ইবন আল-আরাবী ঈশ্বরের সহমর্মিতার নিদর্শন দেখেছিলেন, যা তাঁকে মানবজাতির সামনে প্রকাশ করেছে, বিশ্বজগতকে সৃজনকারী বাণী হিসাবে। মোটামুটি ঠিক একইভাবে সেফিরদ ঈশ্বর স্বয়ং নিজেকে যে নামসমূহ দিয়েছেন আর যা দিয়ে বিশ্ব সৃষ্টি করেছেন এ দুটোই। এই দশটি নাম এক হয়ে তাঁর একটি মহানাম সৃষ্টি করেছে, যা মানুষ জানে না। এগুলো এন সফের নিঃসঙ্গ অগম্য অবস্থান থেকে পার্থিব জগতে অবতরণ করার পর্যায়গুলোর প্রতিনিধিত্ব করে। এগুলো সাধারণত এভাবে তালিকাভুক্ত করা হয়:
১. কেদার ইলিয়ন: ‘সর্বোত্তম মুকুট ২. হোখমাহ: ‘প্রজ্ঞা’ ৩. বিনাহ: বুদ্ধিমত্তা ৪. হেসেদ: ‘প্রেম’ বা ‘করুণা’। ৫. দিন: ক্ষমতা’ (সাধারণভাবে কঠিন বিচারে প্রকাশ পায়)। ৬. রাখামিম: সহমর্মিতা, অনেক সময় তিফারেদ’: ‘সৌন্দর্য বলা হয়। ৭. নেতসাখ: দীর্ঘস্থায়ী ৮. হদ: আভিজাত্য ৯. ইয়েসদ: ‘ভিত্তি’ ১০. মালকুদ: ‘রাজ্য’; ‘শেকিনাহ’ও বলা হয় ।
অনেক সময় উপর হতে নিচের দিকে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত গাছের মতো করেও সেফিরদকে উপস্থাপন করা হয়, এর শেকড় এন সফের দুর্বোধ্য গভীরতায় প্রোথিত (চিত্র দেখুন এবং এর সর্বোচ্চ বিন্দু শেকিনাহয়, জগতে। এই কাঠামোগত ইমেজ কাব্বালিস্টিক প্রতাঁকের ঐক্য প্রকাশ করে। এন এফ হচ্ছেন গাছের শাখাপ্রশাখা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে তাদের জীবন দানকারী প্রাণরস যা এক রহস্যময় জটিল সত্তায় একীভূত করে দেয়। যদিও এন এফ ও তার নামের জগতের ভেতর পার্থক্য রয়েছে, কিন্তু উভয়ই কয়লা আর আগুনের মতো এক। সেফিরদ এন সফের দুর্ভেদ্য অস্পষ্টতায় বিরাজমান অন্ধকারকে প্রকাশকারী আলোর জগতকে তুলে ধরে। আমাদের ধারণাসমূহ যে পুরোপুরি ‘ঈশ্বর’কে প্রকাশ করতে পারে না সেটা দেখানোরই আরেকটি উপায় এটা ।
অবশ্য সেফিরদের জগৎ গডহেড ও পৃথিবীর মাঝখানে মহাশূন্যের বিকল্প কোনও বাস্তবতা নয়। এগুলো স্বর্গ ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী কোনও মইয়ের ধারা নয়, বরং আমাদের অনুভূতি দিয়ে উপলব্ধি করা পৃথিবীর ভিত্তি।
The Tree of the Sefiroth
ঈশ্বর যেহেতু সর্বেসর্বা, সেফির অস্তিত্বময় এমন সমস্ত কিছুতেই উপস্থিত এবং সক্রিয়। এগুলো মানুষের চেতনার পর্যায়গুলোও বোঝায় যার মাধ্যমে অতিন্দ্রীয়বাদীরা আপন মনে অবতরণ করে ঈশ্বরের দিকে আরোহণ করে থাকে। আবার ঈশ্বর ও মানুষকে অবিচ্ছেদ্য হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। কোনও কোনও কাব্বালিস্ট সেফিরদ’কে ঈশ্বর পরিকল্পিত আদি মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হিসাবেও দেখেছে। মানুষকে ঈশ্বরের প্রতিরূপে সৃষ্টি করা হয়েছে বলে বাইবেল একথাই বোঝাতে চেয়েছিল: পার্থিব বাস্তবতা স্বর্গীয় জগতের আদি আদর্শ বাস্তবতার অনুরূপ । গাছ বা মানুষের মতো ঈশ্বরের ইমেজসমূহ এমন এক সত্তার কল্পনা যা যৌক্তিক সূত্রবদ্ধকরণ অস্বীকার করে। কাব্বালিস্টরা ফালসাফাহর প্রতি বৈরীভাবাপন্ন ছিল না-তাদের অনেকেই সাদিয়া, গাওন এবং মায়মোনিদসের মতো ব্যক্তিদের শ্রদ্ধা করত-কিন্তু ঈশ্বরের রহস্য উদ্বাটনের ক্ষেত্রে মেটাফিজিক্সের চেয়ে প্রতীকীবাদ ও মিথলজিই অধিকতর সন্তোষজনক হিসাবে আবিষ্কার করেছিল তারা।
কাব্বালিস্টিক সাহিত্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী রচনা ছিল দ্য যোহার: সম্ভবত ১২৭৫-এ স্পেনের অতিন্দ্রীয়বাদী মোজেস অভ লিয়নের রচনা। তরুণ বয়সে মায়মোনিদসের রচনা পাঠ করলেও আস্তে আস্তে কাব্বালাহর নিগূঢ় তত্ত্ব। অতিন্দ্রীয়বাদে আকৃষ্ট হয়ে উঠেন তিনি। দ্য যোহার অনেকটা অতিন্দ্রীয়বাদী উপন্যাসের মতো, যেখানে তৃতীয় শতাব্দীর তালমুদ বিশেষজ্ঞ সিমিয়ন বেন। ইয়োহাই পুত্র এলিয়েযারকে নিয়ে প্যালেস্তাইনের আশপাশে ঘুরে ঘুরে অনুসারীদের সঙ্গে ঈশ্বর, প্রকৃতি ও মানব জীবন প্রসঙ্গে আলোচনা করার কথা বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে স্পষ্ট কোনও কাঠামো বা ধারণা কিংবা অনুমানের ধারাবাহিক কোনও বিকাশ নেই। এমন কোনও পদ্ধতি দ্য যোহারের চেতনার সঙ্গে বেমানান হতো, তাঁর ঈশ্বর চিন্তার যেকোনও বিন্যস্ত পদ্ধতি প্রতিহত করে থাকেন। ইবন আল-আরাবীর মতো মোজেস অভ লিয়ন বিশ্বাস করতেন, ঈশ্বর প্রত্যেক অতিন্দ্রীয়বাদীকে অনন্য ও ব্যক্তিগত দর্শন দিয়ে থাকেন, সুতরাং তোরাকে ব্যাখ্যা করার উপায়ের কোনও সীমা পরিসীমা নেই: কাব্বালিস্ট যখন অগ্রসর হয়, পরতের পর পরত তাৎপর্য উন্মোচিত হয়ে পড়ে। দ্য যোহার দশটি সেফিরদের রহস্যময় উৎসারণকে এমন এক প্রক্রিয়া হিসাবে দেখিয়েছে যার মাধ্যমে নৈর্ব্যত্তিক এন এফ একজন ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। সর্বোচ্চ তিনটি সেফিরদে-কেদার, হোখমাহ এবং বিনাহযখন, যেমন মনে করা হয়, এন সফ কেবল নিজেকে প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তখন ঐশীসত্তাকে ‘তিনি’ বলা হয়। তিনি যখন মধ্যবর্তী সেফিরদ হেসেদ, দিন, তিফারেদ, নেতসাখ, হোদ, ইয়েসদ-হয়ে অবতরণ করেন, তখন তিনি পরিণত হন, ‘তুমি’তে। সবশেষে ঈশ্বর যখন ‘শেকিনাহ’য়, এই পৃথিবীতে উপস্থিত হন, তিনি নিজেকে বলেন ‘আমি’। এই পর্যায়ে, যেমন মনে করা হয়, ঈশ্বর একজন ব্যক্তিতে পরিণত হন, তার আত্মপ্রকাশ সম্পূর্ণ হয়। মানুষ তখন তার অতিন্দ্রীয়বাদী যাত্রা শুরু করতে পারে। অতিন্দ্রীয়বাদী আপন গভীরতম সত্তার উপলব্ধি অর্জন করার পর নিজের মাঝে ঈশ্বরের উপস্থিতি সম্পর্কে আরও সজাগ হয়ে ওঠে এবং ব্যক্তিত্ব ও অহমের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে অধিকতর নৈর্ব্যত্তিক বলয়ে আরোহণ করতে পারে। এটা আমাদের সত্তার কল্পনাতীত উৎস ও অসৃষ্ট বাস্তবতার গুপ্ত জগতে প্রত্যাবর্তন। এই অতিন্দ্রয়ীবাদী দৃষ্টিকোণে, আমাদের অনুভূতি প্রকাশক জগৎ ঐশীসত্তার শেষ এবং বহিস্থঃ খোলস মাত্র।
