ঈশ্বর, ঘোষণা দিয়েছেন একহার্ত, কিছু না। তার মানে এই নয় যে, তিনি এক বিভ্রম, বরং ঈশ্বর আমাদের জ্ঞাত অস্তিত্বের চেয়ে সমৃদ্ধ, পূর্ণাঙ্গ অস্তিত্বের অধিকারী। ঈশ্বরকে তিনি অন্ধকার’ও বলেছেন, আলোর অনুপস্থিতি বোঝাতে নয়, বরং উজ্জ্বলতর কোনও কিছুর অস্তিত্বের ইঙ্গিত দেওয়ার জন্যে। একহার্ত নেতিবাচক ভাষায় সবচেয়ে চমৎকারভাবে বর্ণনাযোগ্য, যেমন, মরুভূমি,’ ‘বিরান অঞ্চল, ‘অন্ধকার’ ও ‘কিছু না ‘গডহেড’র সঙ্গে পিতা, পুত্র ও আত্মা হিসাবে আমাদের পরিচিত ঈশ্বরের পার্থক্যও করেছেন। পাশ্চাত্যবাসী হিসাবে একহার্ত মানব মনে ট্রিনিটির মিল সম্পর্কিত অগাস্তিনের মত ব্যবহার করতে পছন্দ করেছেন; তিনি বুঝিয়েছিলেন যে, যদিও ট্রিনিটির মতবাদ যুক্তির সাহায্যে জানা সম্ভব নয়, কেবল বুদ্ধিমত্তাই ঈশ্বরকে তিনটি সত্তায় ধারণ করতে পারে: অতিন্দ্রীয়বাদী ঈশ্বরের সঙ্গে একীভূত হয়ে গেলে সে তাঁকে একজন হিসাবে দেখে। গ্রিকরা হয়তো বা এমন ধারণা মেনে নিত না, কিন্তু ট্রিনিটি যে অত্যবশ্যকীয়ভাবে অতিন্দ্রীয়বাদী ধারণা, এ ব্যাপারে একহাত ওদের সঙ্গে হয়তো বা একমত হতেন। তিনি মেরি তাঁর গর্ভে ক্রাইস্টকে ধারণ করার বদলে পিতা আত্মায় পুত্রকে জন্ম দিয়েছেন আলোচনা পছন্দ করতেন। রুমীও অতিন্দ্রীয়বাদীর হৃদয়ে আত্মার জন্ম লাভের প্রতীক হিসাবে পয়গম্বর জেসাসের ‘ভার্জিন বার্থ দেখেছিলেন। এটা, একহাত জোর দিয়ে বলেছেন, ঈশ্বরের সঙ্গে আত্মার সহযোগিতার এক রূপক প্রকাশ।
কেবল অতিন্দ্রীয়বাদী অভিজ্ঞতা দিয়েই ঈশ্বরকে জানা সম্ভব। মায়মোনিস যেমন পরামর্শ দিয়েছেন: নেতিবাচক পরিভাষায়ই তার সম্পর্কে কথা বলা শ্রেয়। প্রকৃতপক্ষেই আমাদের হাস্যকর পূর্ব ধারণা ও মানবরূপ ইমেজারি হতে মুক্ত হয়ে ঈশ্বর সম্পর্কিত ধারণা পরিশুদ্ধ করে নিতে হবে । এমনকি খোদ ‘ঈশ্বর’ শব্দটির ব্যবহারও এড়িয়ে যাওয়া উচিত। একথাই বোঝাতে চেয়েছিলেন একহার্ত যখন তিনি বলেছেন: মানুষের সর্বশেষ ও সর্বোচ্চ বিচ্ছেদ হচ্ছে যখন সে ঈশ্বরের স্বার্থে ঈশ্বর হতে বিদায় নেয়।৬২ এটা এক যন্ত্রণাময় প্রক্রিয়া। ঈশ্বর যেহেতু কিছু না, আমাদেরও তার সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্যে কিছু না’ হবার প্রস্তুতি নিতে হবে। সুফীদের বর্ণিত ‘ফানা’র মতো মোটামুটি একই রকম এক প্রক্রিয়ায় একহার্ত ‘বিচ্ছেদ বা বলা যায় বিচ্ছিন্নতা (Abgeschiedenheit)-এর কথা বলেছেন। মুসলিমরা যেভাবে স্বয়ং ঈশ্বর ছাড়া আর কারও উপাসনা করাকে বহুঈশ্বরবাদ (শিরক) বিবেচনা করে তেমনি একহার্ত শিক্ষা দিয়েছিলেন যে অতিন্দ্রীয়বাদী অবশ্যই ঈশ্বর সম্পর্কে কোনও সীমাবদ্ধ ধারণার নিগড়ে বাঁধা পড়তে পারবে না। একমাত্র এভাবেই সে ঈশ্বরের সঙ্গে একতা লাভ করতে পারবে, যার ফলে ‘ঈশ্বরের অস্তিত্ব আমার অস্তিত্বে এবং ঈশ্বরের সত্তা (ইস্তিগকেইত) আমার সত্তা হবে। ঈশ্বর যেহেতু সত্তার ভিত্তি, সুতরাং মহাশূন্যে তাঁকে খোঁজার কোনও দরকার নেই, প্রয়োজন নেই আমাদের পরিচিত জগতের ঊর্ধ্বে কোথাও আরোহণের কথা ভাবা ।
‘আমিই সত্য বলে উলেমাদের বিরাগভাজন হয়েছিলেন আল-হাল্লাজ এবং একহার্তের অতিন্দ্রীয়বাদী মতবাদ জার্মানির বিশপদের হতচকিত করে দিয়েছিল: একজন সামান্য নারী বা পুরুষের ঈশ্বরে বিলীন হয়ে যাওয়ার কথা বলে কী বোঝানো হয়েছে? চতুর্দশ শতাব্দীতে গ্রিক ধর্মতাত্ত্বিকগণ এ প্রশ্নে তীব্র বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিলেন। ঈশ্বর যেহেতু অত্যাবশ্যকভাবে অগম্য তাহলে কীভাবে তিনি মানবজাতির সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন? ঈশ্বরের সত্তা এবং তার কর্মকাণ্ড’ বা ‘শক্তিসমূহে’র সত্যিই কোনও পার্থক্য থাকলে, ফাদারগণ যেমন শিক্ষা দিয়েছেন, নির্ঘাৎ একজন ক্রিশ্চান প্রার্থনায় যে ঈশ্বরের মুখোমুখি হয় তার সঙ্গে স্বয়ং ঈশ্বরের তুলনা করা ব্লাসফেমাস হবে? আর্চ বিশপ অভ সালোনিকি গ্রেগরি পালামাস শিক্ষা দিয়েছেন যে, স্ববিরোধী মনে হলেও কোনও ক্রিশ্চানই স্বয়ং ঈশ্বরের প্রত্যক্ষ জ্ঞান অর্জন করতে পারে। সত্য যে, ঈশ্বরের ‘সত্তা’ সবসময় আমাদের নাগালের বাইরে, কিন্তু তাঁর ‘শক্তিসমূহ ঈশ্বর হতে আলাদা নয় এবং একে তুচ্ছ স্বর্গীয় প্রভাব বিবেচনা করা যাবে না। কোনও ইহুদি অতিন্দ্রীয়বাদী হয়তো একমত হতো: ঈশ্বর এন এফ সবসময়ই দুর্ভেদ্য অন্ধকারে বিরাজ করবেন, কিন্তু তাঁর সেফিরদ (যার সঙ্গে গ্রিক ‘শক্তিসমূহে’র মিল আছে) সমূহ স্বর্গীয়, একেবারে গডগেডের অন্তর হতে চিরন্তনভাবে প্রবাহিত হচ্ছে। কখনও কখনও নারী-পুরুষ এসব শক্তি’ সরাসরি বা প্রত্যক্ষভাবে দর্শন বা অনুভব করতে পারে, বাইবেল যখন বলে যে, ঈশ্বরের ‘প্রতাপ’ অবির্ভূত হয়েছিল। কেউ কখনও ঈশ্বরের সত্তা দেখেনি। কিন্তু তার মানে এই ছিল না যে, স্বয়ং ঈশ্বরের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা লাভ করা অসম্ভব। এই মনোভাব স্ববিরোধী হলেও পালামাসকে তা মোটেও হতাশ করতে পারেনি । গ্রিকরা বহু আগেই একমত হয়েছিল যে, ঈশ্বর সম্পর্কিত যেকোনও বক্তব্য স্ববিরোধী হতে বাধ্য। একমাত্র এভাবেই মানুষ তাঁর সম্পর্কে রহস্য ও অনিবৰ্চনীয় বোধ বজায় রাখতে পারবে। পালামাস বিষয়টি এভাবে উপস্থাপন করেছেন:
