সুরিয়া শেকিনাহর নির্বাসনের আদি ইমেজের নতুন অর্থ দিয়েছেন। এখানে স্মরণ করা যেতে পারে, র্যাবাইগণ তালমুদে মন্দির ধ্বংসের পর শেকিনাহর স্বেচ্ছায় নির্বাসনে যাবার কথা বলেছেন। দ্য যোহার শেকিনাহকে সর্বশেষ সেফিরাহ আখ্যায়িত করে একে ঐশী সত্তার নারী রূপ হিসাবে দেখেছে। লুরিয়ার মিথে পাত্র ধ্বংস হওয়ার পর অন্যান্য সেফিরাহ্র সঙ্গে শেকিনারও পতন ঘটেছে। তিকুনের প্রথম পর্যায়ে সে নুকরাহয় পরিণত হয় এবং যায়েরের সঙ্গে মিলনের মাধ্যমে (ষষ্ঠ ‘মধ্য সেফিরদ) স্বর্গীয় জগতের সঙ্গে প্রায় পুনঃর্মিলিত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আদম যখন পাপ করলেন, আবার পতন ঘটল শেকিনাহর এবং গড়হেডের বাকি অংশ হতে নির্বাসিত হলো। প্রায় অনুরূপ এক ক্রিশ্চান মিথলজির জন্ম দেওয়া নসটিক রচনাবলী লুরিয়া পড়েছেন, এমন সম্ভাবনা ক্ষীণ। স্বতঃস্ফূর্তভাবেই নির্বাসন ও পতনের মিথ পুনকথন করেছেন তিনি, ষোড়শ শতাব্দীর করুণ পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে চেয়েছেন। বাইবেলিয় সময়কালে ইহুদিরা একক ঈশ্বরের মতবাদের বিকাশ ঘটানোর সময় স্বর্গীয় মিলন ও নির্বাসিত দেবীদের কাহিনী প্রত্যাখ্যান করেছিল। পৌত্তলিকতা ও বহুঈশ্বরবাদীতার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ যুক্তিসঙ্গতভাবেই সেফার্দিদের বিক্ষুদ্ধ করে তোলার কথা ছিল। কিন্তু তার বদলে লুরিয়ার মিথ পারসিয়া থেকে ইংল্যান্ড, জার্মানি থেকে পোল্যান্ড, ইতালি থেকে উত্তর আফ্রিকা, হল্যান্ড থেকে ইয়েমেনের ইহুদিরা আগ্রহের সঙ্গে গ্রহণ করেছিল। ইহুদি পরিভাষায় বর্ণিত হওয়ায় এটা একটা সুপ্ত তারে টোকা দিতে সক্ষম হয়, প্রবল হতাশার মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করে। এটা ইহুদিদের মাঝে এই বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছিল যে, তাদের অনেকেই ভীতিকর অবস্থায় বাস করা সত্ত্বেও এর একটা পরম অর্থ ও তাৎপর্য রয়েছে।
ইহুদিরা শেকিনাহর নির্বাসনের অবসান ঘটাতে পারে। মিতাভোতের অনুসরণের মাধ্যমে আবার তারা তাদের ঈশ্বরকে গড়ে তুলতে পারবে। প্রায় একই সময়ে ইউরোপে লুথার ও কালভিনের গড়ে তোলা প্রটেস্ট্যান্ট ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে এই মিথের মিল লক্ষণীয়। উভয় প্রটেস্ট্যান্ট সংস্কারকই ঈশ্বরের পরম সার্বভৌমত্বের প্রচার করেছেন তাঁদের ধর্মতত্ত্ব অনুযায়ী নিজেদের মুক্তির ক্ষেত্রে নারী বা পুরুষের কিছুই করার নেই। অবশ্য লুরিয়া কর্মের এক মতবাদ প্রচার করেছেন: ঈশ্বরের মানবজাতির বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে এবং তাদের প্রার্থনা ও সঙ্কর্ম ছাড়া তিনি এক অর্থে অসম্পূর্ণ রয়ে যাবেন। ইউরোপে ইহুদি জাতির ওপর নেমে আসা ট্র্যাজিডি সত্ত্বেও প্রটেস্ট্যান্টদের তুলনায় মানুষ সম্পর্কে অনেক বেশি আশাবাদী হতে পেরেছিল তারা। লুরিয়া তিকুনের মিশনকে ধ্যানের বিষয় হিসাবে দেখেছেন। ইউরোপের ক্রিশ্চানরা যেখানে-ক্যাথলিক ও প্রটেস্ট্যান্ট উভয়ই-আরও বেশি মাত্রায় ডগমা প্রণয়ন করছিল, লুরিয়া সেখানে ইহুদিদের এ ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের ঊর্ধ্বে ওঠা, ও অধিকতর মনোগত সচেতনতা সৃষ্টিতে সাহায্য করতে আব্রাহাম আবুলাফিয়ার অতিন্দ্রীয়বাদী কৌশল পুনরুজ্জীবিত করেন। আবুলাফিয়ার আধ্যাত্মিকতা স্বর্গীয় নাম পুনর্বিন্যাস করে কাব্বালিস্টকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, ঈশ্বরের অর্থ মানবীয় ভাষায় যথাযথভাবে তুলে ধরা যাবে না। লুরিয়ার মিথলজিতে ঐশী সত্তর পুনর্গঠন ও পুনঃআকৃতিধারণকেও প্রতীকায়িত করা হয়েছে। হাঈম বাইতাল লুরিয়ার অনুশীলনের প্রগাঢ় আবেগজাত প্রভাব বর্ণনা করেছেন, নিজেকে দৈনন্দিন স্বাভাবিক জীবনাচার হতে বিচ্ছিন্ন করে–অন্যরা যখন ঘুমে মগ্ন-তখন সজাগ থেকে, অন্যদের খাবার সময় উপাস থেকে, কিছু সময়ের জন্যে নিজেকে আলাদা করে-কাব্বালিস্ট স্বাভাবিক ভাষার সঙ্গে সম্পর্কহীন বিচিত্র বা অদ্ভুত শব্দসমূহের প্রতি মনোনিবেশ করতে পারত। নিজেকে অন্য জগতে আছে বলে মনে হয় তার, এমনভাবে সে কাঁপতে থাকে যেন বাইরের কোনও শক্তি তার ওপর ভর করেছে।
কিন্তু এখানে উদ্বেগের কোনও ব্যাপার ছিল না। লুরিয়া জোর দিয়ে বলেছেন, আধ্যাত্মিক অনুশীলন শুরু করার আগে কাব্বালিস্টকে অবশ্যই চিত্তের স্থিরতা অর্জন করতে হবে। সুখানুভূতি ও আনন্দ জরুরি; বুক চাপড়ানো বা বিষাদের কোনও ব্যাপার থাকতে পারবে না; কাজের ব্যাপারে কেউ উকণ্ঠা বা অনুতাপ বোধ করতে পারত না। বাইতাল জোর দিয়ে বলেছেন যে দুঃখ ও বেদনায় শেকিনাহ থাকতে পারে না-আমরা দেখেছি, এই ধারণা তালমুদে গভীরভাবে প্রোথিত। দুঃখবোধ আসে জগতের অশুভ শক্তি থেকে, অন্যদিকে সুখ কাব্বালিস্টকে ঈশ্বরকে ভালোবাসায় সক্ষম করে, তার সঙ্গে যুক্ত করে দেয়। কারও প্রতি-এমনকি গোয়িমদের প্রতিও না-কাব্বালিস্টের মনে কোনও রকম ক্রোধ বা আক্রমণাত্মক অনুভূতি থাকতে পারবে না। লুরিয়া ক্রোধ বা রাগকে বহুঈশ্বরবাদীতা হিসাবে দেখেছেন, কেননা ক্রুদ্ধ মানুষ অদ্ভুত দেবতা’য় আচ্ছন্ন থাকে। লুরিয়ার অতিন্দ্রীয়বাদের সমালোচনা করা সহজ। গারশ শোলেম যেমন যুক্তি দেখিয়েছেন, ঈশ্বর এন সফের রহস্য দ্য যোহারে খুব জোরাল হলেও সিমন্সুম, পাত্রের ভাঙন ও তিন এর নাটকীয়তায় যেন শিথিল হয়ে আসে। পরবর্তী অধ্যায়ে আমরা দেখব, এটা ইহুদিদের ইতিহাসে এক ধংসাত্মক ও বিব্রতকর পর্বের সূচনা করেছিল। তা সত্ত্বেও ঈশ্বর সম্পর্কে লুরিয়ার ধারণা এমন একটা সময়ে ইহুদিদের মাঝে আনন্দ ও দয়ার চেতনা জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করেছিল ও সেইসাথে মানুষ সম্পর্কে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণে উৎসাহ জুগিয়েছে যখন অপরাধবোধ ও ক্রোধের ফলে বহু। ইহুদি হতাশায় ডুবে জীবনের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলার আশঙ্কায় ছিল ।
