আমরা স্বর্গীয় প্রকৃতিতে অংশ গ্রহণ করি আবার একই সময়ে এটা সম্পূর্ণ অগম্য রয়ে যায়। আমাদেরকে যুগপৎ দুটোই স্বীকার করে নিতে হয় আর সঠিক মতবাদের এক বৈশিষ্ট্য হিসাবে এর প্রতীক রক্ষা করতে হয় ।
পালামাসের মতবাদে নতুন কিছু ছিল নাঃ একাদশ শতাব্দীতে নিউ থিয়োলজিয়ান সিমিয়ন এর রূপরেখা দিয়েছিলেন। কিন্তু বারলাম দ্য কালোব্রিয়ান পালামাসকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। বারলাম ইতালিতে পড়াশোনা করেছেন এবং তোমাস আকুইনাসের যুক্তিবাদী অ্যারিস্টটলবাদে গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন। পালামাসের বিরুদ্ধে ঈশ্বরকে দুটো আলাদা অংশে ভাগ করার অভিযোগ তুলে ঈশ্বরের ‘সত্তা’ ও তার শক্তিসমূহে’র বিবেচিত প্রচলিত গ্রিক পার্থক্যের বিরোধিতা করেছেন। বারলাম ঈশ্বরের একটা সংজ্ঞার প্রস্তাব রাখেন যা প্রাচীন গ্রিক যুক্তিবাদীদের সংজ্ঞার পুনরাবৃত্তি ও ঈশ্বরের পরম সারল্যের ওপর জোর দেয়। অ্যারিস্টটলের মতো গ্রিক দার্শনিকরা, বারলাম দাবি করেছেন, ঈশ্বর কর্তৃক বিশেষভাবে আলোকপ্রাপ্ত হয়েছিলেন, শিক্ষা দিয়েছেন যে ঈশ্বর পৃথিবী হতে বহু দূরের ও জ্ঞানের অতীত। সুতরাং নারী ও পুরুষের পক্ষে ঈশ্বরকে ‘দেখা অসম্ভব: মানুষ পরোক্ষভাবে ঐশীগ্রন্থ বা সৃষ্টির বিস্ময়ে তার প্রভাব অনুভব করতে পারে । ১৩৪১ সালে অর্থডক্স চার্চের এক কাউন্সিল বারলামের নিন্দা জানায়, কিন্তু আকুইনাস প্রভাবিত অন্য সাধুরা তাকে সমর্থন জানান। মূলত এটা অতিন্দ্রীয়বাদী ও দার্শনিকদের ঈশ্বরের এক বিরোধে পরিণত হয়েছিল। বারলাম ও তার সমর্থকবৃন্দ গ্রেগরি আকিনদিনোস (যিনি Summa Theologiae-এর গ্রিক ভাষ্য থেকে উদ্ধৃতি দিতে পছন্দ করতেন), নিসেফোরাস গ্রেগোরাস ও দ্য তোমিস্ত প্রকরস সিনেস নীরবতা, স্ববিরোধিতা ও রহস্যের ওপর গুরুত্ব আরোপকারী বাইন্তানিয় অ্যাপোফ্যাটিক ধর্মতত্ত্ব হতে সরে এসেছিলেন। এঁরা পশ্চিম ইউরোপের অধিকতর ইতিবাচক ধর্মতত্ত্ব পছন্দ করতেন যা ঈশ্বরকে কিছু না’র বদলে ‘সত্তা’ হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। ডেনিস, সিমিয়ন ও পালামাসের রহস্যময় উপাস্যের বিপরীতে তাঁরা এমন একজন ঈশ্বরকে অধিষ্ঠিত করেন যার সম্পর্কে বক্তব্য রাখা যেত। গ্রিকরা পাশ্চাত্য চিন্তাধারার এই প্রবণতাকে বরাবর বিরূপ দৃষ্টিতে দেখেছে। যুক্তিভিত্তিক লাতিন ধারণার এই অনুপ্রবেশের মুখে পালামাস প্রাচ্যের অর্থডক্সি ধর্মতত্ত্ব পুনরুজ্জীবিত করেন। মানবীয় ভাষায় প্রকাশযোগ্য কোনও ধারণায় ঈশ্বরকে অবনমিত করা যাবে না । ঈশ্বর যে জ্ঞানাতীত, এ ব্যাপারে বারলামের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন তিনি, কিন্তু তারপরেও জোর দিয়ে বলেছেন নারী ও পুরুষ তার অভিজ্ঞতা লাভ করেছে। তাবর পর্বতে জেসাসের মানব দেহকে রূপান্তরিতকারী আলো ঈশ্বরের সত্তা ছিল না, কোনও মানুষ যা প্রত্যক্ষ করেনি, কিন্তু কোনও রহস্যময় উপায়ে স্বয়ং ঈশ্বরই ছিলেন। গ্রিক ধর্মতত্ত্ব অনুযায়ী অর্থডক্স মতকে স্থাপনকারী শাস্ত্র দাবি করে যে তাবরে: ‘আমরা পিতাকে আলো হিসাবে এবং আত্মাকে আলো হিসাবে দেখেছি।’ এটা ছিল ‘আমরা যা ছিলাম এবং আমরা যা হব’ তার প্রকাশ; যখন, ক্রাইস্টের মতো দেবত্ব লাভ করব।৬৬ আবার, এই জীবনে ঈশ্বরের ধ্যান করে যা দেখি সেটা ঈশ্বরের বিকল্প নয় বরং কোনওভাবে স্বয়ং ঈশ্বর। এটা অবশ্যই স্ববিরোধী, কিন্তু ক্রিশ্চান ঈশ্বর তো প্যারাডক্স ছিলেন: প্রতীক ও নীরবতা কেবল আমরা যাঁকে ‘ঈশ্বর’ বলি তাঁর রহস্যের ক্ষেত্রে একমাত্র সঠিক ভঙ্গি-দার্শনিক কোনও অহমিকা নয়–যা অসুবিধাসমূহ দূর করার প্রয়াস পায়।
বারলাম ঈশ্বরের ধারণাকে বড় বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রয়াস পেয়েছিলেন: তাঁর মতে হয় ঈশ্বরকে তাঁর সত্তার সঙ্গে একীভূত করতে হবে নয়তো যাবে না। তিনি ঈশ্বরকে তার সত্তায় সীমাবদ্ধ করতে চেষ্টা করেছিলেন এবং একথা বলতে চেয়েছেন যে নিজ শক্তি’র বাইরে তাঁর পক্ষে উপস্থিত থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু ঈশ্বর সম্পর্কে এমন চিন্তা করার মানে তাকে অন্য কোনও ঘটনার মতো দেখা, যা কী সম্ভব আর সম্ভব নয় তার সম্পূর্ণ মানবীয় ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। পালামাস জোর দিয়ে বলেছেন যে, ঈশ্বরের দর্শন একটা দ্বিপাক্ষিক পরমানন্দ: নারী ও পুরুষ নিজেদের অতিক্রম করে যায় কিন্তু ঈশ্বরও আপন সৃষ্টির কাছে নিজেকে প্রকাশ করার জন্যে নিজের উর্ধ্বে গিয়ে এক পরমানন্দ লাভ করেন: ঈশ্বরও আপন সত্তা হতে বেরিয়ে আসেন এবং সদয় অবতরণের মাধ্যমে আমাদের হৃদয়ের সঙ্গে একীভূত হন।৬৭ চতুর্দশ শতাব্দীর গ্রিক যুক্তিবাদীদের বিরুদ্ধে অর্থডক্স খৃস্টধর্মের আদর্শ হিসাবে রয়ে যাওয়া পালামাসের ধর্মতত্ত্বের বিজয় সকল একেশ্বরবাদী ধর্মের অতিন্দ্রীবাদের বৃহত্তর বিজয়ের প্রতিনিধিত্ব করে। একাদশ শতাব্দী থেকেই মুসলিম দার্শনিকগণ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন যে যুক্তি-যা ওষুধ বা বিজ্ঞানের গবেষণার ক্ষেত্রে অপরিহার্য-ঈশ্বরের গবেষণায় একেবারেই অপর্যাপ্ত। কেবল যুক্তির ওপর নির্ভর করার মানে দাঁড়াবে কাঁটা চামচ দিয়ে স্যুপ খাওয়ার মতো।
ইসলামি সাম্রাজ্যের বেশির ভাগ স্থানে সূফীদের ঈশ্বর দার্শনিকদের ঈশ্বরের ঊর্ধ্বে স্থান করে নিয়েছিলেন। পরবর্তী অধ্যায়ে আমরা দেখব, ষোড়শ শতাব্দীতে কাব্বালিস্টদের ঈশ্বর ইহুদি আধ্যাত্মিকতায় প্রাধ্যন্য বিস্তার করেন। অতিন্দ্রীয়বাদ অধিকতর বুদ্ধিবৃত্তিক বা যৌক্তিক ধরনের ধর্মের চেয়ে গভীরভাবে মানুষের মনে অনুপ্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিল । অতিন্দ্রীয়রাদের ঈশ্বর অধিকতর আদিম আশা, আশঙ্কা ও উৎকণ্ঠার সমাধানে সক্ষম, যেখানে দার্শনিকদের ঈশ্বর অক্ষম। চতুর্দশ শতাব্দী নাগাদ পাশ্চাত্য নিজস্ব অতিন্দ্রীয়বাদী ধর্মের সূচনা ঘটায় যার শুরু ছিল অত্যন্ত প্রতিশ্রুতিশীল । কিন্তু পশ্চিমের অতিন্দ্রীয়বাদ কখনওই অপরাপর ধর্মের মতো ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করতে পারেনি। ইংল্যান্ড, জার্মানি ও লোল্যান্ডসে বিশেষ ধরনের অতিন্দ্রীয়বাদীদের জন্ম ঘটলেও ষোড়শ শতাব্দীতে প্রটেস্ট্যান্ট সংস্কারকগণ একে বাইবেল বিরোধী আধ্যাত্মিকতা হিসাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। রোমান ক্যাথলিক চার্চে সেইন্ট তেরেসা অভ আভিলার মতো নেতৃস্থানীয় অতিন্দ্রীয়বাদীগণ প্রায়শঃ কাউন্টার-রিফরমেশনের ইনকুইজিশনের হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন। সংস্কারের পরিণতিতে ইউরোপ আরও যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে ঈশ্বরকে বিবেচনা করতে শুরু করেছিল ।
০৮. সংস্কারকদের ঈশ্বর
ঈশ্বরের সকল জাতির ক্ষেত্রে পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দী ছিল চরম সিদ্ধান্ত মুলক। পাশ্চাত্যের ক্রিশ্চানদের জন্যে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটা পর্যায় ছিল এটা, যারা কেবল ওইকুমিনের অপরাপর সংস্কৃতির সঙ্গে তালই মেলায়নি বরং তাদের অতিক্রম করে যাওয়ার পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। এই দুই শতাব্দী ইতালিতে অতি দ্রুত উত্তর ইউরোপের বিস্তার লাভ করা রেনেসা, নতুন বিশ্বের আবিষ্কার ও বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের সূচনা প্রত্যক্ষ করে যা বাকি বিশ্বের নিয়তির ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল। ষোড়শ শতাব্দীর শেষ নাগাদ পশ্চিম সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির এক সংস্কৃতির উন্মেষ ঘটাতে যাচ্ছিল। সুতরাং, এটা ছিল ক্রান্তিকাল, যার ফলে সাফল্য ও উদ্বেগ ছিল এ সময়ের বৈশিষ্ট্য। এ সময়ের পশ্চিমে ঈশ্বর সংক্রান্ত ধ্যানধারণায় ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়ে আছে। সেকুলার সাফল্য সত্ত্বেও ইউরোপের জনগণ অতীতের যেকোনও সময়ের চেয়ে তাদের ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন ছিল। সাধারণ মানুষ বিশেষভাবে ধর্মের মধ্যযুগীয় চরিত্র নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিল, কেননা তা নতুন বিশ্বের সমস্যা বা প্রয়োজন মেটাতে পারছিল না। মহান সংস্কাররকগণ এই অসন্তোষকে ভাষা দান করেন এবং ঈশ্বর ও মুক্তিলাভকে বিবেচনা করার নতুন উপায় আবিষ্কার করেন। ফলে ইউরোপ দুটি বিবদমান শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে-ক্যাথলিক ও প্রটেস্ট্যান্ট-যারা কখনও পারস্পরিক ঘৃণা ও সন্দেহ কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সংস্কারকালীন সময়ে ক্যাথলিক ও প্রটেস্ট্যান্ট সংস্কারবাদীরা বিশ্বাসীদের প্রতি সাধু-সন্ন্যাসী ও দেবদূতদের ওপর প্রান্তিক ভক্তিবাদ ছেড়ে কেবল ঈশ্বরের দিকে মনোনিবেশ করার তাগিদ দিয়েছিল। প্রকৃতপক্ষেই ইউরোপে যেন ঈশ্বর উন্মাদনা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে কেউ কেউ ‘নাস্তিক্যবাদ’ নিয়ে জল্পনা-কল্পনা শুরু করে দিয়েছিল। এর মানে কি তবে তারা ঈশ্বরকে ত্যাগ করতে প্রস্তুত ছিল?
