সাইকোঅ্যানালিটিক রোগির যেমন তার থেরাপিস্টের নির্দেশনার প্রয়োজন হয়, অনেকটা ঠিক সে রকম, আবুলাফিয়া জোর দিয়ে বলেছেন, মনের গভীরে অতিন্দ্রীয় যাত্রা কেবল কোনও কাব্বালাহ্ গুরুর তত্ত্বাবধানেই শুরু করা যাবে। বিপদ সম্পর্কে পুরোপুরি সজাগ ছিলেন তিনি, কারণ তরুণ বয়সে তিনি স্বয়ং এক ভয়ঙ্কর ধর্মীয় অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছিলেন যা তাকে প্রায় হতাশায় ডুবিয়ে দিয়েছিল। আজকের দিনে রোগিরা প্রায়শঃই তার শক্তি বা স্বাস্থ্যকে যথাযথ করার লক্ষ্যে অ্যানালিস্টের ব্যক্তিত্বকে আস্তস্থ করে নেয়। একইভাবে আবুলাফিয়া লিখেছেন যে, কাব্বালিস্ট প্রায়ই তার আধ্যাত্মিক গুরুর সত্তাকে ‘দেখবে’ বা তার কথা শুনবে, যিনি তার ভেতর থেকে পরিচালকে’ পরিণত হয়েছেন, যিনি তার সঙ্গে বদ্ধ দরজা খোলেন। শক্তির এক নতুন স্রোত ও এক অদম্য অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন টের পাবে সে যা ঐশী উৎস হতে আগত বলে মনে হবে। আবুলাফিয়ার একজন অনুসারী পরমানন্দের অবস্থার ভিন্ন রকম ব্যাখ্যা দিয়েছেন: অতিন্দ্রীয়বাদী, বলেছেন তিনি, নিজের মেসায়াহয় পরিণত হয়। পরম মোহাবিষ্ট আনন্দের অবস্থায় আপন মুক্ত ও আলোকপ্রাপ্ত সত্তার দর্শনের মুখোমুখি হয় সে:
স্মরণ রাখবে, পয়গম্বরের জন্যে পয়গম্বরত্বের সম্পূর্ণ চেতনা হচ্ছে সহসা সে আপন সত্তাকে নিজের সামনে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখতে পায় এবং আপন সত্তা বিস্মৃত হয়; সেখান হতে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নেয়…এবং এই গুপ্ত বিষয় সম্পর্কে আমাদের শিক্ষকগণ তালমুদে বলেছেন: ‘পয়গম্বরদের শক্তি অসাধারণ, “তার” আকারের তুলনা করে যিনি এর আকার দিয়েছেন।’ (অর্থাৎ, যিনি মানুষকে ঈশ্বরের সঙ্গে তুলনা করেন।]
ইহুদি অতিন্দ্রীয়বাদীরা সবসময় ঈশ্বরের সঙ্গে বিলীন হওয়ার দাবি তুলতে অনীহ ছিল। আবুলাফিয়া ও তাঁর অনুসারীরা শুধু বলতেন যে, একজন আধ্যাত্মিক গুরুর সঙ্গে একীভূত হওয়ার অভিজ্ঞতা বা ব্যক্তিগত মুক্তি অর্জন লাভ করে কাব্বালিস্ট পরোক্ষভাবে ঈশ্বরের স্পর্শ লাভ করত। মধ্যযুগীয় অতিন্দ্রীয়বাদের সঙ্গে আধুনিক সাইকোথেরাপির অবশ্যই সুস্পষ্ট পার্থক্য আছে, কিন্তু দুটো শাস্ত্রই আরোগ্য ও ব্যক্তিগত সংহতি অর্জনের একই ধরনের কৌশল আবিষ্কার করেছে।
পশ্চিমের ক্রিশ্চানরা অতিন্দ্রীয়বাদী ঐতিহ্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ধীরগতি ছিল। বাইন্তানিয় ও ইসলামি সাম্রাজ্যর একেশ্বরবাদীদের পেছনে পড়ে গিয়েছিল তারা এবং সম্ভবত এই অভিনব পরিবর্তনের জন্যে তৈরি ছিল না। অবশ্য, চতুর্দশ শতাব্দীতে বিশেষ করে উত্তর ইউরোপে অতিন্দ্রীয়বাদী ধর্মের বৈচিত্র্যপূর্ণ বিস্ফোরণ দেখা দিয়েছিল। বিশেষত জার্মানিতে অতিন্দ্রীয়বাদীদের এক ঝাঁক জন্ম দিয়েছিল যেন: মেইস্তার একহাত (১২৬০-১৩২৭), জোহানেস তাওলার (১৩০০-৬১), গারদ দ্য গ্রেট (১২৫৬-১৩০২) ও হেনরি সুসসা (ca. ১২৯৬-১৩০৬)। পশ্চিমের এই পরিবর্তনে ইংল্যান্ডও তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখে এবং এমন কয়েকজন অতিন্দ্রীয়বাদীর জন্ম দেয় যারা নিজ দেশের পাশাপাশি গোটা মহাদেশেও অত্যন্ত দ্রুত অনুসারী লাভ করেছিলেন: হ্যামপোলো রিচার্ড রোলে (১২৯০-১৩৪৯), দ্য ক্লাউড অভ আনোউইং-এর অজ্ঞাত লেখক, ওয়াল্টার হিল্টন (মৃত্যু, ১৩৪৬) ও নরউইচের ডেম জুলিয়ান (ca. ১৩৪২-১৪১৬। এই অতিন্দ্রীয়বাদীদের কেউ কেউ অন্যদের চেয়ে বেশ অগ্রসর ছিলেন। উদাহরণ স্বরূপ, রিচার্ড রোলে যেন অদ্ভুত শিহরণের ফাঁদে আটকা পড়ে গিয়েছিলেন; আধ্যাত্মিকতাকে এক ধরনের অহমবোধে বৈশিষ্টায়িত করা হয়েছে। কিন্তু সবার সেরা যারা ছিলেন তাঁরা নিজেদের জন্যে ইতিমধ্যে গ্রিক, সুফী ও কাব্বালিস্টদের অর্জিত দর্শনসমূহের অনেকগুলোই ফের আবিষ্কার করেছিলেন।
উদাহরণস্বরূপ, মেইস্তার একহাত যদিও তাওলার ও সুসসার ওপর প্রভাব ফেলেছেন, কিন্তু তিনি স্বয়ং ডেনিস দ্য আরোপ্যাগাইত ও মায়মোনিদসের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। অসাধারণ বুদ্ধিমত্তার অধিকারী দোমিনিকান ফ্রায়ার ছিলেন তিনি। প্যারিস বিশ্বাবিদ্যালয়ে অ্যারিস্টটলিয় দর্শনের ওপর লেকচার দিতেন। অবশ্য ১৩২৫ সালে অতিন্দ্রীয় শিক্ষার কারণে তাঁর সঙ্গে আর্চ বিশপ অভ কোলনের বিরোধ সৃষ্টি হয়; বিশপ তাঁর বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহের অভিযোগ আনেন: তার বিরুদ্ধে স্বয়ং ঈশ্বর আত্মায় জন্ম নিয়েছেন ও বিশ্ব সংসারের অনন্ততার প্রচার করে ঈশ্বরের মহানুভবতা অস্বীকার করার অভিযোগ ওঠে। কিন্তু তারপরেও একহার্তের তীব্র সমালোচকদের কেউ কেউ তাকে অর্থডক্স বলে বিশ্বাস করতেন: ভুল হয়েছে তার কিছু কিছু মন্তব্যকে প্রতাঁকের বদলে আক্ষরিকভাবে ব্যাখ্যা করায়, যেটা প্রত্যাশিত ছিল না। একহাত কবি ছিলেন, প্যারাডক্স ও উপমা দারুণ উপভোগ করতেন। যদিও তিনি বিশ্বাস করতেন যে ঈশ্বরের বিশ্বাস করাটা যৌক্তিক, কিন্তু কেবল যুক্তি দিয়ে ঐশী প্রকৃতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান পাওয়া সম্ভব বলে মানতেন নাঃ ‘কোনও বোধগম্য জিনিসের প্রমাণ অনুভূতি বা বুদ্ধিতে মেলে, যুক্তি দেখিয়েছেন তিনি, কিন্তু ঈশ্বরের জ্ঞানের বেলায় ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভূতির অবকাশ নেই, কারণ যেহেতু তিনি নিরাকার, তেমনি বুদ্ধি দিয়েও বোঝা সম্ভব নয়, যেহেতু আমাদের পরিচিত কোনও রূপ তিনি ধারণ করেন না।৫৯ ঈশ্বর আর সব জিনিসের মতো নন যে তাঁর অস্তিত্ব চিন্তার স্বাভাবিক বিষয়বস্তুর মতো প্রমাণ করা যাবে।
