কাব্বালিজমের এই নতুন ধরণ সম্ভবত অটোমান সাম্রাজ্যের বালকান অঞ্চলে সূচিত হয়েছিল, যেখানে বহু সেফার্দিম বসতি গড়ে তুলেছিল। ১৪৯২ সালের ট্র্যাজিডি যেন পয়গম্বরদের ভবিষ্যদ্বাণীর ইসরায়েলের নিস্কৃতির জন্যে ব্যাপক আকাক্ষার জন্ম দিয়েছিল। জোসেফ কারো ও সলোমন আলকাবা এর নেতৃত্বে কিছুসংখ্যক ইহুদি প্রিস হতে ইসরায়েলের মাতৃভূমি প্যালেস্তাইনে অভিবাসী হয়। ইহুদি ও তাদের ঈশ্বরের ওপর চাপানো অপমান দূর করতে চেয়েছে তাদের আধ্যাত্মিকতা। তারা তাদের ভাষায় ‘ধুলি হতে আবার শেকিনাহর উত্থান চেয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক সমাধান কামনা করেনি কিংবা প্রতিশ্রুত ভূমিতে ইহুদিদের ব্যাপক হারে প্রব্যার্তনও আশা করেনি। তারা গালিলির সাকেঁদে বসতি করে এমন উল্লেখযোগ্য এক অতিন্দ্রীয়বাদী পুনর্জাগরণের সৃষ্টি করে যা তাদের আবাসভূমিহীনতায় এক গভীর তাৎপর্য আবিষ্কার করেছিল। এতদিন পর্যন্ত কাব্বালাহার আবেদন ছিল কেবল অভিজাত শ্রেণীর কাছে, কিন্তু বিপর্যয়ের পর সারা দুনিয়ার ইহুদিরা আরও অধিকতর অতিন্দ্রীয় আধ্যাত্মিকতার দিকে প্রবলভাবে ঝুঁকে পড়েছিল। এ সময় দর্শনের সান্ত্বনাকে যেন ফাঁকা মনে হয়েছে। অ্যারিস্টটলকে মনে হয়েছে বিরস ও তার ঈশ্বরকে দূরবর্তী, অগম্য। প্রকৃতপক্ষেই অনেকেই বিপর্যয়ের জন্যে ফালসাফাহকে দায়ী করে দাবি তোলে যে এর ফলে ইহুদিবাদ দুর্বল হয়ে পড়েছে ও ইসরায়েলের ভিন্ন মর্যাদাবোধ হাল্কা হয়েছে। এর বিশ্বজনীনতা ও জেন্টাইল দর্শনকে স্থান দেওয়ায় বহু ইহুদি ব্যাপ্টিজম গ্রহণ করেছিল। ফালসাফাহ আর কখনও ইহুদিবাদের পরিসীমায় গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিকতা হয়ে উঠতে পারেনি।
মানুষ আরও প্রত্যক্ষভাবে ঈশ্বরকে অনুভব করতে চেয়েছে। সাফেদে এই আকাক্ষা প্রায় অদম্য প্রাবল্য অর্জন করেছিল। কাব্বালিস্টরা প্যালেস্তাইনের পাহাড়-পর্বতে ঘুরে ঘুরে বিখ্যাত তালামুদিস্টদের কবরে শুয়ে নিজেদের ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ জীবনের তাদের দর্শন আত্মস্থ করার আকাঙ্ক্ষা করত। ব্যর্থ প্রেমিকের মতো নিদ্রাহীন রাত কাটিয়ে ঈশ্বরের নামে প্রেমের গান গাইত ও প্রিয় সব নামে তাঁকে ডাকত। তারা আবিষ্কার করে যে, মিথলজি ও কাব্বালাহর অনুশীলন তাদের বাধা ভেদ করে এমনভাবে আত্মার বেদনাস্থল ছুঁয়েছে যেটা মেটাফিজিক্স বা তালমুদ পাঠে সম্ভবপর হয়নি। কিন্তু তাদের অবস্থা যেহেতু দ্য যোহারে রচয়িতা মোজেস অভ লিওনের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন ছিল, সেজন্য স্প্যানিশ নির্বাসিতদের নিজেদের বিশেষ অবস্থার সঙ্গে সেই দর্শনকে খাপ খাইয়ে নিতে হয়েছে। তারা এমন এক অসাধারণ রকম কল্পনানির্ভর সমাধানে পৌঁছেছিল যা পুরোপুরি উনুল অবস্থাকে পরম ঈশ্বরপূর্ণতার সঙ্গে এক করে দিয়েছে। ইহুদিদের নির্বাসন সকল অস্তিত্বের একবারে মূলে চরম স্থানচ্যুতিকে প্রতীকায়িত করে। কেবল গোটা সৃষ্টি জগৎ যে স্থানচ্যুত হয়েছে তাই নয়, স্বয়ং ঈশ্বরও নিজের কাছ থেকে নির্বাসিত হয়েছেন। সাফেদের নতুন কাব্বালাহ রাতারাতি জনপ্রিয়তা অর্জন করে এমন এক গণআন্দোলনের রূপ নেয় যা কেবল সেফামিদেরই অনুপ্রাণিত করেনি বরং ইউরোপের অ্যাশকানিজমের জগতে নতুন আশার সঞ্চার করেছিল-যারা খৃস্টধর্ম জগতে তাদের কোনও স্থায়ী শহর না থাকার ব্যাপারটি আবিষ্কার করেছিল। এই অসাধারণ সাফল্য দেখায় যে, অচেনা ও বহিরাগতের চোখে বিসদৃশ সাফেদের মিথের ইহুদিদের অবস্থা তুলে ধরার ক্ষমতা ছিল। এটা ছিল সর্বজনগ্রাহ্য শেষ ইহুদি আন্দোলন যা বিশ্বের ইহুদি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় চেতনায় গভীর পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল। কাব্বালাহর বিশেষ অনুশীলন কেবল একজন অভিজাত শিক্ষাব্রতীর জন্যে ছিল কিন্তু এর ধারণা ও ঈশ্বর সংক্রান্ত এর মতবাদ-ইহুদিদের ধর্মানুরাগের ক্ষেত্রে প্রমিত মানে পরিণত হয়েছিল।
ঈশ্বর সংক্রান্ত এই নতুন দর্শনের প্রতি সুবিচার করার জন্যে আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে এইসব মিথকে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করার কথা বোঝানো হয়নি। সাফেদ কাব্বালিস্টরা তাদের ব্যবহৃত ইমেজারিগুলো অত্যন্ত বেপরোয়া হওয়ার বেলায় সজাগ ছিল, তাই এগুলোর সঙ্গে সবসময় যেমন বলা হয় বা যে কেউ ভাবতে পারে’ ধরনের অভিব্যক্তি জুড়ে দিয়েছে। কিন্তু ঈশ্বর সম্পর্কে যেকোনও ধরনের আলোচনাই সমস্যাপূর্ণ, বিশ্ব সৃষ্টির বাইবেলিয় মতবাদও কম নয়। কাব্বালিস্টরাও ঠিক ফায়সালুফদের মতোই এক্ষেত্রে অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছিল । উভয় দলই উৎসারণের প্লেটোনিক উপমা বেছে নিয়েছিল যেখানে মনে করা হয় যে, বিশ্বজগৎ চিরন্তনভাবে ঈশ্বরের নিকট হতে প্রবাহিত হচ্ছে। পয়গম্বরগণ ঈশ্বরের পবিত্রতা ও বিশ্বজগৎ হতে তার বিচ্ছিন্নতার ওপর জোর দিয়েছেন, কিন্তু দ্য যোহার মত প্রকাশ করেছে যে, ঈশ্বরের সেফিরদের জগৎ সমগ্র সত্তা দিয়ে সংগঠিত। তিনি সর্বেসর্বা হলে বিশ্বজগৎ হতে বিচ্ছিন্ন হবেন কী করে? সাফেদের মোজেস বেন জেকব কর্দাভেরো (১৫২২-১৫৭০) এই বৈপরীত্য স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করে এর সমাধানের প্রয়াস পেয়েছেন। তার ধর্মতত্ত্ব অনুসারে ঈশ্বর এন সফ আর অগম্য গডহেড নন, বরং জগতের চিন্তা: আদর্শ প্লেটোনিক অবস্থানে তিনি সকল সৃষ্ট বস্তুর সঙ্গে একীভূত; কিন্তু মর্ত্যের ত্রুটিপূর্ণ আকৃতি হতে বিচ্ছিন্ন: যতক্ষণ অস্তিত্বমান সবকিছুই তার অস্তিত্বের মাঝে ততক্ষণ (ঈশ্বর) সকল অস্তিত্বকে আবৃত করেন, ব্যাখ্যা করেছেন তিনি, তাঁর সেফিরদে তাঁর সত্তা উপস্থিত আছেন; তিনি স্বয়ং সবকিছু এবং তার বাইরে কোনও কিছুর অস্তিত্ব নেই। ইবন আল-আরাবী ও মোল্লা সদরার মোনিজমের খুব কাছাকাছি ছিলেন তিনি।
