সুফীবাদের মতো কাব্ব্যলাহ সৃষ্টির মতবাদে মহাবিশ্বের বস্তুগত উৎপত্তি নিয়ে মাথা ঘামায় না। দ্য যোহার জেনেসিসের বিবরণকে এন সফের অন্তস্থ সংকটের প্রতীকী ভাষ্য হিসাবে দেখে, যার ফলে গডহেড তার অতলান্ত অন্তর্মুখীনতা থেকে বেরিয়ে এসে নিজেকে প্রকাশ করেছেন। দ্য যোহার যেমন বলেছে:
আদিতে রাজার ইচ্ছা যখন কার্যকর হতে শুরু করল, স্বর্গীয় প্রভায় চিহ্ন খোদাই করলেন তিনি। এন সফের গভীরতম অন্তর হতে এক গাঢ় শিখা জ্বলে উঠল, স্বর্গীয় প্রভার বলয়ে আটকা পড়া নিরাকার হতে জমে ওঠা কুয়াশার মতো, শাদাও নয়, কালোও, লাল নয়, সবুজও নয়, কোনও রঙেরই নয় ।[৫৫]
জেনেসিসে ঈশ্বরের প্রথম সৃজনশীল বাণীটি ছিল: ‘লেট দেয়ার বি লাইট! দ্য যোহার প্রদত্ত জেনেসিসের বিবরণের (হিব্রু ভাষায় বলা হয় রেরেশিত), সুচনার ‘আদিতে’ শব্দের পরে), এই ‘গাঢ় শিখা হলো প্রথম সেফিরাহ: কেদার এলিয়ন, ঈশ্বরের সর্বোত্তম মুকুট। এর কোনও রঙ বা আকার নেই: অন্য কাব্বালিস্টরা একে কিছু না (আইন) বলতে পছন্দ করে। মানুষের উপলব্ধিতে আসতে পারে ঐশীরূপের এমন সর্বোচ্চ ধরণকে শূন্যতার সঙ্গে মেলানো হয়েছে, কারণ এর সঙ্গে অস্তিত্ব আছে এমন কোনও কিছুর কোনও তুলনা হয়। না। সুতরাং বাকি সব সেফিরদ শূন্যতার গর্ত থেকে আবির্ভূত হয়েছে। এটা শূন্য হতে সৃষ্টির প্রথাগত মতবাদের একটি অতিন্দ্রীয়বাদী ব্যাখ্যা। গডহেডের আত্মপ্রকাশের প্রক্রিয়া আলোর বিস্তারের সঙ্গে অব্যাহত থাকে, যা অধিকতর ব্যাপক বলয়ে ছড়িয়ে পড়ে। দ্য যোহার বলছে:
কিন্তু এই শিখাঁটি আকৃতি আর বিস্তৃতি নিতে শুরু করলে উজ্জ্বল বর্ণের সৃষ্টি করে। কারণ একেবারে অন্তস্থ কেন্দ্রে এক গহ্বর জেগে ওঠে যেখান থেকে নিচের যা কিছু এন সফের রহস্যময় গোপনীয়তায় লুকায়িত সমস্ত কিছুর ওপর অগ্নি ঝরায় । গহ্বর ভেঙে যায়, কিন্তু এর চারপাশের চিরন্তন প্রভাকে পুরোপুরিভাবে ভেদ করে না। ভাঙনের প্রভাবে আসার আগে পর্যন্ত পুরোপুরি শনাক্তযোগ্য থাকে এটা, একটা গোপন স্বর্গীয় বিন্দু আবির্ভূত হয়। এই বিন্দুর অতীত কোনও কিছু জানা বা বোঝা নাও যেতে পারে এবং একে বলে বেরেশিত, সুচনা; সৃষ্টির প্রথম বাণী ।[৫৬]
এই ‘বিন্দু’টি হচ্ছে দ্বিতীয় সেফিরাহ হোখমাহ (প্রজ্ঞা), যা সকল সৃষ্ট বস্তুর আদর্শ আকার ধারণ করে। বিন্দুটি এক রাজপ্রাসাদ বা দালানে পরিণত হয়, যা তৃতীয় সেফিরাহ অর্থাৎ বিনাহয় রূপান্তরিত হয়। এই তিন সর্বোচ্চ সেফিরদ মানুষের উপলব্ধির সীমানা প্রকাশ করে। কাব্বালিস্টরা বলে যে, ঈশ্বর বিনাহর মহান ‘কে?’ (Mi) রূপে অবস্থান করেন, যা প্রত্যেক জিজ্ঞাসার শুরুতে থাকে। কিন্তু জবাব পাওয়া সম্ভব নয়। যদিও এন সফ ক্রমশঃ নিজেকে মানবীয় সীমাবদ্ধতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছেন, কিন্তু আমাদের জানার কোনও উপায় নেই তিনি কে? আমরা যতই ওপরে উঠি, ততই অন্ধকার আর রহস্যে আবৃত্ত রয়ে যান।
পরবর্তী সাতটি সেফিরদ জেনেসিসের সৃষ্টির সাত দিনের অনুরূপ বলে বর্ণিত। বাইবেলিয় আমলে YHWH শেষ পর্যন্ত কানানের প্রাচীন দেবী এবং তাদের ইরোটিক কাল্টসমূহের বিপক্ষে বিজয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু কাব্বালিস্টরা ঈশ্বরের রহস্য প্রকাশের কঠোর প্রয়াস পাওয়ার সময় খানিকটা ভিন্ন রূপে হলেও প্রাচীন মিথলজিগুলো আবার নিজস্ব জায়গা করে নেয়। দ্য যোহার বিনাহুকে ‘ঐশী মাতা হিসাবে বর্ণনা করেছে, যার গর্ভ গাঢ় শিখা ছেদ করে নিম্নস্থ সাতটি সেফিরদকে জন্ম দেওয়ার জন্যে। আবার নবম সেফিরাহ ইয়েসদ এক ধরনের ধর্মীয় লিঙ্গের কল্পনা অনুপ্রাণিত করে: একে একটা সুড়ঙ বা পথ হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে যার ভেতর দিয়ে অতিন্দ্রীয় প্রসবের মতো স্বর্গীয় প্রাণ মহাবিশ্বে বর্ষিত হয়। তবে দশ সেফিরাহ শেকিনাহতেই সৃষ্টির যৌন প্রতীক ও থিওগোনি স্পষ্টতরভাবে উপস্থিত। তালমুদে শেকিনাহ নিরপেক্ষ চরিত্র: এর কোনও লিঙ্গ বা যৌনতা ছিল না। কিন্তু কাব্বালায় শেকিনাহ্ ঈশ্বরের নারীরূপে পরিণত হয়েছে। প্রাথমিক যুগের অন্যতম কাব্বালিস্ট টেক্সট বাহির-এ (ca. ১২০০) শেকিনাহূকে নাস্টিক চরিত্র প্লেরোমা হতে পতিত বর্তমানে ঘুরে বেড়ানো জগতের মাধ্যমে গডহেড হতে বিচ্যুত স্বর্গীয় উৎসারণের শেষটি অর্থাৎ সোফিয়ার সঙ্গে মেলানো হয়েছে। দ্য যোহার ‘শেকিনাহর এই নির্বাসন’কে জেনেসিসে বর্ণিত আদমের পতনের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এটা বলছে যে, আদমকে ‘জীবন বৃক্ষে’র ‘মধ্য সেফিয়দ ও ‘জ্ঞানবৃক্ষের’ শেকিনাহকে দেখানো হয়েছিল। সাতটি সেফিরদকে একসঙ্গে উপাসনা করার বদলে তিনি কেবল শেকিনাহকে উপাসনার জন্যে বেছে নিয়ে জীবনকে জ্ঞান হতে বিচ্ছিন্ন করেছেন এবং সেফিরদের ঐক্য নষ্ট করেছেন। স্বর্গীয় উৎস হতে বিচ্ছিন্ন স্বর্গীয় জ্ঞান আর বাধাহীনভাবে পৃথিবীতে প্রবাহিত হতে পারেনি। কিন্তু তোরাহ্ অনুসরণের মাধ্যমে ইসরায়েলের জনগোষ্ঠী শেকিনাহ্র নির্বাসনের অবসান ঘটিয়ে ফের গডহেডের জগতের সঙ্গে মিলিত হতে পারে। এখানে বিস্ময়ের কিছু নেই যে, বহু গোঁড়া তালমুদ অনুসারী এ ধারণাকে ঘৃণাৰ্য মনে করেছে, কিন্তু শেকিনাহর নির্বাসন, যা কিনা ঐশীজগৎ হতে দূরে ঘুরে বেড়ানো দেবীদের কিংবদন্তীর প্রতিধ্বনি, কাব্বালাহর অত্যন্ত জনপ্রিয় উপাদানে পরিণত হয়েছিল। নারী শেকিনাহ্ প্রবলভাবে পুরুষবাচক অর্থের দিকে ঝুঁকে থাকা ঈশ্বরের ধারণায় কিছুটা যৌন-ভারসাম্য এনেছিল: এটা একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় প্রয়োজনও মিটিয়েছে।
