গ্রিক, ইহুদি ও মুসলিমদের জন্যেও এক সঙ্কট কাল ছিল এটা। ১৪৫৩ সালে অটোমান তুর্কীরা ক্রিশ্চান রাজধানী কন্সতান্তিনোপল অধিকার করে ও বাইযান্তিয় সাম্রাজ্য ধ্বংস করে দেয়। এরপর থেকে রুশ ক্রিশ্চানরা গ্রিক উদ্ভাবিত প্রথা ও আধ্যাত্বিকতা অনুসরণ অব্যাহত রাখে। ক্রিস্টোফার। কলোম্বাসের নতুন বিশ্ব আবিষ্কারের বছর, ১৪৯২ সালে ফের্নিনান্দ ও ইসাবেলা ইউরোপের শেষ মুসলিম শক্ত ঘাঁটি স্পেনের গ্রানাদা অধিকার করে নেন: পরবর্তী সময়ে মুসলিমদের বাসভূমি ইবেরিয় পেনিনসুলা থেকেও উচ্ছেদ করা হয়। স্পেনের মুসলিমদের বিনাশ ইহুদিদের জন্যে মারাত্মক হয়ে দাঁড়ায়। গ্রানাদা দখল করার কয়েক সপ্তাহ পার হওয়ার পর ১৪৯২ সালের মার্চ মাসে ক্রিশ্চান শাসকগণ ইহুদিদের খৃস্টধর্ম গ্রহণ বা নির্বাসনের যেকোনও একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ দেন। স্প্যানিশ ইহুদিদের অনেকেরই দেশের প্রতি এত প্রবল টান ছিল যে, তারা ক্রিশ্চান হয়ে গেলেও কেউ কেউ ইসলাম হতে ধর্মান্ত রিত মরিসকোসদের মতো গোপনে ধর্মচর্চা অব্যাহত রাখে: এই ইহুদি ধর্মান্ত রিতদের পরে ধর্মদ্রোহী সন্দেহ করে ইনকুইজিশন তাড়া করে বেড়িয়েছিল। অবশ্য প্রায় ১৫০,০০০ ইহুদি খৃস্টধর্ম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়, তাদের জোরপূর্বক স্পেন ত্যাগে বাধ্য করা হয়: এরা তুরস্ক, বালকান অঞ্চল ও উত্তর আফ্রিকায় আশ্রয় নেয়। স্পেনের মুসলিমরা ডায়াসপোরার ইহুদিদের জন্যে সেরা বাসভুমি গড়ে দিয়েছিল, ফলে স্প্যানিশ ইহুদিদের বিনাশকে গোটা পৃথিবীর ইহুদিরা সিই ৭০-এ মন্দির ধ্বংসের পর তাদের জাতির ওপর নেমে আসা ভয়ঙ্করতম দুর্যোগ হিসাবে দেখেছে। অতীতের যেকোনও সময়ের চেয়ে আরও গভীরভাবে ইহুদিদের ধর্মীয় চেতনায় নির্বাসনের বোধ স্থান করে নেয়: ফলে এক নতুন ধরনের কাব্বালাহ জন্ম লাভ করে, ঈশ্বর সম্পর্কে নতুন ধারণার সৃষ্টি হয়।
বিশ্বের অন্যান্য স্থানের মুসলিমদের জন্যেও জটিল সময় ছিল এটা। মঙ্গল আক্রমণ পরবর্তী শতাব্দীগুলোয়-সম্ভবত অনিবার্যভাবে-এক নতুন ধরনের রক্ষণশীলতা গড়ে উঠেছিল, জনগণ যেন এতে সম্পদ পুনরুদ্ধারের প্রয়াস পেয়েছে। পঞ্চদশ শতাব্দীতে ইসলামি বিদ্যাপীঠ মাদ্রাসার সুন্নী উলেমাগণ ঘোষণা করেন যে, ইজতিহাদের (স্বাধীন যুক্তি প্রয়োগ) পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এখন থেকে মুসলিমদের অতীতের মহান, বিশেষ করে শরীয়াহ বা পবিত্র আইনের জ্ঞানী ব্যক্তিদের অনুসরণ’ (তাকলিদ) করতে হবে। এ রকম রক্ষণশীল আবহে ঈশ্বর বা সত্যি বলতে অন্য কিছু সম্পর্কে নতুন ধ্যান-ধারণা গড়ে ওঠা অসম্ভব বা অপ্রত্যাশিত ব্যাপার হয়ে উঠবে। তা সত্ত্বেও পশ্চিম ইউরোপিয়রা যেমন মনে করে থাকে, এ সময়কালকে ইসলামের পতনের সূচনা লগ্ন বললে ভুল হবে। মার্শাল জি. এস. হজসন তাঁর দ্য ভেঞ্চার অভ ইসলাম: কনশিয়েন্স অ্যান্ড হিস্ট্রি ইন আ ওয়ার্ল্ড সিভিলাইজেশন গ্রন্থে মন্তব্য করেছেন, এ রকম ঢালাও সরলীকরণ করার মতো এ সময় সম্পর্কিত যথেষ্ট তথ্য আমাদের হাতে নেই। উদাহরণ স্বরুপ, এই সময়ে মুসলিমদের বিজ্ঞান চর্চায় ভাটা পড়েছিল ভেবে নেওয়াটা ভুল হবে, কেননা আমাদের কাছে কোনও পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই।
চতুর্দশ শতাব্দীতে দামাস্কাসের আহমেদ ইবন তাইমিয়াহ (মৃত্যু, ১৩২৮) এবং তাঁর শিষ্য ইবন আল-কাঈন আল-জওযিয়াদের মতো শরীয়াহ অনুসারীদের হাতে রক্ষণশীল প্রবণতা জন্ম লাভ করেছিল। মুসলিমরা যেন সম্ভাব্য সবরকম পরিস্থিতিতে শরীয়াহ প্রয়োগ করতে পারে সেভাবে একে বিস্তৃত করতে চেয়েছিলেন জনপ্রিয় ইবন তাঈমিয়াহ। একে নির্যাতনমূলক অনুশীলন হিসাবে গড়ে তোলার কোনও ইচ্ছা ছিল নাঃ তিনি পুরোনো অচল নিয়ম বা বিধিগুলোকে বাদ দিয়ে শরীয়াহকে এই সংকট-সময়ের মুসলিমদের উদ্বেগ উৎকণ্ঠা দূর করার উপযোগি প্রাসঙ্গিক করে তুলতে চেয়েছিলেন। ধর্মীয় সমস্যাদির স্পষ্ট যৌক্তিক জবাব শরীয়াহ হতে পাওয়া উচিত। কিন্তু শরীয়াহর প্রতি প্রবল আগ্রহের কারণে তাঈমিয়াহ কালাম, ফালসাফাহ, এমনকি আশারিয়াদের ওপরও চড়াও হয়ে বসেন। যে কোনও সংস্কারকের মতো তিনি উৎসে-কোরান এবং হাদিসে (যার ওপর ভিত্তি করে শরীয়াহর সৃষ্টি)-প্রত্যাবর্তন করতে চেয়েছেন এবং চেয়েছিলেন পরবর্তীকালের সমস্ত সংযুক্তি ঝেড়ে ফেলতে: ‘আমি সকল ধর্মতাত্ত্বিক ও দার্শনিক পদ্ধতি পরীক্ষা করে দেখেছি। এসব রোগ উপশম বা তৃষ্ণা নিবারণে অক্ষম। আমার কাছে কোরানের পথই সর্বশ্রেষ্ঠ। তাঁর শিষ্য আল-জাওযিয়াহ উদ্ভাবনের তালিকায় সুফীবাদকে যোগ করেন এবং ঐশীগ্রন্থের আক্ষরিক ব্যাখ্যার উপর জোর দেন; তাঁর ওপর সুফী সাধকদের কাল্টকে এমনভাবে নিন্দা জানান যার সঙ্গে পরবর্তীকালের ইউরোপের প্রটেস্ট্যান্ট সংস্কারবাদীদের খুব বেশি অমিল ছিল না। লুথার ও কালভিনের মতো ইবন তাঈমিয়াহ ও আল-জাওযিয়াহ তাঁদের সমসাময়িকদের চোখে সেকেলে বিবেচিত হননিঃ তাঁদের বরং প্রগতিশীল মানুষ হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছে। এ সময়ের তথাকথিত রক্ষণশীলতাকে স্থবিরকাল হিসাবে নাকচ না করার জন্যে আমাদের সতর্ক করেছেন হজসন । তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন, আমাদের আগে আর কোনও সমাজ আমরা এখন যে মাত্রায় প্রগতিকে উপভোগ করছি সেভাবে দেখতে বা বহন করার উপযোগি ছিল না। পশ্চিমের পণ্ডিতগণ প্রায়শঃই পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীর মুসলিমদের ইতালিয় রেনেসাঁকে বিবেচনায় নেওয়ার ব্যর্থতার জন্যে ভর্ৎসনা করে থাকেন। ইতিহাসের এক ব্যাপক সাংস্কৃতিক বিকাশের পর্যায় ছিল এটা, সত্যি, কিন্তু এর সঙ্গে, উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, চীনের সুং রাজবংশের খুব একটা তারতম্য ছিল না, যা দ্বাদশ শতাব্দীর মুসলিমদের প্রেরণার উৎস ছিল । পশ্চিমের জন্যে রেনেসাঁ গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল বটে, কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি যুগের আবির্ভাব বুঝতে পারেনি কেউ, যদিও পেছনে তাকিয়ে আমরা এর আগমনের আভাস দেখতে পাই। মুসলিমরা এই পশ্চিমা রেনেসাঁর প্রতি যদি সাড়া নাও দিয়ে থাকে সেজন্যে একে দুরতিক্রম্য সাংস্কৃতিক অপুর্ণতা হিসাবে দেখা ঠিক হবে না। এখানে বিস্ময়ের কিছু নেই যে, মুসলিমরা পঞ্চদশ শতাব্দীতে তাদের নিজস্ব উল্লেখযোগ্য সাফল্য নিয়েই বেশি ব্যস্ত ছিল।
