স্বর্গীয় নির্বাসনের ধারণা মানুষের বহু উদ্বেগের কারণ বিচ্ছেদের অনুভূতিকেও প্রকাশ করেছে। দ্য যোহার অব্যাহতভাবে অশুভকে এমন কিছু হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেছে যা বিচ্ছিন্ন হয়েছে বা যা এমন এক সম্পর্ক স্থাপন করেছে যার সঙ্গে এটা খাপ খায় না। নৈতিকতাবাদী একেশ্বরবাদের অন্যতম সমস্যা হলো এটা অশুভকে পৃথক করে দেয়। আমরা যেহেতু আমাদের ঈশ্বরের মাঝে অশুভের অবস্থানের ধারণা গ্রহণ করতে পারি না, সেহেতু আমাদের নিজেদের মাঝেও একে সহ্য করতে না পারার এক ধরনের বিপদ আছে। তখন এটাকে দূরে ঠেলে দিয়ে দানবীয় ও অমানবিক করে ফেলা হতে পারে । পশ্চিমের ক্রিশ্চান জগতে ভীতিকর শয়তানের ইমেজ এমনি এক বিকৃত অভিক্ষেপ। দ্য যোহার পঞ্চম সেফিরাহ ‘দিন’ বা ‘কঠিন বিচারে স্বয়ং ঈশ্বরের মাঝে অশুভের মুল আবিষ্কার করেছে। দিনকে ঈশ্বরের বাম হাত হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, হেসেদ (করুণা) তার ডান হাত দিন যতক্ষণ স্বর্গীয় করুণার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কার্যকর থাকে ততক্ষণ এটা ইতিবাচক ও উপকারী। কিন্তু অন্যান্য সেফিরদ থেকে বিচ্ছিন্ন ও আলাদা হয়ে গেলে অশুভও ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে। কিন্তু এই বিচ্ছিন্নতার সৃষ্টি কীভাবে হয় দ্য যোহার সেটা আমাদের বলে না। পরবর্তী অধ্যায়ে আমরা দেখব, পরবর্তী সময়ের কাব্বালিস্টরা অশুভের সমস্যা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করে দেখেছে যে, ‘অশুভ’ হচ্ছে ঈশ্বরের আত্মপ্রকাশের একেবারে গোড়ার দিকে কোনও ধরনের আদিম ‘দুর্ঘটনার ফল। আক্ষরিক অর্থে ব্যাখ্যা করতে গেলে কাব্বালাই তেমন কোনও অর্থ প্রকাশ করে না, কিন্তু এর মিথলজি মনস্তাত্ত্বিকভাবে সন্তোষজনক প্রতীয়মান হয়েছে। পঞ্চদশ শতাব্দীতে স্প্যানিশ ইহুদি সম্প্রদায়কে যখন দুর্যোগ-দুর্দশায় গ্রাস করে তখন কাব্বালিস্ট ঈশ্বরই তাদের দুর্ভোগের একটা তাৎপর্য খুঁজে পেতে সাহায্য করেছেন।
আমরা স্প্যানিশ অতিন্দ্রীয়বাদী আব্রাহাম আবুলাফিয়ার (১২৪০-১২৯১ এর পর) রচনাবলীতে কাব্বালাহর মনস্তাত্ত্বিক তীক্ষ্ণতার পরিচয় পাই । মোটামুটি দ্য যোহারের সমসাময়িককালেই তার অধিকাংশ রচনা প্রকাশ পেলেও আবুলাফিয়া স্বয়ং ঈশ্বরের রূপ বা প্রকৃতির পরিবর্তে বরং ঈশ্বরের বোধ অর্জনের ব্যবহারিক কৌশল আবিষ্কারের দিকে মনোযোগ দিয়েছিলেন। এসব পদ্ধতির সঙ্গে বর্তমানকালের সাইকোঅ্যানালিস্টদের ব্যবহৃত আলোকনের জন্যে সেকুলার অনুসন্ধান পদ্ধতির মিল রয়েছে। সুফীরা যেমন মুহাম্মদের (স) মতো ঈশ্বরের অনুভূতি লাভ করতে চেয়েছে, তেমনি আবুলাফিয়া পয়গম্বরসুলভ অনুপ্রেরণা লাভের উপায় বের করার দাবি করেছেন। শ্বাস প্রশ্বাস, মন্ত্রোচ্চারণ ও চৈতন্যের বিকল্প একটা অবস্থা অর্জনের লক্ষ্যে বিশেষ ভঙ্গি প্রয়োগের মাধ্যমে যোগের ইহুদি ধরণ আবিষ্কার করেছিলেন তিনি। আবুলাফিয়া ব্যতিক্রমী কাব্বালিস্ট ছিলেন। তিনি ছিলেন উচ্চ শিক্ষিত । তোরাহ, তালমুদ ও ফালসাফাহ পাঠের পর একত্রিশ বছর বয়সে এক অদম্য ধর্মীয় অভিজ্ঞতার ফলে অতিন্দ্রীয়বাদে দীক্ষিত হয়েছিলেন। নিজেকে কেবল ইহুদি নয় বরং ক্রিশ্চানদেরও মেসায়াহ বলে বিশ্বাস করতেন তিনি। সে হিসাবে গোটা স্পেন এমনকি নিকট প্রাচ্য পর্যন্ত সফর করে অনুসারী সংগ্রহ করেছেন। ১২৮০ সালে ইহুদি দূত হিসাবে পোপের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। যদিও আবুলাফিয়া খৃস্টধর্মের সমালোচনার বেলায় যারপরনাই উচ্চকণ্ঠ ছিলেন, তা সত্ত্বেও কাব্বালিস্টিক ঈশ্বর ও ট্রিনিটির ধর্মতত্ত্বের মিল উপলব্ধি করেছিলেন। সর্বোচ্চ তিনটি সেফিরদ ঈশ্বরের বুদ্ধিমত্তা ও প্রজ্ঞার স্মারক লোগোস ও আত্মার যা অগম্য আলোয় হারিয়ে যাওয়া কিছু না বা পিতা হতে অগ্রসর হয়েছে। আবুলাফিয়া স্বয়ং ট্রিনিটির কায়দায় ঈশ্বর সম্পর্কে আলোচনা পছন্দ করতেন।
এই ঈশ্বরকে পাওয়ার জন্যে আবুলাফিয়া ‘আত্মাকে উনুক্তি করতে একে বেঁধে রাখা গিঁটগুলো খোলার প্রয়োজনের শিক্ষা দিয়েছিলেন। গিঁট খোলার কথা তিব্বতিয় বুদ্ধ মতবাদেও দেখা যায়। বিশ্বব্যাপী অতিন্দ্রীয়বাদীদের মৌলিক মিলের আরেকটা ইঙ্গিত এটা। বর্ণিত প্রক্রিয়াকে রোগির মানসিক গঠনকে ব্যাহতকারী জটিলতাসমূহ উন্মুক্ত করার সাইকোঅ্যানালিটিক প্রয়াসের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। কাব্বালিস্ট হিসাবে আবুলাফিয়া সমগ্র সৃষ্টিকে সচলকারী স্বর্গীয় শক্তির ব্যাপারে অধিকতর আগ্রহী ছিলেন আত্মা যা ধারণ করতে পারে না। আমরা যতক্ষণ ইন্দ্রিয় ধারণার ভিত্তিতে সৃষ্ট মতামত দিয়ে আমাদের মনকে আচ্ছন্ন করে রাখব ততক্ষণ জীবনের দুর্জেয় উপাদান আলাদা করা দুরূহ। আবুলাফিয়া অনুসারীদের যোগানুশীলনের মাধ্যমে এক নতুন জগৎ আবিষ্কারের জন্যে স্বাভাবিক চেতনার উর্ধ্বে যাবার শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর পদ্ধতিসমূহের অন্যতম ছিল হোখমাহ হা- সেরুফ যা ঈশ্বরের নামের ধ্যানের রূপ নিয়েছিল। একজন কাব্বালিস্টকে অধিকতর বিমূর্ত এক ধারণায় মনোসংযোগের লক্ষ্যে নিরেট বিষয়বস্তু হতে মনকে সরিয়ে আনতে ঈশ্বরের নামগুলোকে বিভিন্নভাবে সাজানোর প্রয়োজন হতো। এই অনুশীলনের প্রভাব-বহিরাগত কারও চোখে খুবই নৈরাজ্যজনক মনে হতে পারে-অসাধারণ ছিল বলেই ধারণা হয়। আবুলাফিয়া স্বয়ং একে সঙ্গীতের মূছনা শোনার অনুভূতির সঙ্গে তুলনা করেছেন, বর্ণমালার অক্ষরগুলো স্কেলের বিভিন্ন সুরের স্থান অধিকার করে নিচ্ছে। বিভিন্ন ধারণাকে একীভূত করার একটি প্রক্রিয়াও সৃষ্টি করেছিলেন তিনি যার নাম দিয়েছেন দিল্লাগ (লাফানো) এবং কেফিতসাহ (স্কিপিং), যা স্পষ্টই আধুনিক ফ্রী অ্যাসোসিয়েশনের অ্যানালিটিক্যাল অনুশীলনের অনুরূপ। আবার, এটাও বিস্ময়কর ফল বহন করত বলে কথিত আছে । আবুলাফিয়া যেমন ব্যাখ্যা করেছেন, এতে গোপন মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া আলোর দিকে আসে ও কাব্বালিস্টকে স্বাভাবিক বলয়সমূহের কারাগার হতে মুক্ত করে ‘স্বর্গীয় বলয়ের সীমানায় নিয়ে যায়।৫৭ এইভাবে আত্মার ‘বন্ধনসমূহ’ মুক্ত হয়ে শিক্ষাব্রতী মানসিক শক্তির উৎস আবিষ্কার করে যা তার মনকে আলোকিত করে হৃদয়ের বেদনা দূর করে।
