে চোখের সামনে, যা অবশ্যই ম্যাথিয়াস নওয়াল্ডের (১৪৮০-১৫২৮) রচনায় ক্লাইমেক্সে পৌঁছেছিল। ঈশ্বরের রূপ সম্পর্কে জুলিয়ান অসাধারণ অন্তদৃষ্টির অধিকারী ছিলেন: প্রকৃত অতিন্দ্রীয়বাদীর মতো ট্রিনিটিকে বরং আত্মার মাঝে জীবন্ত হিসাবে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু মানুষ ক্রাইস্টের প্রতি পশ্চিমের মনোযোগ এত জোরাল ছিল যে তা ঠেকানো যায়নি। চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতাব্দীতে ইউরোপের নারী-পুরুষ ক্রমবর্ধমান হারে ঈশ্বরের তুলনায় অন্যান্য মানুষকে তাদের আধ্যাত্মিক জীবনের কেন্দ্রে স্থাপন করেছিল । মানুষ জেসাসের পাশাপাশি মেরি ও সাধুদের মধ্যযুগীয় কাল্ট মতবাদের প্রসার ঘটেছিল। প্রাচীন বস্তু ও পবিত্র স্থানসমূহের প্রতি প্রবল আগ্রহ পশ্চিমা ক্রিশ্চনদের একটা প্রয়োজনীয় জিনিস হতে দূরে ঠেলে দিচ্ছিল: মানুষ যেন ঈশ্বর ছাড়া আর সবকিছুর দিকেই মনোনিবেশ করছিল।
