প্রকৃতপক্ষে এই সময়ে ইসলাম ছিল বিশ্বের পরাশক্তি পশ্চিম ইউরোপ দোরগোড়ায় এর উপস্থিতি সম্পর্কে সম্পর্ক সচেতন ছিল। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে তিনটি নতুন ইসলামি সাম্রাজ্যের পত্তন ঘটে: এশিয়া মাইনর ও পূর্ব ইউরোপে অটোম্যান তুর্কী সাম্রাজ্য, ইরানে সাফাভিয়দের সাম্রাজ্য ও ভারতে মুঘোলদের সাম্রাজ্য। নয়া এই প্রয়াসগুলো দেখায় যে, ইসলামি চেতনা কোনও অর্থেই মরণোন্মুখ ছিল না বরং দুর্যোগ ও ধ্বংসের পর মুসলিমদের আবার সফল হওয়ার প্রেরণা জাগানোর ক্ষমতা এর রয়েছে। প্রত্যেকটি সাম্রাজ্যই যার যার নিজস্ব পরিমণ্ডলে সাংস্কৃতিক বিকাশ অর্জন করেছিল: ইরান ও মধ্য এশিয়ার সাফাভিয় রেনেসাঁ লক্ষণীয়ভাবে ইতালিয় রেনেসাঁর অনুরূপ ছিল: উভয় সংস্কৃতিই চিত্রকলায় নিজেদের তুলে ধরেছে ও সৃজনশীলতার সঙ্গে আবার তাদের সংস্কৃতির পৌত্তলিক উৎসে ফিরে যাবার অনুভুতি বোধ করেছে। অবশ্য এ তিনটি সাম্রাজ্যের ক্ষমতা ও চমৎকারিত্ব সত্ত্বেও যাকে বলা হয়। রক্ষণশীল চেতনা অব্যাহত রয়ে গিয়েছিল। আল-ফারাবী ও ইবন-আল আবাবীর মতো পূর্ববর্তীকালের অতিন্দ্রীয়বাদী ও দার্শনিকরা যেখানে নতুন জগৎ আবিষ্কারের ব্যাপারে সচেতন ছিলেন, যেখানে এই পর্যায়ে প্রাচীন চিন্তা বা থিমেরই সূক্ষ্ম ও জটিল পুনরুত্থান ঘটতে দেখা গেছে। ফলে পশ্চিমাদের পক্ষে বিষয়টি বোঝা আরও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ আমাদের পণ্ডিতগণ এসব আধুনিক ইসলামি প্রয়াসকে দীর্ঘদিন করে উপেক্ষা করে এসেছেন। এছাড়াও, দার্শনিক ও কবিগণ আশা করেন তাদের পাঠকদের মন অতীতের ইমেজ আর ধারণায় পরিপুর্ণ।
অবশ্য, পাশ্চাত্যের পরিবর্তনের সমান্তরাল অগ্রগতির নজীরও ছিল । সাফাভিয়দের অধীনে এক নতুন ধরনের দ্বাদশবাদী শিয়াবাদ ইরানের রাষ্ট্রধর্মে পরিণত হয়েছিল; এর ফলে নজীরবিহীনভাবে শিয়াহ ও সুন্নীদের মাঝে সূচিত হয়েছিল বৈরিতার। এতদিন পর্যন্ত অধিকতর বুদ্ধিজীবী বা অতিন্দ্রীয়বাদী সুন্নীদের সঙ্গে শিয়াদের বহু ক্ষেত্রেই মিল ছিল। কিন্তু ষোড়শ শতাব্দীতে এরা দুটি বিবদমান শিবির গড়ে তোলে যার সঙ্গে একই সময়ে ইউরোপে সংঘটিত ধর্মীয় গোষ্ঠীগত সংঘাতের দুঃখজনক সাদৃশ্য রয়েছে। সাফাভিয় বংশের প্রতিষ্ঠাতা শাহ ইসমাইল ১৫০৩ সালে আযেরবাইজানের ক্ষমতায় আরোহণ করেন এবং পশ্চিম ইরান ও ইরাকে ক্ষমতার বিস্তার ঘটান। সুন্নী মতবাদ উচ্ছেদ করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন তিনি, অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে প্রজাদের ওপর শিয়া মতবাদ চাপিয়ে দেওয়ার প্রয়াস পেয়েছিলেন, যা আগে বিরল ছিল । নিজেকে প্রজন্মের ইমাম মনে করেছেন তিনি। এই আন্দোলনের সঙ্গে ইউরোপের প্রটেস্ট্যান্ট সংস্কারের মিল ছিল: উভয়ের মূলে ছিল প্রতিবাদ, উভয়ই আভিজাত্যবাদের বিরুদ্ধে ছিল এবং জড়িত ছিল রাজকীয় সরকার গঠনের সঙ্গে। শিয়ারা তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলসমূহ থেকে এমনভাবে সুফী ত্বরিকাসমূহের উচ্ছেদ ঘটিয়েছিল যা প্রটেস্ট্যান্টদের মঠ বিলুপ্ত করার কথা মনে করিয়ে দেয়। এখানে বিস্ময়ের কিছু নেই যে, এর ফলে অটোমান সাম্রাজ্যের সুন্নীদের মাঝেও এক নিরাপোস মনোভাব জেগে ওঠেছিল, যারা তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার শিয়াদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছিল। ক্রুসেড়ে লিপ্ত পাশ্চাত্যের বিরুদ্ধে নিজেদের পবিত্র ধর্ম-যুদ্ধের একেবারে প্রথম কাতারে আবিস্কার করে অটোমানরা তাদের ক্রিশ্চান প্রজাদের বিরুদ্ধেও এক নতুন অসহিষ্ণু মনোভাব গড়ে তোলে। তবে গোটা ইরানি প্রশাসনকে ধর্মান্ধ বিবেচনা করা ভুল হবে। ইরানের শিয়াহ্ উলেমাগণ এই সংস্কৃত শিয়াদের তীর্যক দৃষ্টিতে দেখেছেন: সুন্নী প্রতিপক্ষের বিপরীতে তারা ইজতিহাদের পথ বন্ধ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ও শাহুদের নিকট থেকে স্বাধীনতাকে ইসলামকে ব্যাখ্যা করার অধিকারের ওপর জোর দিয়েছেন। তারা সাভাভিয় এবং পরে কাজার বংশকে ইমামদের উত্তরাধিকারী হিসেবে গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তার বদলে শাসকদের বিরুদ্ধে জনগণের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন এবং ইস্পাহান এ পরে তেহরানে রাজকীয় নির্যাতনের বিরুদ্ধে উন্মাহর নেতায় পরিণত হয়েছেন। শাহৃদের অন্যায় হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে বণিক সমাজ ও দরিদ্র জনসাধারণের অধিকার রক্ষার এক রেওয়াজ গড়ে তুলেছিলেন তারা যা তাঁদের ১৯৭৯ সালে শাহ মুহাম্মদ রেযা পাহলতীর বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত করতে সক্ষম করে তুলেছিল।
ইরানের শিয়ারাও নিজস্ব ফালসাফাহ গড়ে তুলেছিল, যা সুহরাওয়ার্দির অতিন্দ্রীয়বাদী ধারা অব্যাহত রাখে। শিয়াহ্ ফালসাফাহর প্রতিষ্ঠাতা মির দামাদ (মৃত্যু, ১৬৩১) একাধারে বিজ্ঞানী ও ধর্মতাত্ত্বিক ছিলেন। ঐশী আলোকে তিনি মুহাম্মদ (স) এবং ইমামদের মতো প্রতীকী চরিত্রের আলোকনের সঙ্গে এক করে দেখেছেন। সুহরাওয়ার্দির মতো তিনিও ধর্মীয় অনুভূতির অবচেতন মনস্তাত্ত্বিক উপাদানের ওপর জোর দিয়েছিলেন। তবে এ ইরানি মতবাদের মূল রূপকার ছিলেন মির দামাদের শিষ্য সদর আলদিন রাযি, সাধারণভাবে যিনি মোল্লা সদরা (১৫৭১-১৬৪০) নামে পরিচিত। আজকের দিনে বহু মুসলিম তাকে সর্বমহান ইসলামি চিন্তাবিদ হিসেবে বিবেচনা করে থাকে, তারা মনে করে, তিনি মুসলিম দর্শনের বৈশিষ্ট্যে পরিণত মেটাফিজিক্স ও আধ্যাত্মিকতার সংশ্লেষ ঘটাতে পেরেছিলেন। অবশ্য পশ্চিমে সবে তিনি পরিচিত হয়ে উঠতে শুরু করেছেন এবং এই গ্রন্থ রচনার সময় তাঁর মাত্র একটি নিবন্ধ ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে।
