সুহরাওয়ার্দির মতো মোল্লা সদরাও বিশ্বাস করতেন যে, জ্ঞান কেবল তথ্য আহরণ নয় বরং পরিবর্তনের একটি প্রক্রিয়া। সুহরাওয়ার্দির আলম আল মিথাল তার চিন্তাধারায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল: তিনি স্বয়ং স্বপ্ন ও দিব্য দর্শনকে সত্যের সর্বোচ্চ রূপ হিসাবে দেখেছেন। সুতরাং ইরানি শিয়াহবাদ তখনও সাধারণ বিজ্ঞান ও মেটাফিজিক্সের চেয়ে অতিন্দ্রীয়বাদকেই ঈশ্বরকে জানার সবচেয়ে জুৎসই উপায় হিসাবে দেখছিল। মোল্লা সদরা শিক্ষা দিয়েছেন যে, ঈশ্বরের নৈকট্য লাভ বা ইমেটিশিও দেই (imitatio dei) দর্শনের লক্ষ্য এবং একে কোনও বিশেষ ক্ৰীড বা ধর্ম বিশ্বাসে সীমিত রাখা যাবে না। ইবন সিনা যেমন দেখিয়েছিলেন, কেবল পরম সত্তা ঈশ্বরেরই প্রকৃত অস্তিত্ব (উজুদ)। রয়েছে এবং এই একক সত্তাটি স্বর্গীয় জগৎ হতে শুরু করে বালু কণা পর্যন্ত সকল সত্তার গোটা ধারাবাহিকতাকে অনুপ্রাণিত করেন। মোল্লা সদরা সর্বেশ্বরবাদী ছিলেন না। তিনি স্রেফ ঈশ্বরকে অস্তিত্বমান সকল বস্তুর উৎস হিসেবে দেখেছেন: আমরা যেসব বস্তু বা সত্তা দেখি বা অনুভব করি সেগুলো সীমিত পরিসরে ঐশী আলোক বহনকারী মাত্র। তারপরেও ঈশ্বর পার্থিব বাস্তবতার ঊর্ধ্বে। সকল বস্তুর ঐক্য এটা বোঝায় না যে, কেবল ঈশ্বরেরই অস্তিত্ব রয়েছে বরং এর সঙ্গে সূর্য ও বিকিরিত রশ্মির ঐক্যর মিল রয়েছে। ইবন আল-আরাবীর মতো মোল্লা সদরা ঈশ্বরের সত্তা বা তাঁর ‘অন্ধত্বকে এর বিভিন্ন অভিব্যক্তি হতে আলাদাভাবে দেখেছেন। তাঁর দর্শনের সঙ্গে গ্রিক হেসিচ্যাস্ট কাব্বালিস্টদের ধ্যান-ধারণার খুব একটা অমিল নেই। গোটা সৃষ্টির জগতকে ‘অন্ধত্ব হতে বিকিরিত হয়ে বহু স্তর বিশিষ্ট একটা রত্ন’-এর গঠন হিসাবে দেখেছেন তিনি যাকে আবার ঈশ্বরের তার গুণাবলী বা ‘নিদর্শন সমূহের’ (আয়াত) মাধ্যমে আত্মপ্রকাশের পর্যায়ক্রম হিসাবেও বিবেচনা করা যেতে পারে। এগুলো অস্তিত্বের উৎসে প্রত্যাবর্তনে মানুষের বিভিন্ন পর্যায়েরও প্রতিনিধিত্ব করে।
ঈশ্বরের সঙ্গে মিলিত হওয়ার ব্যাপারটি পরকালের জন্যে সংরক্ষিত নয় । হেসিচ্যাস্টদের কারও কারও মতো মোল্লা সদরা বিশ্বাস করতেন যে, জ্ঞানের মাধ্যমে ইহজগতেই তা উপলব্ধি করা সম্ভব। বলাবাহুল্য, তিনি কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক যৌক্তিক জ্ঞানের কথা বোঝননিঃ ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে ঊর্ধ্বরোহণের সময় অতিন্দ্রীয়বাদীকে দিব্যদর্শন ও কল্পনার জগৎ আলম আল-মিথাল-এর। ভেতর দিয়ে অগ্রসর হতে হয়। ঈশ্বর বস্তুনিষ্ঠভাবে জানার মতো কোনও সত্তা নন, কিন্তু প্রত্যেক মুসলিমের কল্পনা-প্রবণ গুণের মাঝেই তাকে পাওয়া যাবে। কোরান বা হাদিস যখন স্বর্গ, নরক বা ঈশ্বরের আসনের কথা বলে, তখন এগুলো অন্যত্র অবস্থিত কোনও বাস্তবতার কথা বোঝায় না বরং বোধগম্য আড়ালে লুক্কায়িত এক অন্তর্জগতের কথা বোঝায়:
মানুষ যা কিছু কামনা করে, যা কিছু আশা করে, সঙ্গে সঙ্গে তা তার কাছে উপস্থিত হয় বা বলা উচিত তার ইচ্ছাকে রূপ দেওয়াই এর বস্তুর প্রকৃত উপস্থিতির অভিজ্ঞতা। কিন্তু মিষ্টতা ও আনন্দ হচ্ছে স্বর্গ ও নরক, শুভ ও অশুভ এর প্রকাশ, যা পরকালের জগতের শান্তিস্বরূপ মানুষের কাছে পৌঁছতে পারে, মানুষের অত্যাবশ্যকীয় ‘অমিত্ব’ ছাড়া যার আর কোনও উৎস নেই, যার গঠনের মূলে রয়েছে তার ইচ্ছা ও অভিক্ষেপ, অন্তর্গত বিশ্বাসসমূহ আর তার আচরণ।
ইবন আল-আরাবীকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করতেন মোল্লা সদরা, তিনি তার মতো ঈশ্বরকে ভিন্ন এক জগতে অবস্থানরত বহিস্তঃ স্বর্গীয় সত্তা হিসাবে দেখেননি যার কাছে বিশ্বাসীরা মৃত্যুর পর প্রত্যাবর্তন করবে। নিজের মাঝেই ব্যক্তিগত আলম-আল মিথালে, স্বর্গ ও ঐশী জগতকে আবিষ্কার করতে হবে, যা প্রতিটি মানুষের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দুজন ব্যক্তির স্বর্গ বা ঈশ্বর হুবহু এক রকম হবে না।
সুন্নী, সুফী ও গ্রিক দার্শনিকদের মতো শিয়াহ ইমামদেরও শ্রদ্ধাকারী মোল্লা সদরা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, ইরানের শিয়া মতবাদ সবসময় বিশেষ ধরনের ও ধর্মান্ধ ছিল না। ভারতের বহু মুসলিম অন্যান্য ধর্ম বিশ্বাসের প্রতি অনুরূপ সহিষ্ণু মনোভাব গড়ে তুলেছিল। যদিও মুঘল ভারতে সাংস্কৃতিক দিক থেকে ইসলামের প্রাধান্য ছিল, কিন্তু হিন্দুধর্মও গুরুত্বপুর্ণ ও সৃজনশীল রয়ে গিয়েছিল; মুসলিম ও হিন্দুদের কেউ কেউ শিল্পকলা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরস্পরকে সহযোগিতা করেছে। ভারতীয় উপমহাদেশ বহুদিন আগে থেকেই ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা হতে মুক্ত ছিল। চতুর্দশ পঞ্চদশ শতাব্দীতে হিন্দু ধর্মমতের সর্বাধিক সৃজনশীল ধারা ধর্মীয় আশা আকাঙ্খার একতার ওপর জোর দিয়েছে: সকল পথই বৈধ, যদি একক ঈশ্বরের প্রতি প্রেমে গুরুত্ব দেয়। এর সঙ্গে সুফীবাদ ও ফালসাফাহ্র স্পষ্ট মিল রয়েছে যা ভারতে ইসলামের সবচেয়ে প্রাধান্য বিস্তারকারী ধরণ ছিল। মুসলিম ও হিন্দুদের কেউ কেউ আন্তঃধর্মীয় সমাজ গড়ে তুলেছিল। এগুলোর মাঝে পঞ্চদশ শতাব্দীতে গুরু নানক প্রতিষ্ঠিত শিখ ধর্মমত সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ হয়ে ওঠে। এ নতুন ধরনের একেশ্বরবাদের বিশ্বাস ছিল যে, আল্লাহ ও হিন্দুদের ঈশ্বর একই। মুসলিমদের দিক থেকে মির দামাদ এবং মোল্লা সদরার। সমসাময়িক ইরানি পণ্ডিত মির আবু আল-কাসিম ফিন্দিরিস্কি (মৃত্যু, ১৬৪১) ইস্পাহানে ইবন সিনার রচনাবলী শিক্ষা দান করলেও ভারতে হিন্দু ধর্মমত ও যোগ সাধনা নিয়ে গবেষণায় প্রচুর সময় ব্যয় করেছেন। এ সময় তোমাস আকুইনাসের ওপর কোনও বিশেষজ্ঞ রোমান ক্যাথলিকেরা আব্রাহামের ঐতিহ্য বহন করছে না এমন এক ধর্মের প্রতি একইরকম আগ্রহ দেখানোর কথা কল্পনা করাও কঠিন ছিল।
