কিন্তু সাফেদ কাব্বালিজমের নায়ক ও সন্ন্যাসী ইসাক লুরিয়া (১৫৩৪ ১৫৭২) ঐশী দুয়েতা ও সর্বব্যাপীতার বৈপরীত্বকে আরও পূর্ণাঙ্গভাবে ব্যাখ্যা করার প্রয়াস পেয়েছিলেন। তার ধারণা ঈশ্বর সম্পর্কিত সৃষ্ট মতবাদসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বিস্ময়কর। অধিকাংশ ইহুদি অতিন্দ্রীয়বাদী তাদের ঐশী অভিজ্ঞতা সম্পর্কে নীরবতা পালন করেছে। এটা এই ধরনের আধ্যাত্মিকতার অন্যতম স্ববিরোধিতা যে অতিন্দ্রীয়বাদীরা তাদের অভিজ্ঞতা অনির্বচনীয় বলে কিন্তু তারপরেও সব লিপিবদ্ধ করতে প্রস্তুত থাকে। কাব্বালিস্টরা অবশ্য এ বিষয়ে সচেতন ছিল। লুরিয়া ছিলেন প্রথম যাদ্দাকিম বা পবিত্র পুরুষ যিনি ব্যক্তিগত ক্যারিশমার বদৌলতে অনুসারীদের দলে টানতে পেরেছিলেন। লেখক ছিলেন না তিনি; তার কাব্বালিস্ট পদ্ধতি সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের ভিত্তি হচ্ছে তাঁর অনুসারী হাঈম বাইতাল (১৫৪২-১৬২০) লিখিত কথোপকথন যা তাঁর নিবন্ধ এর হাইম (দ্য ট্রি অভ লাইফ) এবং যোজেফ ইবন তাকূল-এর পাণ্ডুলিপি, যা ১৯২১ সালের আগে প্রকাশিত হয়নি।
একেশ্বরবাদীদের শত শত বছর ধরে তাড়া করে আসা প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন লুরিয়া: একজন পূর্ণাঙ্গ এবং অসীম ঈশ্বর কীভাবে অশুভে পরিপূর্ণ অপূর্ণাঙ্গ বিশ্ব সৃষ্টি করলেন? অশুভ এসেছে কোত্থেকে? সেফিরদের উৎসারণের পূর্ববর্তী ঘটনার মাঝে জবাব খুঁজে পেয়েছেন লুরিয়া, যখন এন সফ মহান অন্তর্মুখীনতায় নিজের দিকে মনোযোগি হয়েছিলেন। বিশ্বজগতের জন্যে স্থান তৈরি করতে, শিক্ষা দিয়েছেন লুরিয়া, এন সফ, বলা হয়, নিজের মাঝে খানিকটা জায়গা ছেড়ে দেন। এই সংকোচন বা প্রত্যাহারে’র (তৃসিমতসুম) প্রক্রিয়ায় ঈশ্বর এমন একটা স্থান সৃষ্টি করেছিলেন যেখানে তিনি অনুপস্থিত, একটি শূন্যস্থান, যা তিনি আত্মপ্রকাশ ও সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় পূর্ণ করতে থাকেন। শূন্য হতে সৃষ্টির মতবাদ ব্যাখ্যার এক দুঃসাহসী প্রয়াস ছিল এটা। এন সফের সর্বপ্রথম কাজ ছিল আপন একটা অংশ হতে স্ব-আরোপিত নির্বাসন; তিনি, যেমন বলা হয়েছে, আপন সত্তায় আরও গভীরভাবে অবতরণ করে নিজের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছেন। এই ধারণাটি ক্রিশ্চানদের ট্রিনিটি মতবাদে কল্পনা করা আদিম কেনোসিসের চেয়ে ভিন্ন নয়, যেখানে ঈশ্বর নিজেকে আপন পুত্রের মাঝে শূন্য করে নিজেকে প্রকাশ করেছিলেন। ষোড়শ শতাব্দীর কাব্বালিস্টদের বেলায় প্রাথমিকভাবে তসিসুম নির্বাসনের প্রতীক ছিল, যা সকল সৃষ্ট অস্তিত্বের মূলে নিহিত এবং স্বয়ং এন সফ যার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন।
ঈশ্বরের প্রত্যাহারের ফলে সৃষ্ট ‘শূন্য’ স্থানটিকে বৃত্ত হিসাবে কল্পনা করা হয়েছে, যার চারদিকে রয়েছেন এন সফ। এটা জেনেসিসে বর্ণিত আকার বিহীন আবর্জনা তহু উ-বহু। তুসিসুম-এর সঙ্কোচনের আগে ঈশ্বরের বিভিন্ন ‘শক্তির’ সবগুলো (পরে যা সেফিরদে পরিণত হবে) সামঞ্জস্যতার সঙ্গে পরস্পরের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। একটি অপরটি হতে আলাদা ছিল না। বিশেষ করে ঈশ্বরের হেসেদ (করুণা) ও দিন (কঠোর বিচার) নিখুঁত সামঞ্জস্যতার সঙ্গে ঈশ্বরের মাঝে অস্তিত্বমান ছিল। কিন্তু তুসিমতসুম প্রক্রিয়া চলার সময় এস সফ তার অন্যান্য গুণাবলী হতে দিনকে বিচ্ছিন্ন করে ছেড়ে আসা শূন্য স্থানে ঠেলে দেন। এভাবে সিমসুম কেবল আত্ম-শূন্যকারী প্রেমের ভঙ্গিমা নয়, বরং একে ঐশী পরিশুদ্ধতা হিসাবে দেখা যেতে পারে: ঈশ্বর তাঁর ক্রোধ বা বিচার (দ্য যোহার যাকে অশুভের মূল হিসাবে দেখেছে) আপন অন্তস্থঃ সত্তা হতে বিচ্ছিন্ন করেছিলেন । সুতরাং তাঁর আদি কাজটি ছিল নিজের প্রতি দেখানো রূঢ়তা ও নিষ্ঠুরতা। হেসেদ ও ঈশ্বরের অন্যান্য গুণাবলী হতে দিন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় এটা বিধ্বংসী ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠে। কিন্তু এন সফ শূন্য স্থানটুকু পুরোপুরিভাবে ত্যাগ করেননি। ঐশী আলোর একটা ‘ক্ষীণ রেখা’ এই বৃত্তকে ছেদ করে এমন একটা আকার গ্রহণ করেছিল যাকে দ্য যোহার আদম কাদমোন বা আদিম পুরুষ আখ্যায়িত করেছে।
এরপর সূচিত হয়েছে সেফিরদের উৎসারণ, যদিও তা দ্য যোহারে যেভাবে ঘটার কথা বলা হয়েছে সেভাবে ঘটেনি। লুরিয়া শিক্ষা দিয়েছেন যে, সেফিরদ গঠিত হয়েছিল আদম কাদমমানে: সর্বোচ্চ তিনটি সেফিরদ-কেদার (মুকুট), হোখমাহ (প্রজ্ঞা) ও বিনাহ (বুদ্ধিমত্তা)-যথাক্রমে তার নাক, কান এবং মুখ’ হতে বিকিরিত হয়েছে। কিন্তু এরপর ঘটে এক বিপর্যয়, লুরিয়া যাকে বলেছেন ‘পাত্রের ভাঙন’ (শেভিরাদ হা কেলিম)। সেফিরদসমূহকে আলাদা আবরণ বা পাত্রে রাখার প্রয়োজন ছিল, এগুলোকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার জন্যে আবার যাতে আগের ঐক্যে ফিরে যেতে না পারে সেটা নিশ্চিত করার জন্যে। এইসব ‘পাত্র’ বা ‘পাইপ’ অবশ্যই ধাতব ছিল না, বরং এক ধরনের গাঢ় বা পুরু আলো যা সেফিরদ-এর খাঁটি আলোর ‘আবরণ’ (কেলিপত) হিসাবে কাজ করত। সর্বোচ্চ তিনটি সেফিরদ আদম কাদমোন হতে ঝিকরিত হওয়ার সময় সেগুলোর পাত্র ঠিকই কাজ করেছিল; কিন্তু পরবর্তী ছয়টি সেফিরদ তার চোখ থেকে বের হওয়ার সময় সেগুলোর ‘পাত্রগুলো ঐশী আলো ধরে রাখার মতো যথেষ্ট মজবুত ছিল না বলে দুমড়ে মুচড়ে যায়। পরিণামে আলো বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। এর কিছু অংশ ঊর্ধ্বারোহণ করে গডহেডে ফিরে যায়, কিন্তু কিছু ঐশী বা স্বর্গীয় ‘ফুলিঙ্গ’ ফাঁকা আবর্জনায় পতিত হয়ে বিশৃঙ্খলায় আটকা পড়ে। এরপর আর কোনও কিছুই যথাস্থানে থাকেনি। বিপর্যয়ের ফলে এমনকি সর্বোচ্চ তিনটি সেফিরদও নিম্ন পর্যায়ের বলয়ে পতিত হয়েছিল। আদি সামঞ্জস্যতা বিঘ্নিত হয়েছিল এবং স্বর্গীয় ‘ফুলিঙ্গ’গুলো গডহেডের কাছ থেকে নির্বাসনে আকারবিহীন তহু উ-বহুর আবর্জনায় হারিয়ে গেছে।
